• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২১ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ০৩ ফেরুয়ারী, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের' ২০২২ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ 


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: রবিবার, ০৮ জানুয়ারী, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ০৩:৪৮ পিএম
২০২২ সালের
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের' সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ 

স্টাফ রিপোর্টার, জহিরুল ইসলাম সানি: ২০২২ সালে দেশে ৬৮২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায়  ৭৭১৩ জন নিহত এবং আহত ১২,৬১৫ জন। নিহতের মধ্যে নারী ১০৬১ ও শিশু ১১৪৩ জন। ২৯৭৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ৩০৯১ জন, যা মোট নিহতের ৪০.০৭ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪৩.৫৩ শতাংশ।দুর্ঘটনায় ১৬২৭ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ২১.০৯ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ১৬৪৮ জন, অর্থাৎ ২১.৩৬ শতাংশ। এই সময়ে ১৯৭টি নৌ দুর্ঘটনায় ৩১৯ জন নিহত, ৭৩ জন আহত এবং ৯২ জন নিখোঁজ রয়েছে। ৩৫৪টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ৩২৬ জন নিহত এবং ১১৩ জন আহত হয়েছে।

শনিবার (০৭ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে "রোড সেফটি ফাউন্ডেশন" এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন। যা ৯ টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পেপার এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন।

ড. এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ১২,২২৯টি। এর মধ্যে ট্রাক ২১২৪, বাস ১৫০৬, কাভার্ডভ্যান ৩২৮, পিকআপ ৫৫১, ট্রলি ১৯৮, লরি ১৪৪, ট্রাক্টর ১৯৫, ড্রাম ট্রাক ১০৪, মাইক্রোবাস ২২১, প্রাইভেটকার ২৬৮, অ্যাম্বুলেন্স ৮৭, পাজেরো জীপ ২৩, মোটরসাইকেল ৩২৪৬, পুলিশ ও র‍্যাবের পিকআপ ১৭, প্রিজন ভ্যান ৬, বিজিবি ট্রাক ১, আর্মি ট্রাক ২, তেলবাহী ট্যাংকার ১৯, লং ভিহিকেল ১, বিদ্যুতের খুঁটিবাই ট্রাক ৯, কার্গো ট্রাক ১, সিটি কর্পোরেশনের ময়লাবাহী ট্রাক ৬, থ্রি-হুইলার ১৮৮৯ (ইজিবাইক, সিএনজি, অটোরিকশা, অটো-ভ্যান, মিশুক, লেগুনা, টেম্পু), স্থায়ীভাবে তৈরি যানবাহন ৭৮৩ (নসিমন, ভটভটি, আলমসাধু, পাখি-ভ্যান, মাহিন্দ্র, টমটম, চান্দের গাড়ি)।

তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় যানবাহন ভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ৩০৯১জন (৪০.০৭%), বাস যাত্রী ৪২৭ জন (৫.৫৩%), ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি আরোহী ৪৫৩ জন (৫.৮৭%), প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস-অ্যাম্বুলেন্স ও জীপ যাত্রী ২৬৮ জন (৩.৪৭%),   থ্রি-হুইলার  যাত্রী (ইজি-বাইক, সিএনজি, অটো-রিক্সা, অটো-ভ্যান, মিশুক, টেম্পু, লেগুনা) ১২৪৮ জন (১৬.১৮%), স্থায়ীভাবে তৈরি যানবাহনে যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-চান্দের গাড়ি-বোরাক-মাহিন্দ্র-টমটম) ৩৯৩ জন (৫.০৯%) এবং (বাইসাইকেল -পেডেল রিক্সা -রিক্সা ভ্যান) আরোহ ২০৬ জন (২.৬৭%) নিহত হয়েছে।


দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৫৯৬টি (৩৮%) জাতীয় মহাসড়কে, ২২০৫ টি (৩২.২৮%) আঞ্চলিক মহাসড়কে, ১১৮২ টি (১৭.৩০%) গ্রামীণ সড়কে, ৭৮৪ টি (১১.৪৮%) বিভিন্ন শহরের সড়কে, এবং অন্যান্য স্থানে ৬২ টি (০.৯০%) সংঘটিত হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩৩১টি (১৯.৪৯%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৮৯২টি (৪২.৩৪%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১৬৪৮টি (২৪.১৩%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ৭৮৫টি (১১.৪৯%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১৭৩টি (২.৫৩%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় সময় বিশ্লেষণে দেখা যায় দুর্ঘটনা সমূহ ঘটেছে ভোরে ৩৭৬ টি (৫.৫০%), সকালে ২০৩৩ টি (২৯.৭৭%), দুপুরে ১৪০২ টি (২০.৫৩%), বিকেলে ১১৪৬ টি (১৬.৭৮%), সন্ধ্যায় ৫৯৯ টি (৮.৭৭%) এবং রাতে ১২৭৩ টি (১৮.৬৪%)।

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা (২৬.৯৫%), প্রানহানি (২৬.৫০%)। রাজশাহী বিভাগের দুর্ঘটনা (১৫.১৫%), প্রাণহানি (১৫.০৫%)। চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা (২০.১২%), প্রানহানি (২০.০৪%)। খুলনা বিভাগের দুর্ঘটনা (১২.৫৭%), প্রানহানি (১১.৭৭%)। বরিশাল বিভাগের দুর্ঘটনা (৬.২৯%), প্রাণহানি (৬.৬২%)। সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা (৪.৫৮%), প্রাণহানি (৪.৮৬%)। রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা (৮%), প্রাণহানি (৮.৬৪%)। ময়মনসিংহ বিভাগের দুর্ঘটনা (৬.৩১%), প্রাণহানি (৬.৪৫%) ঘটেছে।

এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১৮৪১ টি দুর্ঘটনায় নিহত ২০৪৪ জন। সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে। ৩১৩ টি দুর্ঘটনায় নিহত ৩৭৫ জন।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ৬৩ জন, সেনা সদস্য ৭ জন, বিমান বাহিনীর সদস্য ২ জন, নৌবাহিনী সদস্য ২২ জন, র‌্যাব সদস্য ৪ জন, বিজিবি সদস্য ৭ জন, এনএসআই সদস্য ২ জন, ফায়ার সার্ভিস সদস্য ৩ জন, আনসার সদস্য ৫ জন, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ১৮৯, পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী ২ জন, বিএডিসি'র যুগ্মো পরিচালক ১ জন, চিকিৎসক ৩৩ জন, স্বাস্থ্যকর্মী ১৩ জন, প্রকৌশলী ২৭ জন, আইনজীবী ৩১ জন, সাংবাদিক ৪৪ জন, ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী ১০৬ জন, এনজিও কর্মকর্তা কর্মচারী ১৪৭ জন, মাটি-কাটা শ্রমিক ৯ জন, রাজমিস্ত্রি ১৪ জন, কাঠমিস্ত্রি ১৩ জন, রংমিস্ত্রি ১১ জন, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিক ৭ জন, সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা-কর্মী ২ জন, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ৩৭ জন, ওষুধ ও বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২৮৭ জন, স্থায়ী পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ৩৮৪ জন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ১৬৯ জন এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১২৩৭ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ০.৮৯শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে ৪.২২ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে ৩.৮৮ শতাংশ। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৩.৪৩ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে ১৫.৭০ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে ১.২০ শতাংশ। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ২৭.১৪ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে ৬৮.৯২ শতাংশ। অর্থাৎ গত ৪ বছরের মধ্যে ২০২২ সালে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির মাত্রা সর্বোচ্চ।

তিনি আরো বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকাংশই হতদরিদ্র নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তদের ৭৫ থেকে ৮২ শতাংশই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত-নিহতরা তাদের পরিবারের প্রধান বা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ফলে এসব পরিবার আর্থিকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সামাজিক অর্থনীতির মূল্ স্রোত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮৩ সালের "মোটরযান অধ্যাদেশ এ্যাক্ট" এ সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মটরযানে "তৃতীয় পক্ষীয় ঝুঁকি বীমা" বাধ্যতামূলক ছিল, যদিও সেই ঝুকি বিমার মাধ্যমে কেউ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন এমন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। "সড়ক পরিবহন আইন -২০১৮" মে মটরযানের "তৃতীয় পক্ষীয় ঝুঁকি বীমা"উঠিয়ে দিয়ে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য "ট্রাস্ট ফান্ড" নামে একটি তহবিলের বিধান রাখা হয়েছে। কয়েকদিন আগে সরকার সেই তহবিল পরিচালনা বিষয়ে বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। অনেক দেরিতে হলেও কাজটি করার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। তবে এই "ট্রাস্ট ফান্ড" এর সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনা পদ্ধতি এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা এই তহবিল থেকে খুব সহজে ক্ষতিপূরণ পাবেন না বলে আমাদের আশঙ্কা। এক জেলার মানুষ অন্য জেলায় দুর্ঘটনা আক্রান্ত হবে, এটা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের তদন্ত চলবে। ফলে ব্যাপক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসুত্রিতা তৈরি হবে। বাস্তবতা হলো, সমাজের দারিদ্র্য ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং অর্থের অভাবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করতে না পারার কারণে মৃত্যুবরণ ও পঙ্গুত্ব বরণ করছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ট্রাস্ট ফান্ড দুর্ঘটনা আক্রান্তদের চিকিৎসার মাধ্যমে মৃত্যু হ্রাস ও পঙ্গুত্ববরণ রোধে কোন কাজে আসবে না। তাই আমরা সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি "ইনডেপেন্ডেন্ট ফান্ড" গঠনের দাবী জানাচ্ছি। এই ফান্ডের মাধ্যমে দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার তাৎক্ষণিক পরেই আহতদের চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। একই সাথে আমরা মোটরযানের "তৃতীয় পক্ষীয় ঝুকিবীমা" কার্যকর ভাবে ফেরত চাই।

পরিশেষে তিনি বলেন, দেশের সড়ক পরিবহন খাতে যে অবস্থাপনা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্য চলছে তা বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে শুধু কমিটি গঠন এবং সুপারিশ মালা তৈরীর চক্র থেকে বেরিয়ে একটি টেকসই জনবান্ধব পরিবহন কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। এটাই জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থেই জরুরি। এজন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

ঢাকানিউজ২৪.কম / কেএন

দুর্ঘটনা বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image