• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ১৭ মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

দেশের উচ্চ শিক্ষা পরিস্থিতি


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০২:৩৯ পিএম
উচ্চ শিক্ষা পরিস্থিতি
শাবিতে অনশনরত শিক্ষার্থীরা

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আচরণ ও কথাবার্তা শুনে অবাক হতে হয়। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানোর জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া দরকার। ওই প্রকল্পের আওতায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ঘটানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। নানা দাবিই ছিল তাদের আন্দোলনে। বর্তমানে তাদের দাবিগুলো একটিতে পরিণত হয়ে গেছে, তা হলো ভিসির পদত্যাগ। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ভিসি পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে হামলাও করেছেন। শিক্ষার্থীরা বর্তমানে কোনো আলোচনায় বসতে রাজি তবে তা হতে হবে অনলাইনে, কারণ অনলাইনে আলোচনার বিষয়গুলো সব শিক্ষার্থী দেখতে পারবে। ভিসির পদত্যাগের আন্দোলনে প্রতিনিধিত্বকারী শিক্ষার্থীরা আলোচনার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে চান, যাতে সাধারণ শিক্ষার্থীও আলোচনার বিষয়গুলো দেখাতে ও শুনতে পারে। কাফনের কাপড় জড়িয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন তাদের কাছে নিজের জীবনের চেয়ে ভিসির পদত্যাগ করার বিষয়টি এখন জরুরি।

শাবিপ্রবিতে আন্দোলন করছেন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী, কয়েক হাজার জীবন উৎসর্গ করতে রাজি তারপরও তারা ভিসির পদত্যাগ চান। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন শিক্ষার্থীরা এমন অনড় অবস্থায় চলে গেলেন? আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের ঢাকায় এসে চ্যান্সেলরের সঙ্গে আলোচনা করার কথা উঠেছিল। তাতে কোনো কাজ হয়নি। ভাইস চ্যান্সেলর পদে কোনো শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয় কি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য। এটা কিন্তু কোনো শিক্ষকের ইগো রক্ষার করার বিষয় নয়। কেউ কেউ বলছেন এটা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির আন্দোলন, আবার কেউ বলছেন এটা বাইরের কোনো ইন্ধনে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ বলছেন, এটা ইন্টার্রনাল পলিটিক্স। কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা তা বড় বিষয় না, বড় বিষয় হলো বর্তমান ভিসি সম্পূর্ণভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ, কারণ তার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অযোগ্যতার জন্য আজ শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশনে করছেন। গণমাধ্যমের সংবাদের তথ্য থেকে জানা যায়, অনশনরত শিক্ষার্থীদের পস্নাস বিপি রেট, রক্তের সুগারের মাত্রা অনেক নিচে নেমে গেছে। তারা যে কোনো সময় মারাত্মক ধরনের অসুস্থ হয়ে যেতে পারে।

আন্দোলন কেন্দ্রিক ভিতরে-বাহিরে কি কি সমস্যা আছে তা দেখার বিষয় না। এই আন্দোলন কেন দানা বাঁধল এই ভিসির দায়িত্ব পালনে। তার উত্তরটা ভিসিকেই দিতে হবে। কারণ ভিসির অযোগ্যতার বিষয়টি আগে তদন্ত করে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কার করা দরকার।

একজন শিক্ষক কতটা নির্লজ্জ হতে পারে তা শাবিপ্রবির বর্তমান প্রেক্ষাপট দেখলেই বোঝা যায়। কারণ ভিসির ক্ষমতা আকড়ে বসতে থাকার বিষয়টি মনে করিয়ে দেয় মধ্যযুগীয় শাসকদের কথা। কারণ মধ্যযুগের শাসকরা জোরপূর্বক একটি ভূখন্ড দখল করে নিয়ে দমন-পীড়ন করার মাধ্যমে নিজকে শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করত। স্বাধীন বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি হঠাৎ জেগে ওঠা কোন চর বা দ্বীপ। এটা শিক্ষার্থীর শিক্ষালয়। তাই শিক্ষার্থীরা না চাইলেও দমন-পীড়নের মাধ্যমে দখল ধরে রাখতে হবে। এটা কেমন মানসিকতা একজন শিক্ষকের। উনি যদি প্রকৃত ভদ্রলোক হতেন তাহলে কারণ তদন্তের আগে সরে দাঁড়িয়ে, তদন্ত করে মূল কারণটি উদ্ঘাটন করতেন। এবং জাতিকে বুঝিয়ে দিতেন তিনি নির্দোষ। এ রকম মানসিকতার শিক্ষকদের কাছে শিক্ষার্থীরা কি শিক্ষা পাচ্ছে তার একটি মূল্যায়ন করা দরকার।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নাকি কতিপয় শিক্ষকদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কথা বলেছে, তার প্রতিবাদ করেছেন ডক্টর লায়লা আশরাফুন নামে জনৈক শিক্ষক। একটি গণমাধ্যমের সংবাদ থেকে জানা যায় তিনি বলেছেন 'আমরা চাষাভুষা নই যে আমাদের নিয়ে কেউ বাজে কথা বলবে।' প্রশ্ন হচ্ছে, এদেশের যারা জমি চাষ করেন তারা কি মানুষ না? তাদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কথা বললে তা জায়েজ হয়ে যাবে। এই চাষাভুষাদের পরিশ্রমের টাকা দিয়ে আপনাদের বেতন হয়, আর আপনাদের নিয়ে কথা বললে না জায়েজ হয়ে যাবে আর ওদের নিয়ে বাজে কথা বললে জায়েজ হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষকদের এ ধরনের ঘৃণ্য মানসিকতাই আজ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিম্নমুখী। এদেশের একজন সাধারণ কৃষক এ ধরনের প্রতিবাদ দেখলে ক্ষমতা আকড়ে ধরে রাখত না। কারণ এদেশের সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, দেশের কতিপয় শিক্ষকদের মতো এতটা নির্লজ্জ না।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবাসিক। এজন অভিভাবক যখন তার সন্তানকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কারান, ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সেই শিক্ষার্থীর অভিভাবকত্ব ন্যস্ত হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হাতে। শিক্ষার্থীর ভালো-মন্দ দেখা তার আবাসনসহ সবকিছুর দায়-দায়িত্ব পালন করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে। দেশের বাস্তব প্রেক্ষাপটে কি দেখা যায়, বুয়েটের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন আবাসিক শিক্ষার্থী খুন হয়। ওই আবাসিক হলের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের দায়িত্ব অবহেলা এবং খুনের দায়ে দোষী হতে দেখা যায় না। শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষক মধ্যযুগীয় কায়দায় শিক্ষার্থীদের মাথার চুল কেটে নেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেছেন, জাহাঙ্গীরনগরে পড়ুয়া মেয়েদের কেউ বউ হিসেবে নিতে চায় না, না চাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন মেয়েরা সারারাত ঘোরাঘুরি করে, তাই তাদের পুরুষরা বউ করতে আপত্তি জানায়। তার কথায় অশ্লীল ও কদর্যতার প্রকাশটা যে কেউ বুঝতে পারছে। শিক্ষকরা বাবার সমতুল্য। সন্তানদের মতো করে শিক্ষার্থীদের লালন করাটাই শিক্ষকের দায়িত্ব। জাহাঙ্গীরনগরের ওই শিক্ষক কি নিজ মেয়েকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করতে পারবেন।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানসিকতা এবং রুচি নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষকদের নৈতিক মূল্যবোধের কতটা অধঃপতন ঘটেছে তা ভাবতে অবাক হতে হয়। দেশের রাজনীতি নাকি গোলস্নায় গেছে, কথাটা অনেকেই বলে থাকেন। কেন গোলস্নায় গেল তার কারণটি কি? তার মূল কারণটা হলো দেশের শিক্ষকদের হীন মানসিকতা।

জাতি গঠনের কারিগরদের মানসিকতা এত নীচ হয়, সেখানে ভালো জাতি আশা করা যায় না। জাতি গঠনে যারা মুখ্য ভূমিকা পালন করবে, তারাই তো মানসিকভাবে অসুস্থ। কারণ কোনো সুস্থ মানুষ নিজ শিক্ষার্থীদের নিয়ে এ ধরনের বাজে কথা বলতে পারেন না। স্বাধীনতার পূর্বে এদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়, ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানি সেনারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে অবস্থান নেয়। পাকিস্তানি সেনারা সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমন করতে প্রবেশ করতে চেয়েছিল। ওইদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর সামসুজ্জোহা পাকিস্তানি আর্মিদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশে বাধা দেয়, পাকিস্তানি আর্মিরা তাকে গুলি করে, তিনি মূল ফটকেই প্রাণ হারান। নিজের জীবন দিয়ে ডক্টর সামসুজ্জোহা সন্তানসম শিক্ষার্থীদের রক্ষা করেন।

আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আচরণ ও কথাবার্তা শুনে অবাক হতে হয়। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানোর জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া দরকার। ওই প্রকল্পের আওতায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ঘটানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

কলাম লেখক: শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

ঢাকানিউজ২৪.কম / শাহ মো. জিয়াউদ্দিন/কেএন

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image