• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ২৮ জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

জনবান্ধব জনপ্রশাসন


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০৪:০০ পিএম
জনবান্ধব জনপ্রশাসন
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

মো: ফিরোজ মিয়া

সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্ঠা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য’; গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের এ মূলমন্ত্র সংযোজনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল জনপ্রশাসন যেন কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন না হয়ে জনবান্ধব প্রশাসন হয়। এছাড়াও এই মূলমন্ত্রের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল, এ মূলমন্ত্রকে ধারণ ও কার্যে পরিণত করে যেন বাংলাদেশের জনপ্রশাসন আদর্শ জনবান্ধব জনপ্রশাসন হিসেবে গড়ে ওঠে এবং সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়কে বাস্তবে রূপ দেয়।

জনপ্রশাসনের কাজ বহুমাত্রিক। জনপ্রশাসনের কর্মচারীগণ কখনো সহায়তাকারী, কখনো সাহায্যকারী, কখনো সমন্বয়কারী, কখনো নিয়ন্ত্রণকারী, কখনো নির্দেশনা দাতা, কখনো ব্যবস্থাপক এবং কখনোবা তদারককারী। এক কথায় বলতে গেলে জনপ্রশাসনের কর্মচারীগণ হচ্ছেন সরকার পরিচালনায় রাষ্ট্রনিযুক্ত সহায়তাকারী। জনপ্রশাসন  রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত হওয়ায় তাদের প্রদান দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণ বা জনসেবামূলক কার্যাদিতে সরকারকে সহায়তা করা। এছাড়াও জনপ্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করা, সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখা, অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করা, পরিবেশ সংরক্ষণ করা, উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করা এবং আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

এছাড়াও জনপ্রশাসন যে সব দায়িত্ব পালন করে, তা হচ্ছে সরকারি নীতি নির্ধারণে সহায়তা প্রদান, সাংগঠনিক কর্মপন্থা নির্ধারণ, ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ, জনবল কাঠামো সুষম করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনশক্তির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধকরণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিগত উন্নয়নের দ্বারা সরকারি কার্যক্রমে মিতব্যয়িতা নিশ্চিতকরণ এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাজেটারি প্লানিং ও নিয়ন্ত্রণের সঠিক পদ্ধতি নির্ধারণ। প্রকৃত উন্নয়নের দ্বারা জনগণের জীবনযাত্রার গুনগতমান উন্নয়ন করে জনগণের সার্বিক কল্যাণসাধনে সরকারকে সহায়তা করাও জনপ্রশাসনের কাজ।

জনগণের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তাসহ সার্বিক নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বও জনপ্রশাসনের উপর ন্যস্ত। এ দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন সুশাসন প্রতিষ্ঠা। যে জন্য বলা হয়, জনবান্ধব জনপ্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সুশাসনের সহায়ক আইন প্রণয়নে সরকারকে সহায়তা করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করাও জনপ্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
জনবান্ধব প্রশাসন সর্বদাই শক্তিশালী প্রশাসন, যারা ব্যর্থতার দায় ও ভুল স্বীকার করে তা সংশোধনের চেষ্টা করে। তারা তাদের চিন্তা, জ্ঞান, দক্ষতা ও সততার ঘাটতি আড়াল করার চেষ্টা করে না। এ প্রশাসন সর্বদাই যে কোনো শ্রেণি বা পেশার সুপরামর্শ গ্রহণ করে। তারা নিজেদের মতামতকেই সর্বোচ্চ সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করে না। তারা অন্যের ভাল মতের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হয়। তারা নিজেদেরকে জনগণের প্রভু না ভেবে জনগণের বন্ধু ভাবে এবং জনগণও তাদেরকে সহায়তাকারী বন্ধু ভাবে।  

নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রশিক্ষিত জনবলই আদর্শ জনবান্ধব প্রশাসনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। আদর্শ জনবান্ধব জনপ্রশাসন সর্বদাই নিজস্ব বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের উর্ধ্বে থেকে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। সংবিধান ও আইনকে সমুন্নত রেখে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে। জনগণের অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার প্রদান করে। সামাজিক বৈষম্যদূরীকরণমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করে সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে। জনসমস্যা অনুধাবন এবং তার সমাধানের উপায় উদ্ভাবন করে। নিজস্ব স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও আন্তরিকতা প্রদর্শনের দ্বারা জনগণের আস্থা অর্জন করে।

জনপ্রশাসনকে কাজ করতে হয় সেবামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, থাকতে হয় সেবামূলক মানসিকতাও। জনগণকে উদ্ভুদ্ধকরণের গুণসম্পন্নও হতে হয়, থাকতে হয় কৃত কাজের ভবিষ্যতের ফলাফল অনুধাবনের সক্ষমতাও। সরকারি পরিসেবামূলক কার্যক্রমের দক্ষ ব্যবস্থাপনার উপর জনপ্রশাসনের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। জনপ্রশাসনকে এমন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হয়, যাতে করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উত্তরোত্তর বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, সামাজিক উন্নয়ন বৃদ্ধি পায়, পরিবেশের ক্ষতিসাধন না করে কার্যকর অবকাঠামোগত উন্নয়ন  ঘটে; সর্বোপরি জনস্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।

নীতি নির্ধারণে সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন এবং গৃহিত নীতির বাস্তবায়নের দায়িত্ব জনপ্রশাসনের ওপরই ন্যস্ত থাকে। অনেক সময় প্রশাসনিক বিভিন্ন আইন ও আমলাতান্ত্রিক জনবল কাঠামো উক্ত দায়িত্ব পালনে এবং জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে ওঠার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে প্রশাসনিক আইন ও জনবল কাঠামোকে সময় সময় যুগোপযোগী করতে হয়।

সরকার এ ব্যাপারে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রশাসনিক আইন যুগোপযোগী করার অংশ হিসেবে শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা নতুন ভাবে জারি করা হয়েছে। বহু প্রত্যাশিত সরকারি চাকরি আইনও জারি করা হয়েছে। যদিও উল্লেখিত বিধি ও আইনে কিছু ক্রটি ও অসামঞ্জস্যতা রয়েছে, যা সরকারের জারিকৃত শুদ্ধাচার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় জনবান্ধব প্রশাসন গড়ার পথে অন্তরায় হতে পারে। তাছাড়া এমন কিছু বিধান সংযোজিত হয়েছে, যা জনপ্রশাসনের ভাবমূর্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া এরূপ বিধান জনগণ ও জনপ্রশাসনের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। এসব ক্রটি ও অসামঞ্জস্যতা দূর করা হলে উক্ত আইন ও বিধি জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ায় নিশ্চিতভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ার জন্য জনপ্রশাসনের সদস্যদের স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই। জনপ্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য শুদ্ধাচার কৌশল জারি করা ছাড়াও সরকার কর্মচারীদের প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে সম্পদের হিসাব দাখিলের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দাখিলে অনেকটা অনীহা থাকায় সম্পদের হিসাব দাখিলের ব্যাপারে একাধিকবার নির্দেশনাও জারি করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সম্পত্তির হিসাব দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারকে আরো কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কেননা একজন কর্মচারীর আর্থিক স্বচ্ছতা নিরুপণের মাপকাঠি তার সম্পদ বৃদ্ধির আনুপাতিক হার। জনপ্রশাসনের কর্মচারীদের আর্থিক স্বচ্ছতার বিষয়টি যদি জনগণের কাছে অস্পষ্ট থাকে, বা প্রশ্নবিদ্ধ থাকে, তাহলে জনগণ কখনোই জনপ্রশাসনকে বান্ধব হিসেবে বিবেচনা করবে না।  

জনপ্রশাসনের জনবল কাঠামো যুগোপযোগী করার বিষয়ে ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হতে নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে এবং কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে কার্যক্রমও গ্রহণ করেছে। জনবল কাঠামো যুগোপযোগী করার ক্ষেত্রেও লক্ষ্য রাখতে হবে যেন জনস্বার্থের চেয়ে কর্মচারীদের স্বার্থকে অধিক প্রাধান্য দেওয়া না হয়।  

সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার আইনকানুন, নিয়মনীতি, পরিকল্পনা ও বিভিন্ন কৌশল প্রণয়ন করে। আর এসবের বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে জনপ্রশাসনের উপর। এছাড়া এসব প্রণয়ন ও প্রয়োগের দ্বারাই কেবল সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সামগ্রিক ও নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ, যা করার দায়িত্ব জনপ্রশাসেনর উপরই ন্যস্ত। তাই জনপ্রশাসনকে হতে হয় প্রশিক্ষিত, দক্ষ ও কর্তব্যনিষ্ঠ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মৌলিক মানবাধিকার সমুন্নত রাখা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা, সামাজিক বৈষম্য দূর করে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জনপ্রশাসনের ভ‚মিকা অপরিসীম।

জনপ্রশাসনকে জনবান্ধব হওয়ার জন্য কতকগুলো নৈতিকনীতি অনুসরণ করতে হয়। সততা যেমন জনপ্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৈতিকনীতি, তেমনি শুদ্ধতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যও গুরুত্বপূর্ণ নৈতিকনীতি। এছাড়াও জনপ্রশাসনের কর্মচারীগণকে হতে হয় নিঃস্বার্থ, কর্তব্যনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ, আত্মবিশ্বাসী, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, দক্ষ, তৎপর, মিতব্যয়ী এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। জনপ্রশাসনের কর্মচারীগণ এসব নৈতিকনীতির অনুশীলন করলে তাদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি হবে, যা জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ার পক্ষে সহায়ক হবে।

সরকারি সেবার মান বৃদ্ধি, কম সময়ে স্বল্প ব্যয়ে এবং ভোগান্তি ছাড়া সেবা প্রদান এবং কর্মচারীদের মাঝে স্বপ্রণোদিতভাবে সেবা প্রদানে এগিয়ে আসার মনোবৃত্তির বিকাশের লক্ষ্যে সরকার ২০১৫ সালে অভিযোগ প্রতিকার নির্দেশিকা জারি করে স্বল্প পরিসরে হলেও এর বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এ ছাড়া সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি বা সিটিজেন চার্টারও প্রতিটি দপ্তরে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী সেবা প্রদান ও অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাকে প্রতিটি সরকারি দপ্তরের প্রশাসনিক দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করে এর বাস্তবায়নে অধিক মনোযোগী হলে জনবান্ধব প্রশাসন গড়ায় তা যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।

অভিযোগ প্রতিকার নির্দেশিকা ছাড়াও সরকার সরকারি চাকরি আইনে নির্ধারিত সময়ে সরকারি সেবা প্রদানের বিধান সংযোজন করে জনপ্রশাসনের কর্মচারীদেরকে বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ করেছে। কোনো কর্মচারী যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে সরকারি কোনো কার্য বা সেবা প্রাপ্তির আবেদন নিষ্পত্তি না করলে বা যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছাড়া প্রার্থীত সেবা সরবরাহ বা অনুরূপ আবেদন নিষ্পত্তি না করলে বা প্রত্যাখ্যান করলে সেবা প্রার্থী প্রতিকার চাইতে পারবেন এবং ক্ষতিপূরণও আদায় করতে পারবেন। কিন্তু সরকারি আইনের উক্ত বিধানে কিছু অসঙ্গতি থাকায় এবং উক্ত বিধান বাস্তবায়নের জন্য এ সংক্রান্ত বিধিমালা অদ্যাবধি জারি না হওয়ায় উক্ত বিধানের আওতায় সেবা প্রার্থীরা এখনো তেমন সুফল পাচ্ছেন না। আইনের বিধানের অসঙ্গতি দূর করে এ সংক্রান্ত বিধিমালা জারি করা হলে তা থেকে সেবাপ্রার্থীরা উপকৃত হবে।

এছাড়া জনপ্রশাসনের কর্মচারীরাও তাদের অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালনে এবং ভোগান্তি ছাড়া সেবা প্রদানে বাধ্য হবে। তবে জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য জনপ্রশাসনকে কেবল আর্থিক দুর্নীতিমুক্ত হলেই চলবে না, বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিমুক্তও হতে হবে।

লেখক-অতিরিক্ত সচিব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (অব:)

ঢাকানিউজ২৪.কম / কেএন

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image