• ঢাকা
  • বুধবার, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ; ০১ ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

তালেবানের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় নির্ভর আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ আগষ্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১২:৪০ পিএম
তালেবান, আফগান
প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে তালেবানরা বসে আছে, ছবি আরব নিউজ

ভুত দেখলে মানুষ ভয় পায়। বর্তমান আফগানিস্তান হচ্ছে এমন এক দেশ। সেখানে লোকজন ভয়ে পালাচ্ছে। গুহাবাসী তালেবান ভুত আল্লাহ আকবর ধ্বনি দিয়ে শহরে প্রবেশ করছে। আর লোকজন এদিক ওদিক পালাচ্ছে। এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে গুহাবাসী তালেবান আফগানিস্তানের শিশুপার্ক দখল করে সেখানকার রাইডে চড়ে মজা করছে।  আফগানিস্তানের ৯৯ পারসেন্ট জনগণ মুসলিম। আল্লাহ আকবর ধ্বনি তারাও দিনে পাঁচবার দেয়। তাহলে কেন তারা এত ভয় পাচ্ছে?.

 আসলে ভুতের মুখে রাম নাম শুনলে মানুষ যেমন ভয় পায়। তেমন ঘটনা ঘটছে আফগানিস্তানে। সেখানে আধুনিক সভ্যতা বিবর্জিত তালেবান দানব দেখে লোকজন ভয়ে পালাচ্ছে। তালেবানরা ভয় দেখাতে গুলিও ছুড়েনি। অথচ লোকজন ভয় পাচ্ছে। .

কাবুলের এক দোকানিকে প্রশ্ন করা হয় আপনি এখন কি নিয়ে উদ্বিগ্ন? উত্তরে তিনি বলেন, আমার দাড়ি ছোট, কত দিনে তা বড় হবে, আর ঘরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বোরকা আছে কিনা, এ নিয়ে চিন্তিত।.

 ১৯৯৬ থেকে ২০০০ পর্যন্ত আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ছিল। তাদের শাসন দেখেছে আফগানবাসী। কতটা বর্বর জানোয়ার ছিল এরা। সেটা তারা নিজ চোখে দেখেছে। এমন পশুদের হাতে আফগানিস্তানকে ছেড়ে দেওয়া মেনে নিতে পারছে না বর্তমান আফগান লোকজন। তারা মনে করছে তাদের সুখ এখন তালেবানদের হাতে শেষ হতে চলেছে। অথচ গত ২০ বছরে আফগানিস্তানকে তারা একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে দেখেছে।.

 লোকজনের ভয় কাটাতে তালেবানরা এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে তাদের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। তাদের যুদ্ধ শেষ। এখন তারা দেশের লোকদের সহায় সম্পদ রক্ষা করার কাজে মনোনিবেশ করবে। তারপরও তাদের কথা বিশ্বাস করছে না বিশ্ববাসী। কাবুলে যেসব বিদেশি দূতাবাস ছিল তারা একে একে আফগানিস্তান ত্যাগ করছে। .

 সেখানে খোলা আছে মাত্র চারটি রাষ্ট্রের দূতাবাস। এগুলো হলো চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান ও ইরান। ধারণা করা হচ্ছে তালেবানরা শাসন ব্যবস্থা হাতে নিলে এ দেশগুলো তালেবানকে স্বীকৃতি দেবে। তবে এই মুহূর্তে বেশিরভাগ দেশ দেখি কি হয়। এমন মনোভাব নিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। .

আগামী কয়েকদিন তালেবানদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদেরকে প্রমাণ করতে হবে তারা যে প্রতিশ্রুতি চীন, আমেরিকা ও পাকিস্তানকে দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে তা তারা কতটুকু রাখতে পারছে।.

 ১৯৯৬ সালে তালেবানরা ক্ষমতায় এসে বামিয়ানের বুদ্ধ মূর্তি ভেঙ্গে সারা বিশ্বের নজর কেড়ে ছিল। তখন তাদের স্বীকৃতি দিয়েছিল মাত্র তিনটি দেশ। দেশগুলো হচ্ছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাকিস্তান। .

সেবার তারা বিচার বহির্ভূত ভাবে হত্যা করেছিল নারীদের। সব কাজ থেকে নারীদের নিষিদ্ধ করেছিল। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভেঙ্গে দূতাবাসের ভিতর থেকে সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট নজিবুল্লাহকে টেনে হিচরে বের করে। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে মৃতদেহ লাইট পোস্টে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। .

তালেবান শাসনের সময় নেপাল থেকে ভারতের এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ছিনতাই হয়। বিভিন্ন পথ ঘুরে সেই বিমানের শেষ ঠিকানা হয় আফগানিস্তানের কান্দাহার। এরপর বিমান ছিনতাইকারীদের নিরাপদে পালানোর সুযোগ করে দেয় তালেবানরা। ছিনতাইকারীরা ভারতের হাতে বন্দি থাকা তিন কুখ্যাত জঙ্গিকে ছাড়িয়ে নেয়। .

এসব কারণে তালেবানদের ভারত কখনই বিশ্বাস করে না। ভারত তালেবানদের স্বীকৃতি দেবে না। এমন আগাম ঘোষণা তারা দিয়ে রেখেছে। তবে পরিস্থিতি বদলে গেলে ভারত তার অবস্থানে থাকবে এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। আফগান জনগণের সঙ্গে তালেবানদের আচরণ কেমন করে তার উপর নির্ভর করছে তালেবান-ভারত সম্পর্ক।.

 যেভাবে তালেবানরা নিজেদের মুজাহিদদের আমেরিকানদের হাতে নিহত হতে দেখেও তাদের সঙ্গে দফায় দফায়  আলোচনার টেবিলে বসেছে, তাতে ভবিষ্যতে যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জোর দেবে না সেটা কে হলফ করে বলতে পারে। এক হিসেব থেকে জানায় যায় ২০ বছরে আমেরিকার হাতে নিহত হয়েছে ৪০ হাজার আফগান তালেবান। আর তালেবানদের হাতে ২ হাজারের উপর মার্কিন সেনা। .

আফগানিস্তানের উন্নয়নে ভারত অংশীদার। ভারত আফগানিস্তানের উন্নয়নে যে ভূমিকা রেখেছে তার প্রশংসা তালেবানও করেছে। আফগানিস্তানের সড়ক উন্নয়নে, সালমা ড্যাম নির্মাণ ও দেশটির পার্লামেন্ট ভবন। সবই ভারতের হাতে তৈরি। আরো বহু প্রজেক্ট হওয়ার পথে ছিল। এখন সবই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে ক্ষমতায় গিয়ে তালেবানরা চাইবে ভারত যেন তাদের প্রকল্পগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয়। .

ইতিমধ্যে তালেবানরা আফগানিস্তানে বসবাসরত শিখ ও হিন্দুদের দেশ না ছাড়ার জন্য আর্জি জানিয়েছে। তাদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা তারা দেবে। কেউ তাদের জান মালের ক্ষতি করতে পারবে না। তালেবানদের এমন আশ্বাসে ৩৫০ টি শিখ পরিবার ও ৫০ হিন্দু পরিবার আফগানিস্তান ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে। এমন খবর টাইমস নাউ সূত্রে বলা হয়। .

তবে দেশ গড়তে তালেবানদের বিরোধীদের সহায়তা লাগবে। তালেবানরা যোদ্ধা। প্রশাসন চালাতে দক্ষ কর্মী তাদের নেই। নেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক নিরাপত্তা কর্মী। এসব শূন্যস্থান পূরণে তাদের  ঘানি সরকারের লোকজনের সহায়তা লাগবে। এসব নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ তালেবানদের সঙ্গে নিগোশিয়েশনে বসেছে। আগামী কয়েকদিনে সেই ফল হয়তো বেরিয়ে আসতে পারে। তালেবানদের আরেকটি বড় পরীক্ষা তাদের কমান্ডারদের মধ্যে ঐক্য। বিভিন্ন প্রদেশে তাদের কমান্ডাররা রয়েছে। তাদের কে কাবুলে আসতে বলা হয়েছে। সরকারের নীতি কি হবে তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে। সেই মত তারা দেশ চালাবেন। সেই মিটিং আগামীতে হবে। .

আগামী কয়েক মাসে পরিষ্কার হয়ে যাবে তালেবানরা দেশ চালাতে সমর্থ কিনা। আফগানিস্তানে এখন বড় সন্ত্রাসী জঙ্গি গোষ্ঠী হচ্ছে ইসলামিক স্টেট। বহু জঙ্গি তালেবান ইসলামিক স্টেটে যোগদান করে তালেবানকে হারিয়ে দিয়েছে। আফগানিস্তানে শেষদিকে আমেরিকান সেনাদের ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছে। এর আগে আল-কায়দা ও তালেবান। এই যুদ্ধ শেষ হবার ছিল না। এ কারণে বাইডেন প্রশাসন আফগানিস্তান থেকে একজিট পলিসি নেয়। তারা তালেবানদের সঙ্গে বসতে পাকিস্তানকে ম্যাসেজ দেয়। কারণ তালেবানদের গডফাদার হচ্ছে পাকিস্তান। .

বর্তমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে অনেকে তালেবান খান বলেন। কারণ তালেবানরা পাকিস্তানের যে প্রদেশে আশ্রয় নিয়েছে সেই খাইবার পাখতুনখোয়া ইমরান খানের রাজনৈতিক দল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তালেবানদের মানবাধিকার নিয়ে ইমরান খান বরাবরই সোচ্চার ছিল। এ কারণে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসায় ইমরান খান খুব খুশি। .

পাকিস্তানের বহু রাজনীতিবিদের বিশ্বাস আফগানিস্তান থেকে তাদের দেশে যেসব সন্ত্রাসী হামলা হয় সেগুলোর ইন্ধনদাতা ভারত।  তালেবান ক্ষমতায় আসলে সেই ইন্ধন বন্ধ হবে। তাই তারা এখন মহাখুশি। তবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তালেবান ক্ষমতায় আসায় ইমরান খানের মতো খুশি নয়। কারণ এই তালেবানদের হাতেই পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড হয়। .

পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়া তালেবানদের হাতে নিহত হয় দেশটির সেনা পরিবারের কয়েকশ স্কুল পড়ুয়া শিশু সন্তান। এই ট্র্যাজিক স্মৃতি পাকিস্তানের সেনা পরিবারগুলি কখনই ভুলতে পারে না। এ কারণে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার বাজওয়া সতর্ক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। .

 কে না জানে পাকিস্তানের পলিসি ঠিক করে সেনাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্র। ইমরান খান সেনাবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে কতটা তালেবানদের জন্য করতে পারবেন সেটা সময় বলে দেবে।.

বাংলাদেশও তালেবানদের গতিবিধির উপর নজর রাখছে। কারণ তালেবানদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এমন কতগুলি জঙ্গি গোষ্ঠী এদেশে রয়েছে। এখন আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসায় বাংলাদেশে আশ্রিত তালেবান লাভারদের এজেন্ডা কি হবে সেটা সময় বলে দেবে। .

বিএনপির মতো রাজনৈতিক গোষ্ঠী গুলো চাইবে তালেবানরা এদেশের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করে সরকার হটিয়ে দিক। যেটা তারা ভারতের মাধ্যমে করতে পারবে না। 
আগামী কয়েক বছর ভারত ও বাংলাদেশের জন্য সুখকর হবে না। তালেবান যদি তাদের পুরানো চেহারা দেখিয়ে ভারত বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায় তবে মোদী সরকার যে বসে থাকবে না। সেটা পরিষ্কার।.

 নিরাপত্তার স্বার্থে ভারত আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পিছ পা হবে না। সন্ত্রাস দমনে মোদীর ভারত মিয়ানমারে একবার, পাকিস্তানে দুবার সামরিক অভিযান চালিয়েছে। সুতরাং তালেবানদের এবার এজেন্ডা ঠিক করতে হবে।  ক্ষমতায় বসে তারা কি করতে চায়।.

 রাশিয়া ও চীনকে তালেবান বোঝাতে সমর্থ হয়েছে তাদের দেশে রাশিয়ার চেচেন ইসলামিক জঙ্গিদের ঠাই হবে না। চীনকে বুঝিয়েছে উইঘুর মুসলমানদের তাদের দেশে আশ্রয় দেয়া হবে না। এই প্রতিশ্রুতি কতটুকু রক্ষা করতে পারে তালেবান, তা সময়ই বলে দেবে। .

ভারতে কে বোঝানো হয়েছে ভারত বিরোধী শক্তিকে তালেবান সহায়তা করবে না। তবে তালেবানদের কথায় বিশ্বাস রাখেনি ভারত। এজন্য তালেবানদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অন্যদেশ বসলেও ভারত দূরে থেকেছে। মূলত চীন, রাশিয়া, আমেরিকা ও পাকিস্তানের সফল আলোচনায় তালেবানরা এত দ্রুত রাষ্ট্র ক্ষমতায় চলে যেতে পেরেছে।          .

আফগানিস্তানের নিজস্ব সেনাবাহিনী সাড়ে তিন লাখ। তালেবানের ৭৫ হাজার। এরপরও দেখা গেল তালেবান দ্রুত আফগানিস্তান কব্জা করল। এক ফোটা রক্ত ঝড়েনি কোথাও। এটাই তালেবানের টেবিল আলোচনার সফলতা। একে তালেবান ধরে রাখতে পারলে আগামীতে তালেবানের হাত ধরেই আফগানিস্তানের উন্নয়ন হতে থাকবে। আফগানিস্তানের জনগণ সুখে ও শান্তিতে থাকুক এটাই দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি সরকারের চাওয়া। এখন এই চাওয়া বাস্তবতার রুপ পায় কি না তা সময়ই বলে দেবে। 
      
লেখক সাংবাদিক সুমন দত্ত, আন্তর্জাতিক বিষয়ক কলাম লেখক। তথ্যসূত্র বিভিন্ন ইংরেজি গণমাধ্যম।
 . .

ঢাকানিউজ২৪.কম /

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image