• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ৭ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ; ২০ জানুয়ারী, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু বাঙালির হৃদয়ে চিরভাস্বর


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: শনিবার, ১৪ আগষ্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১১:২২ পিএম
যোগ্য উত্তরাধিকারী দেশরত্ন শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

সুবল চন্দ্র সাহা

শোকের মাস আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকরা। সৌভাগ্যক্রমে দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে তার নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু আরও শক্তিশালী ও তেজস্বী। তিনি অমর হয়ে আছেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায়।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ১৬৭টি আসন পেয়ে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৭ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ৩১০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৮৭টি আসনে জয়লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। জেনারেল ইয়াহিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গড়িমসি শুরু করেন। ইয়াহিয়া খান মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

দুর্ভাগ্যবশত, ইয়াহিয়া খান তার কথা রাখলেন না। এমনকি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৩৫ জন সদস্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য ঢাকা এসেছিলেন। এদিকে ইয়াহিয়া খানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওমর ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন। মুসলিম লীগের জ্ঞানপাপী ফজলুল কাদের চৌধুরী, ওয়াহিদুজ্জামান, সবুর খান প্রমুখ রাজনৈতিক নেতা ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।

পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক কমান্ডারদের প্রতি তেমন বিশ্বাস ছিল না পাকিস্তান সরকারের। ১৯৭০ সালের শেষদিকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার ছিলেন জেনারেল ইয়াকুব। তিনি দেখলেন, সিভিল গোটা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে চলে গেছে। তাই সামরিক বাহিনী দ্বারা সমাধান করা সম্ভব নয়। জেনারেল ইয়াকুব নিজ উদ্যোগে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যান্টনমেন্টগুলোতে ফিরিয়ে আনলেন। ইয়াহিয়া খানকে পূর্বাপর ঘটনা বর্ণনা করে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ঢাকা সফরে আসার অনুরোধ করেন তিনি। কিন্তু ইয়াহিয়া খান ঢাকা আসতে রাজি না হওয়ায় জেনারেল ইয়াকুবের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

১৯৭১ সালের ৫ মার্চ জেনারেল ইয়াকুব পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে 'কোনো সামরিক সমাধান নেই- সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত।' জেনারেল ইয়াকুবের দাখিল করা পদত্যাগপত্র ইয়াহিয়া খান কর্তৃক গৃহীত হয় এবং 'বেলুচিস্তানের কসাই'খ্যাত টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এ সময়ে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর অলিখিত নির্দেশে সিভিল প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছিল।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর টিক্কা খান শপথ গ্রহণের জন্য ঢাকা হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। ওই সময় ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন বদরউদ্দিন সিদ্দিকী। পূর্ব পাকিস্তানের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর এবং সামরিক আইন প্রশাসককে তিনি শপথ পড়াতে অস্বীকার করেন।

১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন। অধিবেশনের দিন ধার্য করার বিষয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার অজুহাতে অযথা কালক্ষেপণ করতে থাকেন। এ সময় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র পূর্ব পাকিস্তানে এনে জড়ো করা হতে থাকে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ জনতার উপস্থিতিতে দেশবাসীকে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' তিনি আরও বলেন, 'যার যা আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।'

৭ মার্চের সেই ভাষণ বাংলার মানুষকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল। ৭ মার্চের ভাষণটি ছিল অলিখিত। কোনোরূপ প্রস্তুতি গ্রহণ না করেই মাত্র ১৮ মিনিটের ভাষণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সরকারের দীর্ঘ ২৪ বছরের বৈষম্যমূলক কার্যকলাপ, শোষণ ও বঞ্চনার কথা অপূর্ব বাগ্মিতা ও তেজোদীপ্ত ভাষায় জনগণের কাছে তুলে ধরেন। বক্তৃতার মাধ্যমে রচনা করেন একটি মহাকাব্য।

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন বলে ছাত্র নেতৃবৃন্দসহ অনেকেই আশা করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ। বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে তিনি চাননি। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। সংগত কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠরা কখনোই সংখ্যালঘিষ্ঠদের কাছ থেকে আলাদা হওয়ার আবদার করতে পারে না। রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিমাত্রেই বুঝতে বাকি থাকল না যে, পরোক্ষভাবে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে স্বাধীনতার আহ্বানই জানালেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি বিশ্ববিখ্যাত নেতৃবৃন্দের ভাষণের মতো সারা বিশ্বে সমাদৃত। ইউনেস্কো ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে 'মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক জান্তা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নির্মম, নিষ্ঠুর 'বেলুচিস্তানের কসাই' টিক্কা খানের নির্দেশে সামরিক জান্তা রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স, পিলখানা বিডিআর হেড কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন স্থানে অতর্কিত আক্রমণ করে। পুলিশ, ইপিআর (অধুনা বিজিবি), আনসারসহ অসংখ্য নরনারীকে হত্যা করে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। তারা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। বিশ্বের ইতিহাসে বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা চরমতম নিষ্ঠুরতার এক কালো অধ্যায় রচনা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগমুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এর পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয় বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা। পাকিস্তান সামরিক জান্তা মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর কাছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করে। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে দেশ গঠন কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে গ্রহণ করেন নানাবিধ উদ্যোগ। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তখনও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে ছিল না। তারা এদেশের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি। বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া তারা মানতে পারেনি। তাই তো বাঙালি আর বাংলাদেশের আদর্শ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় তারা। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে ঘাতকরা বাংলাদেশকে আবার উল্টোপথে ফেরাতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। তারা জানত না যে, বাঙালির কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতিই ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধ্যান-জ্ঞান। যতই দিন যাবে, বাঙালি সংস্কৃতি তাকে সহস্রাব্দ থেকে সহস্রাব্দ পর্যন্ত চিরঅম্লান করে রাখবে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির আস্ম্ফালন ও দম্ভোক্তি শুভশক্তির কাছে পরাভূত হবে- এটা সুনিশ্চিত।

বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির নেতা ছিলেন না; ছিলেন বিশ্বের নিপীড়িত-নিষ্পেষিত মানুষের নেতা। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বঙ্গবন্ধুর নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে সুখ্যাতি রয়েছে। মহাত্মা গান্ধী, বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র বসু, মহামতি লেনিন, হো চি মিন, মাও সে তুং, কামাল আতাতুর্ক, জোসেফ ব্রজ টিটো, ফিদেল কাস্ত্রো, ইন্দিরা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা প্রমুখ মুক্তিকামী নেতার মতো চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন বঙ্গবন্ধু।

বাংলাদেশে আজ দৃশ্যমান অনেক উন্নতি হয়েছে বটে। একই সঙ্গে সংঘাত, সন্ত্রাস এবং 'মাইম্যান' সৃষ্টির প্রবণতা দ্রুত বেড়ে চলেছে। সবাই যেন টাকার পাহাড় গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। পদ-পদবির দাম্ভিকতায় দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলতেও যেন তাদের অনীহা। সততা, ন্যায়নীতি, মানবতা যেন আজ তুচ্ছ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আসুন, হিংসা-বিদ্বেষ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আর ব্যক্তি-প্রাধান্যের আস্ম্ফালন ভুলে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণে সোনার বাংলা গড়ে তুলি। যেখানে থাকবে না মানুষে মানুষে হানাহানি, হিংসা-বিরোধ আর মানবিক অবক্ষয়। সেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষ মিলিত হবে এক প্রীতির বন্ধনে।

বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার রক্ত, আদর্শ ও নেতৃত্বের যোগ্য উত্তরাধিকারী দেশরত্ন শেখ হাসিনা পিতার আদর্শ ও চেতনা বাস্তবায়নে কাজ করছেন। তিনি বিশ্বে বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিণত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়ন করছেন। আসুন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্টম্ন সোনার বাংলা তথা সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ বিনির্মাণে সচেষ্ট হই।

লেখক:  বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আইনজীবী; সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ফরিদপুর জেলা শাখা ।

ঢাকানিউজ২৪.কম /

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image