• ঢাকা
  • রবিবার, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ২৯ মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

শ্রীলংকার অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণ কি সম্ভব ?


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ০৭ এপ্রিল, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০৩:১১ পিএম
করোনার কারনে সংকট ঘনীভূত হয়
শ্রীলংকার অর্থনৈতিক সংকট

আলি জামান

শ্রীলংকার অর্থনৈতিক সংকটের ধারাবাহিকতায় দেশটিতে এখন রাজনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে। দেশটির শাসকরা কাল বিলম্ব না করে সর্বদলীয় সরকার গঠনের ডাক দিলেও বিরোধী দল তাতে সাড়া দেয়নি। বরং শাসক দলের কোয়ালিশন শরীক সাংসদরা দলত্যাগ করায়,সরকার টলটলায়মান হয়ে পড়েছে।

সংকট কিন্তু এই সরকারের আমলে শুরু হয়নি।সংকটের সুচনা অনেক আগে থেকেই হয়েছে। করোনার কারনে সংকট ঘনীভূত হয়েছে,যা এখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হলো,এই সংকট উত্তরনের উপায় বা পথ কি?

বিষয়টা খুব দুরহ।এখানে "ফাইন্যান্সিয়াল বেইল আউট", অর্থাৎ নতুন ঋণ তথা আর্থিক সহযোগিতা  দরকার। গ্রীসের ক্ষেত্রে সংকট উত্তরনে ইউরোপীয় দেশ গুলো এক্কাট্টা হয়েছিল।আইএমএফ,বিশ্বব্যাংক এগিয়ে এসেছিল।

ভেনিজুয়েলা বা আর্জেন্টিনার সমস্যা উত্তরনে চীন সহ আরো কিছু দেশ সহযোগিতা দিয়েছিল।পশ্চিমা দেশগুলো অবশ্য  হাত গুটিয়ে ছিল।

ভারত এইরকম একটা অবস্থায় পড়তে চলেছিল ১৯৯০ সালে। সেই সময়ের অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং নেহরু- ইন্দিরা গান্ধীর আমলের মিশ্র অর্থব্যবস্থা বিসর্জন দিয়ে আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা মেনে নিয়ে কথিত সংস্কার কর্মসূচি চালু করে- পরিস্থিতির উত্তরন ঘটিয়েছিলেন। বিপরীতে দেশটিতে পুরোপুরি পুঁজিবাদ কায়েম হয়। ১৯৭৬ সালে সংবিধানে ধারনকৃত  "সমাজতন্ত্র" জলাঞ্জলি দেয়া হয়।

আইএমএফ ঋন দিলে তার সুদের হার অনেক কম হবে।তবে আর্থিক সংস্কারের নামে ব্যাপক শর্ত আরোপ করবে। যা মানলে,সার্বিক জনস্বার্থ ক্ষুন্ন হবে। উল্লেখ্য,শ্রীলঙ্কার  বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের নির্বাচনী ওয়াদা পুরনে অনেক কল্যানমুখী পদক্ষেপ নিয়েছিল।ভ্যাটের হার ১৫% এর জায়গার ৮% করেছিল।জনস্বার্থে অন্যান্য অনেক কর উঠিয়ে নেয়া হয়।

শিক্ষা,স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার অনেক ভর্তুকি দিয়েছিল।দেশে অর্গানিক কৃষিব্যবস্থা চালু হয়েছিল।সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল।কিন্তু করোনা দেশটির সবকিছু তছনছ করে দেয়।
করোনার কারনে রেমিট্যান্স,সেইসাথে টেক্সটাইল সহ অন্যখাতের রপ্তানির প্রবাহ কমে যায়।অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ট্যুরিজম মুখ থুবড়ে পড়ে।

এই মুহুর্তে দেশটির বিরুদ্ধে প্রচন্ড নেতীবাচক প্রচারনাই -তাদের সমস্যা উত্তরনে  প্রধানতম অন্তরায়।বলা হচ্ছে, চালের কেজি পাঁচশত রূপী। কিন্তু তাতে সমস্যা কোথায়? শ্রীলঙ্কার রূপী আর ডলারের মুল্যমান ২৯৮ঃ১।অর্থাৎ এক ডলারের দাম ২৯৮ রূপী।

সেক্ষেত্রে এতকিছুর পরেও মুদ্রামান বিবেচনায় চালের কেজি বাংলাদেশী টাকায়  ১৩০/৪০ টাকার বেশী তো নয়? সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১৫% এর মধ্যে অবস্থান করছে।যা পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় সহনীয় অবস্থায় রয়েছে।

শ্রীলংকার এই মুহুর্তে প্রয়োজন আগামী ছয় মাসের খাদ্য আর জ্বালানী তেল কেনার অর্থ,যা আমদানী করতে হবে ঋন করে।কিন্তু এই পরিস্থিতিতে তাদেরকে ঋণ দেবে কে বা কারা?
চীন বা অন্যকোন দেশ থেকে ঋণ নিলে তার সুদ এবং শর্ত মানা কঠিন হবে।

১৭ জানুয়ারি ২০২২ সালে- রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের ৩৬.৪% বাণিজ্যিক ঋণ (ISB অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সভরেন বন্ড ছেড়ে নেয়া ঋণ), এডিবি-র ঋণ ১৪.৩%, জাপানের ঋণ ১০.৯% এবং চীন থেকে নেয়া ঋণ ১০.৮%। এর পরে ঋণ দাতাদের তালিকায় আছে ভারত, বিশ্ব ব্যাংক, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

শ্রীলঙ্কার সংকটও একসময় উত্তরন হবে।তাদের অবকাঠামো শক্তিশালী। শিক্ষা,স্বাস্থ্যব্যবস্থা আধুনিক আর কল্যান মুখি। ধনবৈষম্যও অনেক কম। কিন্তু দেশটিতে প্রধান সমস্যা পরিবারতন্ত্র। চারটি পরিবারের হাতে দেশটির রাজনীতি-অর্থনীতি জিম্মি। বিরোধীদল অভিযোগ করছে যে,ক্ষমতায় বসে রাজাপাক্সে পরিবার ব্যাপক অনিয়ম,দুর্নীতি করেছে।আজো করছে। চার ভাইসহ এই পরিবার থেকে ছয় সাত জন মন্ত্রীসভায় ছিল।

তারা নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যাপক অর্থ লুট করেছে,আর সেই অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। মজার বিষয় হলো-বিরোধীদল, যারা এই অভিযোগ করছে,তারাও এই চার পরিবারের অন্যতম।
শ্রীলংকার মাথাপিছু আয় -৩৯২০ ডলার। এর বিপরীতে বাংলাদেশের-২৫৫৪ ডলার। ভারতের-১৯৪৭ ডলার। বাংলাদেশ-ভারতে ধনবৈষম্য ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। শ্রীলংকায় ততটা নয়।

অর্থনৈতিক সংকট উত্তরনে শ্রীলংকার রাজাপাকসে সরকারের জাতীয় সরকার গঠনের ডাকে বিরোধী দল সাড়া তো দিচ্ছেই না,বরং সরকার পতনের আন্দোলনে নেমেছে। জরুরি অবস্থা জারীর পাশাপাশি লাগাতার কারফিউ দিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না সরকার।

নতুন নির্বাচনের অনুষ্ঠানের জন্য এই মুহুর্তে পরিবেশ নেই।আবার দেশটিতে সামরিক শাসনেরও ইতিহাস নেই। জাতীয় সরকার হবে না,নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন হবে না,সামরিক শাসন আসবে না- তাইলে দেশটা চালাবে কারা,আর সংকটের উওরনও বা হবে, কিভাবে?

তাইলে কি দেশটা এখন বিদেশী শক্তির কব্জায় চলে যাবে...? সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের অধিকারী একটা দেশের পরিসমাপ্তি ঘটবে?

লেখক: সভাপতি, এসএমই অনার্স এসোসিয়েশন ।

ঢাকানিউজ২৪.কম /

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image