• ঢাকা
  • সোমবার, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ; ১৫ জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image
website logo

ময়মনসিংহের প্রধান খালগুলো অবৈধ দখলে 


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৪ জুলাই, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ০৪:৪২ পিএম
ময়মনসিংহের
প্রধান খালগুলো অবৈধ দখলে 

মো. নজরুল ইসলাম, ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহ নগরীর প্রধান প্রধান খালগুলো অবৈধ দখল করে বাসা-বাড়ি ও রাস্তা নির্মাণের ফলে সরু হয়ে গেছে। এছাড়াও নগরীর সেহরা, মাকড়জানি, কাটাখালি ও আকুয়া খালসহ ৮টি খাল খনন ও উচ্ছেদ না করায় এখন ময়লা-আবর্জনা জমে ভরাট এবং বেশিরভাগ জায়গা জবরদখল হয়ে গেছে।

ফলে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়ে নগরীতে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। নাগরিকদের দুর্ভোগ ও কষ্ট দেখতে এবং সমস্যা সমাধানে সরজমিনে প্রায় প্রতিদিনই সিটি মেয়র ইকরামুল হক টিটু ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তাগণ ছুটে বেড়াচ্ছেন। ইতিমধ্যেই দখলকৃত খালের অনেকাংশ উদ্ধার করায় পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসময় এলাকাবাসী মেয়রকে জানান, নগরীর সকল খালগুলো খনন করা হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না। এর জবাবে মেয়র জানান খালগুলো উদ্ধারের পর খনন করে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণসহ ওয়াকওয়ে নির্মাণের জন্য পরিকল্পণা হচ্ছে।

বুয়েট গ্রাজুয়েট স্থানীয় বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মোঃ মজিবুর রহমান জানান, ময়মনসিংহ নগরীর সাময়িক জলাবদ্ধতা থেকে অনেকটা পরিত্রাণ পেলেও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সামাধানে খালগুলোর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। খালের দ’ুপাশে আরসিসি বাঁধ দিয়ে গভীর করে পুরো খাল খনন করা একান্ত জরুরি। খালের একপাশে ছোট এস্কেভেটর চলাচলের সুবিধা সম্বলিত রাস্তা নির্মাণ করা জরুরি যাতে খালের আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার ও মনিটরিং করা যায়। এরূপ ব্যবস্থা রাখার মাধ্যমে টেকসই উপায় নিশ্চিত করে খাল পূনরুদ্ধার ও খননের অনুরোধ  জানিয়েছেন ভূক্তভোগী নাগরিকরা।

ভাটিকাশরে বাসিন্দ প্রকৌশলী মোঃ মজিবুর রহমানসহ ভুক্তভোগী এলাকাবাসী জানান, সিটি কর্পোরেশন হওয়ার পর অসংখ্য বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। নগরীর ১৯ ও ১৫ নং ওয়ার্ডের ভাটিকাশর, বলাশপুর ও মাসকান্দা এলাকায় প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপড্রেন স্থাপন করা হয়েছিল। সেসময় পাইপ এই ড্রেনগুলোর স্থাপনের কাজ সুষ্ঠুভাবে করা হয়নি। ফলে পাইপগুলো একটার সাথে অপরটার জোড়া উচু-নীচু হয়ে অসমতল হয়ে গেছে। নিয়মিত পরিচর্চা করা হয়নি। ড্রেনে বহুতল বিল্ডিং এর পাইলিং এর কাঁদা-বালি যুক্ত পানিতে কাঁদা জমে পাইপ ড্রেন অনেকটা ভরে গেছে।

তাছাড়া ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়ে যাওয়ায় খোলা ম্যানহোল দিয়ে এবং ওপেন ছোট ড্রেন থেকে পাইপ ড্রেনে পানি প্রবেশ পথে খাঁচা চুরি হয়ে যাওয়ায় অনেক আবর্জনা ও প্লাস্টিক সামগ্রী পাইপ ড্রেনে প্রবেশ করে নানা স্থানে বাঁধের সৃষ্টি হয়ে পানি আকটে যাচ্ছে। এসব বাঁধ অনেক কষ্ট করে অপসারন করলেও অনেক আবর্জনা রয়েই থাকে। ছাড়াও নানা কারণে সংকোচিত হয়ে পড়ায় অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা পাইপড্রেনগুলো হারিয়ে ফেলেছে। তাছাড়া বলাশপুর এলাকাটি অপেক্ষকৃত অনেকটা নীচু। তাই নৌকার মতো এই এলাকার পানি সরছে না। তাই ভাটিকাশর ও বলাশপুরের রাস্তাগুলোর পাইপ ড্রেন উঠিয়ে বৃহৎ আরসিসি ইউ ড্রেন নির্মাণ করে ড্রেনের পানি ব্রহ্মপূত্র নদের ফেলানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। ড্রেনের উপরে স্লাব বাসিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা প্রয়োজন।

এলাকাবাসী জানায়, ওইসব এলাকার বসতবাড়ির ব্যবহার্য্য পানির পরিমাণও বহুগুণে বেড়েছে, শুকনো মৌসুমে এই পাইপড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশন হলেও সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির কারণে পাইপড্রেনগুলোতে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশণ হচ্ছে না। ফলে  নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতায় জনগণের  দুর্ভোগ সরজমিনে গত ৩ জুলাই পরিদর্শন করেন সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি মোঃ ইকরামুল হক টিটু। তিনি ময়লা ও কাঁদাযুক্ত হাঁটুপানিতে নেমে বলাশপুরের মানুষের কষ্ট নিজে প্রত্যক্ষ করেন। এসময় স্থানীয় লোকজন তাদের দুর্ভোগের নানা চিত্র তুলে ধরেন। মেয়র টিটু এসব দুর্ভোগ লাঘবে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পণার কথা তুলে ধরেন।

ইতোমধ্যে নগরীর একাংশে আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপ বসিয়ে এর পানি পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদে ফেলা হচ্ছে। তবে নগরীর দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশের পানি
নিষ্কাশনে খাল খননের পাশাপাশি খালের ওপর থেকে অবৈধ জবরদখলদের উচ্ছেদ কার্যক্রম হাতে নেয়ার কথা জানান সিটি মেয়র। স্থানীয় সূত্র জানায় নগরীর মালগুদাম, সেহরা মুন্সিবাড়ি, চামড়াগুদাম, চরপাড়া মোড়, নয়াপাড়া, মাসকান্দা ও দীঘারকান্দা হয়ে সেহরা খালটি মিশেছে নগরীর দক্ষিণাংশের পাগারিয়া নদীতে।

আবার পাগারিয়া খালের প্রবাহ মিশেছে পুরনো ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে। নগরীর বাঘমারা ও কৃষ্টপুর এলাকার পানিও নিষ্কাশিত হয়ে থাকে সেহরা খালে। কিন্তু সেহরা খালের চরপাড়া মোড়, নয়াপাড়া, মাসকান্দা ও দীঘারকান্দা অংশের বেশিরভাগ জবরদখল হয়ে গেছে। খালের গাইড দেয়ালের ওপর অনেকে নির্মাণ করেছেন বহুতল স্থাপনা। অনেক জায়গা জবরদখলের কারণে সঙ্কুচিত ও সরু হয়ে গেছে।

খননের অভাবে ময়লা-আবর্জনার স্তুুপ জমে ভরাট হয়ে গেছে পুরো খাল। জবরদখল ও ভরাটের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতে খাল উপচে পানির প্রবাহ ছড়াচ্ছে সড়কের ওপর। আর ভারি বর্ষণ হলে তো কথাই নেই। খালের ময়লাযুক্ত পানি ঢুকে পড়ে নগরীর বাসাবাড়িতে। একই অবস্থা মাকড়জানি ও কাটাখালি খালের। গুরুত্বপূর্ণ মাকড়জানি খালটি নগরীর রামবাবু রোড ও বিদ্যাময়ী স্কুলের পাশ থেকে নতুন বাজার লেভেল ক্রসিং, সুইপার কলোনি, নওমহল, আকুয়া ও দীঘারকান্দা হয়ে মিশেছে দক্ষিণের পাগারিয়া নদীতে। ময়লা-আবর্জনার স্তুপ জমে এই খালেরও এখন মরণদশা। দখল আর ভরাট দূষণে অনেক জায়গায় খালের অস্তিত্বই নেই। কাটাখালি
খাল ভরাটের কারণে কলেজ রোড ও আউটার স্টেডিয়াম এলাকার বেশিরভাগ বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় ।

এসব এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণে প্রকল্প গ্রহণে মাস্টারপ্ল্যান করার কথা জানান সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোঃ ইকরামুল হক টিটু। নগরীর
দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের ৩টি খাল জবরদখল মুক্ত করতে উচ্ছেদ ও খননসহ বিউটিফিকেশন করার পরিকল্পনা রয়েছে নয়া মাস্টারপ্ল্যানে। মাস্টারপ্ল্যান
অনুমোদন হলে শুরু হবে উচ্ছেদ ও খননের কাজ। দখল- দূষণ ঠেকাতে এসব খালের পানির প্রবাহ বাড়িয়ে লেকের সৌন্দর্য বর্ধন করা হবে বলে জানান সিটি মেয়র।

এদিকে নগরীর ব্রহ্মপুত্র লাগোয়া গাঙিনাপাড়, দুর্গাবাড়ি রোড, মহারাজা রোড, স্টেশন রোডসহ আশপাশ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপ বসানো হয়েছে। নগরবাসী ইতোমধ্যে এর সুফল পাচ্ছে। আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে এসব এলাকার পানি ফেলা হচ্ছে পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদে। ফলে বৃষ্টির পর দ্রুত সময়ে পানি নেমে যাওয়ায় কমে গেছে ভোগান্তি। নগরবিদরা জানান, পুরো ময়মনসিংহ সিটিকে এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত করা হলে নগরবাসীর ভোগান্তি থাকবে না।

ময়মনসিংহ নগরীর বলাশপুরে পরিদর্শনকালে সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোঃ ইউসুফ আলী জানান, সিটির জননন্দিত মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি মোঃ ইকরামুল হক টিটু’র নির্দেশে নগরীর দক্ষিণে এলাকাসহ নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার নানা সমস্যা নিরূপণ ও তা টেকসই সমাধানের উপায় উদ্ভাবন এবং তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী দুইমাস তিনি (সিইও) নিজে এবং তার টীম নিয়ে মাঠে বিচরণ করছেন। জলাবদ্ধতা দূর করে নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে মেয়র মহোদয় সিটির সংশ্লিষ্টদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। তা বাস্তবায়নে আমরা বদ্ধ পরিকর।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোঃ ইকরামুল হক টিটু বলেন, ড্রেনের কাজ চলমান রয়েছে। অনেক জায়গায় অল্প কিছু কাজ বাকি থাকায় পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া সম্প্রসারিত নতুন ওয়ার্ডগুলোতে এখনো কাজ শুরু করা যায়নি। পর্যায়ক্রমে এগুলো করা হলে জলাবদ্ধতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে মেয়র নাগরিকদেরও আরো সচেতন হওয়ার আহবান জানান। তিনি বলেন, অনেকে পাইলিংয়ের মাটি সরাসরি ড্রেনে ফেলে ড্রেন অকার্যকর করে দিচ্ছে। কেউ কেউ আবার ময়লা-আবর্জনা, বোতল, বস্তাসহ কঠিন আবর্জনা ড্রেনে ফেলছে। এ অভ্যাসগুলো পরিত্যাগ করতে হবে, না হলে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে না। 

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দুটি প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহ নগরের সড়ক ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন কাজ চলছে। সড়ক উন্নয়ন ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক নাগরিক সেবা আওতায় ২০২০ সালে এক হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা অনুমোদন দেয় সরকার। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৪৫ দশমিক ৫৩ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। আগামী ২০২৪ সালে প্রকল্পটির কাজ পুরোপুরি শেষ হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
 

ঢাকানিউজ২৪.কম / কেএন

আরো পড়ুন

banner image
banner image