• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে দুই দেশের সম্পর্কে স্বর্ণ যুগের সূচনা


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০১:৪২ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে  স্বর্ণ যুগের সূচনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

মোতাহার হোসেন

নানা দিক থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর অত্যন্ত তাৎপর্যমন্ডি। কারণ এই সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বর্ধিত বাণিজ্য সম্পর্ক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, রোহিঙ্গা সমস্যা, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মাদক চোরাচালান ও মানব পাচার প্রতিরোধসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমাধানে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে দক্ষিণ এশিয়ার দুই নিকট প্রতিবেশি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের এই সফর বিনিময়কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংকট কাটিয়ে উঠতে বর্ধিত সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনায় স্থান পায়। উভয় প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনা, রেলওয়ে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং তথ্য এবং সম্প্রচার বিষয়ে বেশ কিছু চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষও হয়েছে।  সফরকালে প্রধানমন্ত্রী রাজঘাটে ভারতের জাতির পিতা মহত্মা গান্ধীর সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এরপর তিনি নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগাহ পরিদর্শন করেন এবং সেখানে নফল নামাজ আদায়, ফাতেহা পাঠ করেন এবং দেশ ও জাতির এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সমৃদ্ধি ও কল্যাণের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া কামনা করেন। পরে আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি একই স্থানে শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। নোবেল বিজয়ী কৈলাশ সত্যার্থী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। পরে তিনি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সাথে একটি বৈঠক এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় শহিদ বা গুরুতর আহত ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর অফিসারদের বংশধরদের ‘মুজিব বৃত্তি’ প্রদান করেন। ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ফেরার আগে প্রধানমন্ত্রী রাজস্থানের খাজা গরীব নওয়াজ দরগাহ শরীফ, আজমির (আজমির শরীফ দরগাহ) পরিদর্শন করবেন।

ভারতকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্বৃত করে প্রেস সচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী ও বন্ধু দেশ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আলাদা সম্পর্ক রয়েছে। কারণ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারত সম্পূর্ণরূপে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি আরর বলেন, ‘আমাদের সমস্যা থাকতে পারে কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যারই সমাধান করা যায়।

বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘প্রতিবেশী কুটনীতির’ রোল মডেল মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার ৬ সেপ্টেম্বর হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে দেওয়া প্রেস বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। যৌথ বিবৃতির আগে দুই নেতার একান্ত বৈঠক এবং দ্বিপক্ষীয়  বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে ৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। যৌথ বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশ ও ভারত বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার চেতনায় দুই দেশ অনেকগুলো অমীমাংসিত ইস্যু সমাধান করেছে।

তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তিসহ অন্যান্য সকল অমীমাংসিত ইস্যুগুলো দ্রুত সমাধান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন শেখ তিনি। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং নিকটতম প্রতিবেশী। জাতির পিতার অনুসৃত পররাষ্ট্র নীতি অনুযায়ী 'সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়' সেটি বজায় রেখেই সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী ও স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্যমত সাহায্যকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবসময়ে ভারতকে প্রয়োজন। আর একই সঙ্গে বাংলাদেশ যে ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন, তা ধরে রাখতে প্রচুর অর্থ সহযোগিতারও  প্রয়োজন। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আলোকে দুই প্রধানমন্ত্রী ঐক্যমতে এসেছেন। বৈশ্বিক এ পরিস্থিতিতে উপাঞ্চলিক সহযোগী বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন তাঁরা। জ্বালানি সরবরাহ করাসহ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধরে রাখা, একে অপরের সহযোগিতা করা এবং নিত্যপণ্য নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের বিষয়ে সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এসেছে।

এবারের সফরে দুই দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি না হলেও কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে সমঝোতা, বিজ্ঞান বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের মধ্যে সমঝোতা, বিচার বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে সমঝোতা, রেলওয়ের তথপ্রযুক্তিবিষয়ক একটি সমঝোতা, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও প্রসার ভারতীর মধ্যে সমঝোতা এবং মহাকাশ প্রযুক্তি নিয়ে মোট সাতটি সমঝোতা সই হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, জ্বালানি অংশীদারিত্ব, পানি সহযোগিতা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, উন্নয়ন অংশীদারিত্ব এবং মানুষে মানুষে যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেসঙ্গে দুই প্রধানমন্ত্রী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। বর্তমান বৈশ্বিক সংকটময় মুহূর্তে দ্বিপক্ষীয় ও উপাঞ্চলিক সহযোগিতাবিষয়ক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে ঐকমত্য হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। জঙ্গিবাদ দমন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্ত ঘিরে অপরাধ দমনে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

৭টি সমঝোতা স্মারকগুলো হলো-১, সুরমা-কুশিয়ারা প্রকল্পের অধীনে কুশিয়ার নদী থেকে বাংলাদেশ কর্তৃক ১৫৩ কিউসেক পানি প্রত্যাহার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক এমওইউ। ২. বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বিষয়ে ভারতের বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (সিএসআইআর) সঙ্গে বাংলাদেশের সিএসআইআরের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। ৩. বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে ভারতের ভোপালে অবস্থিত ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয় । ৪. ভারতের রেলওয়ের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোতে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য দুই দেশের রেল মন্ত্রণালয় একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। ৫. বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যপ্রযুক্তিগত সহযোগিতার জন্য ভারত ও বাংলাদেশের রেল মন্ত্রণালয় আরেকটি সমঝোতা স্মারক সই করে। ৬. ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্প্ররমাধ্যম ‘প্রসার ভারতীর’ সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ টেলিভিশন। ৭.  মহাশূন্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক সই করে বিটিসিএল এবং এনএসআইএল। সমঝোতা স্মারকটিতে সই করেন বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের বিএসসিএল এবং ভারতের পক্ষে এনএসআইএল ।

গত ৮ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎ হয়েছে ১২ বার। ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুই শীর্ষ নেতার নিয়মিত ব্যস্ততার মধ্যেও ১২ বার দেখা হওয়া বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক নবদিগন্তের সূচনা ঘটে। সেসময়ে শেখ হাসিনা এবং মনমোহন সিংয়ের মধ্যে যে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তা বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রেখেছিল। এর আগে ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন, তখন গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এক নতুন মাত্র যুক্ত হয়েছিল।  বিগত সময়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামার মাধ্যমে ভারত থেকে বঙ্গোপসাগরের মহিসোপানে সমুদ্র সীমা জয় করে, ২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা বাংলাদেশের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়। এসব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নতুন এক উচ্চতায় অবস্থান করছে এবং স্বর্ণযুগ চলছে।  

লেখক: সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম

 

ঢাকানিউজ২৪.কম / কেএন

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image