• ঢাকা
  • বুধবার, ২ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ১৭ আগষ্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

হিরণ্ময় ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশ


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ০১:৩৮ পিএম
শিকড়ের সন্ধানে আমরা প্রাণবন্ত ও সঞ্জীবিত
স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ম্ফূর্ত উৎপত্তি

এইচ এন আশিকুর রহমান

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী 'মুজিববর্ষ'-এর যুগলবন্ধন ও যুগসন্ধিক্ষণে আমরা দাঁড়িয়ে। নতুন উদ্যমে আমাদের পুনঃপরিচয় ও শিকড়ের সন্ধানে আমরা প্রাণবন্ত ও সঞ্জীবিত।

আমরা যুগে যুগে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি খালি হাতে, লড়াই করেছি পাকিস্তানিদের সঙ্গে, ছিনিয়ে এনেছি স্বাধীনতা। সূর্য সেন, প্রীতিলতা, হাজী শরীয়তউল্লাহ, ক্ষুদিরাম, 'কোনঠে বাহে' নুরলদীন, মজনু ফকির, বাঘা যতীন, তিতুমীর, ভাসানী, চিত্তরঞ্জন, সুভাষ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ আরও অনেকে আমাদের অনায়াস গৌরব ও আমাদের মাটি থেকে তাদের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ম্ফূর্ত উৎপত্তি। বস্তুত আমাদের অস্তিত্ব ঘিরে আছে সংগ্রাম, তেজস্বিতা ও সীমাহীন মমতার এক আশ্চর্য সৌকর্য।

দীর্ঘদিনের পরাধীনতার গ্লানি, শাসন-শোষণ ও প্রতারণা বাঙালির সংগ্রামী ও বীর্যমান চরিত্রকে অস্পষ্ট করেছে। কিন্তু চিরকালই বীরধারা ও অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রবল ক্রোধ এবং প্রয়োজনে শ্রেষ্ঠ আত্মত্যাগের অনায়াস ক্ষমতা অন্তঃসলিলা স্রোতে বাংলার মানুষের চরিত্রের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে। আমাদের এ বীর পরিচয় স্পষ্ট হওয়ার প্রয়োজন ছিল।

বাংলার সহস্র বছরের ইতিহাসে, যা ঘটনাবহুল এবং সংগ্রামে ভরা- সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য, পরিপূর্ণতা, তাৎপর্য ও অনুপ্রেরণা বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘিরে। জাদুকরি সম্মোহন ক্ষমতার অধিকারী বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টিভরা দার্শনিকও। বঙ্গবন্ধু ছিলেন পরিপূর্ণ দৃষ্টির অধিকারী- দৃষ্টি, অন্তর্দৃষ্টি এবং দূরদৃষ্টির সম্মিলন দেখি তার মাঝে। তিনি মানুষের হৃদয়ের ভাষা পড়তে পারতেন, তা ছিল তার ভালোবাসা ও রাজনীতির নিয়ামক। তার এক অঙ্গুলি হেলনে সাড়ে সাত কোটি মানুষ লৌহ-কঠিন একতায় আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। কামার, কুমার, কৃষক, যুবা, বৃদ্ধ, তরুণ-তরুণী, ছাত্রছাত্রী সব শ্রেণির মানুষ- সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যেও শুধু 'ভরসা' ও 'বিশ্বাসে' লড়াই করল। খালি হাতে ছিনিয়ে আনল স্বাধীনতা। এ অনন্য ইতিহাস, দ্বিতীয় খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার সহস্র বছরের তেজ, কবিতা ও করুণার যোগফল- এসব ঘিরেই আমাদের পরিচয়, পরিমণ্ডল ও পরিক্রমা- আমাদের বীর সত্তার পুনর্জাগরণ-পুনরুজ্জীবিত চেতনা-মুক্তিযুদ্ধ-আমাদের স্বাধীনতা-আমাদের গন্তব্য স্বপ্নের 'সোনার বাংলা'। এ অভিযাত্রা সহজ নয়, বন্ধুর এ পথ। অপরিমেয় শক্তি-সামর্থ্য, দানবীয় বুদ্ধিমত্তা ও ষড়যন্ত্র রুদ্ধ করার চেষ্টা করছে এ অভিযাত্রা। '৭৫-এর আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে; কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ রুদ্ধ হয়নি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা, শহীদ পরিবার, জাতীয় চার নেতা, অজস্র শহীদের রক্তে আমাদের মাটি স্নাত স্নিগ্ধ পূত ও পবিত্র। আমরা পরিশুদ্ধ হয়েছি, ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি ও সংকল্পে দৃঢ় হয়েছি। বাংলার পরিচয় দিন দিন আরও সমুজ্জ্বল হবে। বঙ্গবন্ধু বাঙালির পরিচয় পূর্ণ করেছেন। পরিপূর্ণ এ পরিচয় সত্য ও সুন্দর এবং তা অমোচনীয় ও শাশ্বতই থাকবে।

বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা ও কর্মকাণ্ড ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি ৯ আগস্ট ১৯৭৫-এ ক্রয় করলেন শেল কোম্পানি থেকে সব গ্যাস- সেই থেকে বাংলার সব গ্যাস আমাদের। তিনি চেয়েছিলেন, আমরা সম্পদ আহরণ করব, উত্তোলন করব ও নিজস্ব সম্পদে স্বয়ম্ভর হবো।

ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পদক্ষেপ তিনি নিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, গতানুগতিক প্রশাসন কাঠামো, ঘোরটোপ ও দীর্ঘসূত্রতামুক্ত মেধাভিত্তিক এবং বিষয় ও জ্ঞানভিত্তিক প্রশাসন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা। তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশ মিনারেল করপোরেশন। সচিবের পদমর্যাদায় নিয়োগ দিলেন চেয়ারম্যান হিসেবে দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলী।
আপাতদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র পদক্ষেপ; কিন্তু গভীরের উপলব্ধিজাত বিশাল পদক্ষেপ, যা হতে পারে আধুনিক, সচল, সংস্কারবান্ধব, সৃজনধর্মী প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনে গবেষণামূলক চিন্তা-ভাবনায় 'টার্নিং অব দ্য হ্যান্ডল'।

রাজনীতির সবচেয়ে জটিল সমস্যা 'দূরত্ব মোচন'- মানুষে মানুষে, অঞ্চলে অঞ্চলে, সম্ভাবনা এবং সম্ভাবনায়। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, ইপ্সিত বাংলাদেশ গঠনে সূতিকাগার হতে হবে তৃণমূল থেকে উত্থিত সক্ষমতা, দেশপ্রেম, সৃজনশীলতা, জ্ঞান চর্চার বিকাশ ও সঠিক উপলব্ধি। তিনি গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা অবহেলিত ৩৭ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে এক কলমের খোঁচায় সরকারীকরণ করলেন- তিনি অভুক্ত শিক্ষকদের দিলেন মর্যাদা, জীবিকার নিশ্চয়তা ও সুস্থ শিক্ষাদানে নিষ্ঠাবান হওয়ার স্বতঃস্ম্ফূর্ততা। শিক্ষার্থীদের নিয়ে গেলেন এক সেতুবন্ধে- সীমানা অতিক্রম ও দূরত্ব জয়ের মূলস্রোতে।

১৯৭৪-এ বঙ্গবন্ধু প্রণয়ন করলেন সামুদ্রিক আইন, যা ছিল জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত ও আরোপিত সামুদ্রিক আইনের বহু আগে। গভীর দূরদৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করেছিলেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে অনন্ত সমুদ্র হতে পারে উদ্ভিজ, মৎস্য, প্রাণিজ, খনিজ, জ্বালানি, হাইড্রোকার্বন ইত্যাদি এর অফুরন্ত উৎস। তিনি ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সামুদ্রিক সীমারেখা সম্পর্কে সমঝোতায় উপনীত হলেন। সবই ছিল বঙ্গবন্ধুর গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও অসাধারণ দূরদৃষ্টির ফলে। কিন্তু '৭৫-পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর এ যুগান্তকারী পদক্ষেপ সীমাহীন অবহেলা ও অজ্ঞতার কারণে গুরুত্ব পেল না। বঙ্গোপসাগর ভাগ হয়ে গেল মিয়ানমার ও ভারতের মধ্যে। আফগানিস্তান 'ল্যান্ড লক্‌ড' দেশ- তদ্রূপ বস্তুত আমরা হয়ে গেলাম অবরুদ্ধ 'সি লক্‌ড' একটি দেশ।

জাতি কৃতজ্ঞ, দাবি উত্থাপনের সময়সীমার শেষ প্রান্তে- অসীম প্রজ্ঞা ও সংকল্পে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্বরিত সময়োচিত পদক্ষেপ নিলেন। তার দৃঢ়তা ও দিকনির্দেশনায় আমরা অবশেষে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ২০১৪-এ ফিরে পেলাম আমাদের সমুদ্র। বাংলাদেশ আর সমুদ্র- অবরুদ্ধ দেশ রইল না। এক লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটারে বিস্তৃত উপকূলীয় সাগর, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহীসোপানের ওপর বাংলাদেশের দ্ব্যর্থহীন সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো। বাকি হতে পারে ইতিহাস-অনন্ত সম্ভাবনা, অর্জন ও অফুরন্ত সম্পদের।

আমরা জানি, আমাদের সম্পদ অপ্রতুল। আমাদের জনসংখ্যা অধিক, কিন্তু আমাদের অনেক চাহিদা ও স্বপ্ন। ছোট দেশ, ব্যাপক দারিদ্র্য, প্রয়োজনের তুলনায় সম্পদ কম। এ সমীকরণ জটিল ও সমাধান দুস্কর। বর্তমানের দাবি- বাংলাদেশের জন্য সংবেদনশীল, বুদ্ধিদীপ্ত, দূরদর্শী সৃজনশীলতা সৃষ্টি ও ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন এবং আমাদের উন্নয়ন ও উপভোগ, সৃজিত সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের মধ্যে সৌষম্য ও সমন্বয় সাধন।

কিন্তু রাষ্ট্র গঠনে ও পরিচালনায় বঙ্গবন্ধুর সময় ছিল সংক্ষিপ্ত। '৭৫-পরবর্তী ইতিহাস অন্ধকারের ইতিহাস- এটা শুধু ক্ষমতা গ্রহণের ব্যাপার ছিল না। গণতন্ত্র ও দেশপ্রেমের বুলির মোড়কে স্বাধীনতা হরণের ইতিহাস।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নষ্ট অতীতের ওপর দাঁড়িয়ে হিরণ্ময় ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর রচিত ভিত্তির ওপর যোগ করলেন- ১. ডিজিটাল বাংলাদেশ- তৃণমূলে নিয়ে গেলেন বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতা, ২. শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি, ৩. নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীশিক্ষার ব্যাপক বিস্তার, ৪. দারিদ্র্য দূরীকরণ ও নিরাপত্তাবলয় সৃষ্টি এবং ৫. সকলের জন্য গৃহায়ন ও প্রতি গৃহকোণে স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা। এসব নিয়েই আজ আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বাংলাদেশের বাস্তবতা।

সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের এককালের তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, শঙ্কা ও তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি আজ অপসৃত। আজ বাংলাদেশ বিশ্বসভায় সমীহ করার দেশ- এক উদীয়মান, মানবিক, শক্তিশালী ও স্বাচ্ছন্দ্যের রাষ্ট্র। বাংলাদেশ আজ প্রডাকশন পসিবিলিটি ফ্রন্টিয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। উৎপাদনের সীমারেখার শেষ প্রান্তে আমরা যেতে চাই। সম্ভাবনা আমাদের অনন্ত ও অসীম। জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে আমরা জয় পেয়েছি। টেক অব স্টেজে আমরা উপনীত।

সতর্ক থাকতে হবে- প্রবৃদ্ধির উচ্চধারা সমাজে আয় ও সম্পদে দৃশ্যমান অসমতা সৃষ্টি করলে অস্থিরতা, অর্থ পাচার, যথেচ্ছাচার উপভোগের প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে। সর্বস্তরে ওপরে যাওয়ার উদগ্র প্রতিযোগিতা ও সব পাওয়ার জন্য ইঁদুর দৌড় সমাজের অস্থিরতা ও নৈতিকতার ভারসাম্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
বাংলার মানুষ দরিদ্র ও অসহায়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিববর্ষে আমাদের অঙ্গীকার- তাদের সেবাই হবে আমাদের ব্রত। আমরা 'সহজ'কে 'জটিল' করব না এবং 'জটিল'কে 'সহজ' করব- এ হবে আমাদের প্রতিশ্রুতি। কাজের সঙ্গে আনন্দ, দক্ষতা, বিশ্বস্ততা, জ্ঞানের অনুশীলন ও বাঙালির অন্তশ্রাবী বীরস্রোত সব মিশেল দিয়ে আসুন আমরা সকলে মিলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের হিরণ্ময় বাংলাদেশ রচনা করি।

লেখক:  এইচ এন আশিকুর রহমান :সভাপতি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং কোষাধ্যক্ষ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

ঢাকানিউজ২৪.কম /

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image