• ঢাকা
  • বুধবার, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ; ০১ ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

তালেবানের প্রত্যাবর্তন ও সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংকট


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: বুধবার, ১৮ আগষ্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১০:৪৫ এএম
তালেবানের প্রত্যাবর্তন
আফগানের কাবুল বিমান বন্দর

  ড. দেলোয়ার হোসেন.

আফগানিস্তানে পুনরায় তালেবানের উত্থান ঘটতে যাচ্ছে- এটা অনেকটা অনুমিতই ছিল। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণার পর থেকেই তালেবান নানা শহর দখল করে এক ধরনের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করেছিল। কিন্তু এত দ্রুত দেশটিতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে, তা অনেকেই ভাবেননি। রোববার যখন আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল চারদিক থেকে তালেবান বাহিনী ঘিরে ফেলে এবং রাজধানীতে ঢুকতেও শুরু করে, তখন অনেক প্রশ্নই সামনে আসতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ধ্বংসযজ্ঞ এড়াতে 'শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে'র আলোচনা শুরু হয় তালেবান ও আশরাফ গনি সরকারের মধ্যে। আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি সামনে রয়েছে।.

বলার অপেক্ষা রাখে না, আফগানিস্তান বরাবরই বিদেশি শক্তির জন্য এক ধরনের চোরাবালি। দেশটি এর আগে ১৯৮৯ পর্যন্ত ১০ বছর দখলে রাখে সোভিয়েত ইউনিয়ন। প্রায় দশ বছর ধরে চলা দীর্ঘ ওই যুদ্ধকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে 'সোভিয়েত ইউনিয়নের ভিয়েতনাম যুদ্ধ' নামে অভিহিত করা হয়। ওই যুদ্ধকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনেরও অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; কেননা এর ঠিক দুই বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৮৯ সালে সৈন্য প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে রক্তক্ষয়ী ওই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। আর এ বছর আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করা হয় মার্কিন সৈন্য। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান দখল করে। ২০০১ সাল থেকে প্রায় দুই দশক আমেরিকার সৈন্যরা আফগানিস্তানে অবস্থান করে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান আফগানিস্তান শাসন করে। তালেবান শাসনের ব্যাপক সমালোচনা হয় বিশ্বব্যাপী। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরেও এক ধরনের গৃহযুদ্ধের মতো অবস্থা তৈরি হয়। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন, কিন্তু কার্যত দেশটি এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এসে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করে ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান ঘটান। যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে দীর্ঘ এই যুদ্ধ চালাতে গিয়ে অনেক মাশুল দিয়েছে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় আড়াই হাজার সেনা নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ২০ হাজারের বেশি। আর অর্থকড়ি ব্যয় হয়েছে পাহাড়সমান। আফগান যুদ্ধের জন্য মার্কিন করদাতাদের প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার জোগাতে হয়েছে।.

দুই দশক থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যখন আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন, তখন থেকেই তালেবান তার ব্যাপক শক্তিমত্তা নিয়ে আক্রমণ শুরু করে। অবশেষে সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। তবে আফগানিস্তানে অনেকের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। এরই মধ্যে কাবুলে মার্কিন দূতাবাসের সিংহভাগ কূটনীতিক ও মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত সরিয়ে নিতে তিন হাজার সেনাকে কাবুলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেও এখন যেহেতু অবস্থা পাল্টে গেছে, সেহেতু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কী হবে, সেটা আমরা দেখব। বলাবাহুল্য, জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগ থেকেই আফগান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সফল হবে না।.

আফগানিস্তানের শাসনক্ষমতা পুনরায় যখন তালেবানের হাতে যাচ্ছে, তখন আফগানিস্তানের জন্য কী অপেক্ষা করছে- এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর আগে ১৯৯৬ সালে তালেবান যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখনই আমরা তাদের শাসনের রূপ দেখেছিলাম। তারা ইসলামের নামে মানবসভ্যতার নিদর্শন ধ্বংস, হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নারীদের পশ্চাৎপদ করে রাখে। ওই সময় দেশটির জনগণ, বিশেষ করে আফগান নারীদের স্বাধীনতা তারা খর্ব করেছে। ১৯৯৭ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানকে ইসলামী রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। আরব দেশের মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং পাকিস্তান তালেবান সরকারকে সমর্থন দেয়। যদিও তখনও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গৃহযুদ্ধ চলছিল। তাদের সাম্প্রদায়িক শাসনে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় জঙ্গিগোষ্ঠী। তালেবানি পশ্চাৎপদ শক্তিগুলো আফগানিস্তানে যেভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় আরও বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী অনুপ্রাণিত হতে পারে।.

তালেবান যেভাবে দখল করল তাতেই তাদের চরিত্র উন্মোচিত হয়। কিন্তু তারপরও আমরা দেখছি, তালেবানের ব্যাপারে পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলোর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। যদিও এসব দেশ শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তালেবান নিয়ে তাদের আপত্তি নেই। যদিও তাদের অবস্থান অনেকটা স্ববিরোধী, তার পরও স্বার্থের কারণে তারা তালেবানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে- এই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তার মানে আফগানিস্তানে আমরা পরাশক্তিরও নতুন পালাবদল দেখছি। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা তার মিত্র ভারতও নেই।.

আন্তর্জাতিক বিশ্নেষকদের সঙ্গে এ ব্যাপারে দ্বিমত করার সুযোগ সামান্যই যে, বিশ বছর পর তালেবানের এই উত্থানের পেছনে সম্পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে দুটি বড় দেশ চীন এবং রাশিয়ার। অন্য একটি দেশ পাকিস্তানও যদি আগাগোড়া তালেবানের পাশে না থাকত, তাহলে তারা এই অবিশ্বাস্য ঝড়ের গতিতে সামরিকভাবে অগ্রসর হতে পারত কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। খবরে প্রকাশ, তালেবানের প্রতিনিধি দল গত মাসে চীন সফরে যায়। চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, শান্তি প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনার কথা বলা হলেও স্পষ্টতই বোঝা যায়, চীন তালেবানকে সমর্থন দেয়। ইরানের রাজধানী তেহরানে আফগান সরকারের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর তালেবান প্রতিনিধি দল সর্বশেষ রাশিয়াও সফর করে।.

যদিও তালেবান প্রতিনিধি দল চীনের কাছে প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টি করবে না বলে অঙ্গীকার করে। কিন্তু এটা অনেকটাই স্পষ্ট, তা কূটনৈতিক পরিভাষা। বাস্তবে আমরা মনে করি না, তালেবানের রাজনৈতিক মতাদর্শের কোনো পরিবর্তন হয়েছে। বস্তুত, মার্কিন সমর্থিত সরকারও ২০০৪ সালে লিখিত আফগানিস্তানের সংবিধানে বলেছে, তারা ইসলামবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করবে না। দেশটির নাম ইসলামিক রিপাবলিক অব আফগানিস্তান। স্বাভাবিকভাবেই আমরা সেখানে তালেবানের আগের রূপই হয়তো দেখব।.

তালেবানের শাসনের আগের শাসনে জঙ্গিবাদের নতুন যে উত্থান আমরা দেখেছি, নতুন করে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় তার হুমকি তৈরি হবে। এখানে বাংলাদেশের জন্যও দুশ্চিন্তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের নিয়ে এমনিতে বাংলাদেশ সংকটে রয়েছে। এর সঙ্গে আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানও নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। দু'দিন আগেই ঢাকার পুলিশ কমিশনার বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে কিছু মানুষ এরই মধ্যে তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছে। কিছু মানুষ ভারতে ধরা পড়েছে, আর কিছু হেঁটে বিভিন্নভাবে আফগানিস্তানে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। আসলে বাংলাদেশ থেকে যারা যাওয়ার চেষ্টা করছে, আফগানিস্তানের সঙ্গে পুরোনো যোগাযোগের সূত্র ধরেই নতুন করে তারা যেতে চাইছে। যারা একসময় আফগানিস্তানের হয়ে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে 'মুজাহিদিন' হিসেবে সে দেশে যায়। তাদের অনেকেই পরবর্তী সময় বাংলাদেশে নানা জঙ্গি তৎপরতা চালায়। এর সঙ্গে এটাও বলা প্রয়োজন, স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ অবস্থায় বাংলাদেশ অতীতে আফগানিস্তানের সঙ্গে কাজ করেছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আফগানিস্তানের উন্নয়নে বাংলাদেশ অংশীদার হতে চাইবে।.

তবে পরিস্থিতি কোনদিকে যায়, আপাতত সেটাই পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তালেবান যদি আগের উগ্রবাদী আচরণ অব্যাহত রাখে তবে সংকট ঘনীভূত এবং এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। দ্বিতীয় আরেকটি সংকট আমরা দেখছি, আফগানিস্তান নিয়ে পরাশক্তির খেলা। ভূরাজনৈতিক প্রভাববলয় বিস্তার করতে এখন আফগানিস্তানে নতুন 'গেম' ও 'প্লেয়ার' আমরা দেখব। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও যে আফগানিস্তানের এ পরাজয় স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে, তেমনটি ভাবার কারণ নেই। ফলে এই পুরো অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও হয়তো আমরা সহসাই দেখব। চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতাও এখানে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। আফগান পরিস্থিতি অতীতের চেয়ে আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ। এই ব্যর্থতা মিয়ানমারের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি। তালেবানের প্রশ্নবিদ্ধ কোনো ভূমিকায়ও হয়তো আমরা দেখব জাতিসংঘ নিশ্চুপ। বিশেষ করে পরাশক্তিগুলো যখন আফগানিস্তান নিয়ে খেলছে, নিরাপত্তা পরিষদে 'ভেটো' ক্ষমতার কারণে জাতিসংঘ দেশটির ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে বলে মনে হয় না।.

আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার এ সময়ে বাংলাদেশকে ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সতর্কতার সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা জানি না, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে কী ঘটবে, সেখানে আবার গৃহযুদ্ধ দেখা দেয় কিনা- তাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। মুহূর্তে মুহূর্তে পাল্টে যাচ্ছে প্রেক্ষাপট। পরাশক্তিগুলোর ভূমিকাই বা কী হবে, তাও ভবিষ্যৎই বলবে।.

অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়. .

ঢাকানিউজ২৪.কম /

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image