• ঢাকা
  • শনিবার, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ; ০৪ ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

টিকাদান অব্যাহত রাখাই চ্যালেঞ্জ


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১১ নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ০৫:২৮ পিএম
রোগী শনাক্ত হওয়ামাত্র তাদের ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে

ডা. মুশতাক হোসেন  .

করোনা সংক্রমণের ১৯ মাস পর শনাক্তের হার এখন দেড় শতাংশেরও নিচে। আমরা জানি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলে বা নামলে তা অন্য সাধারণ রোগ-ব্যাধির মতো গণ্য হবে। তবে নূ্যনতম যদি এই হার টানা ১৪ দিন বজায় থাকে, তাহলেই শুধু ধরে বা মেনে নেওয়া যায়, পরিস্থিতি পুরো নিয়ন্ত্রণে। সেদিক থেকে আমাদের বিদ্যমান পরিস্থিতি এখন স্বস্তির বটে, তবে এ জন্য সতর্কতায় ভাটা পড়লে চলবে না। আমরা এও জানি, দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে দৈনিক শনাক্তের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছিল। বেড়েছিল মৃত্যুহারও। এই চিত্রও আমাদের সামনে আছে- বিশ্বের অনেক দেশেই সংক্রমণ একেবারে কমে আসার পরও এখন ফের উদ্বেগজনক চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে।.

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফের শনাক্ত ও মৃত্যুহার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠছে। আমাদের সর্বক্ষেত্রে এখন স্বাভাবিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থনীতিসহ নানা খাতে করোনার অভিঘাত যে নেতিবাচকতা সৃষ্টি করেছিল, তা পুনরুদ্ধারে কার্যক্রম চলছে পুরোদমে। যদিও সর্বস্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনও পুরোপুরি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি, কিন্তু দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখার সব চেষ্টাই চলমান। টিকাদান কর্মসূচি বিস্তৃত হয়েছে। ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদেরও টিকাদানে গতি এসেছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, তাও অত্যন্ত সময়োপযোগী। দ্রুত সমগ্র জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যেই।.

আমাদের করণীয় আছে আরও অনেক কিছু। মনে রাখতে হবে, রোগী শনাক্ত হওয়ামাত্র তাদের ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা তো আছেই, শনাক্তরা যাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ দূরত্বে আলাদা থাকতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতা সামনে রেখেই সব রকম প্রস্তুতি দরকার। শুধু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাগত উন্নতি বিবেচনায় নিলে চলবে না। দেখতে হবে সংক্রমণ প্রতিরোধে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা বেড়েছে কিনা। সংক্রমণের প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর আরও সুয়োগ রয়েছে। সংক্রমণ পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটবে না- আমাদের নানা শৈথিল্যের কারণে তা বিশেষভাবে আমলে রাখা জরুরি। অনেকেরই উদাসীনতা, স্বাস্থ্যবিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে চলার কুফল কী ভয়াবহ হতে পারে তা তো আমাদের জানা। যে কোনো মূল্যে আইসোলেশন নিশ্চিত করা না গেলে সংক্রমণ ছড়াবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের ওপর একেবারে নির্ভর না করে উদ্যোগ চলমান রাখতে হবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। মানুষ সেবা নিতেই কোনো প্রতিষ্ঠানে যায়। সেখানে এ জন্যই অনুকূল পরিবেশ-পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে শতভাগ। একই সঙ্গে সর্বাবস্থায় জরুরি টিকাদান রাখতে হবে। টিকা কার্যক্রম আরও গতিশীল হলে এবং টিকাগ্রহীতার সংখ্যা বাড়লে সংক্রমণ ফের দেখা দিলেও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কম থাকবে।.

হাসপাতালগুলোতে যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণ করার সব ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়াও জরুরি। অর্থাৎ প্রস্তুতির ঘাটতি কোনো ক্ষেত্রেই যেন না থাকে। টিকার চাহিদার নিরিখে মজুদে ঘাটতি আছে, তা অসত্য নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে অর্থ ও টিকা এই দুইয়েরই ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন উৎস থেকে আমাদের টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া আরও জোরদারের পাশাপাশি বহুপক্ষীয় যোগাযোগ নিবিড় করা দরকার। আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টিকা উৎপাদনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বেশ কিছু চুক্তি হয়েছে কয়েকটি দেশের সঙ্গে। চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে সংরক্ষণের ব্যাপারে। রাশিয়া আমাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা নিজেরাই আবার সংকটে নিপতিত। তাই পরিকল্পনা ও এ-সংক্রান্ত সব প্রস্তুতিতেই নতুন ভাবনা সংযোজন প্রয়োজন।.

সংক্রমণ যেন বেড়ে না যায়, এ জন্যই নজরদারি-তদারকি বাড়াতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে সজাগ-সতর্ক দৃষ্টি-ব্যবস্থাপনা। ভারত কিংবা ইউরোপের কয়েকটি দেশের সাম্প্রতিক অবনতিশীল পরিস্থিতির আলোকে আমাদের দেশের প্রতিটি প্রবেশকেন্দ্রে দৃষ্টি তীক্ষষ্ট রাখা ও ব্যবস্থা সুচারু করা জরুরি। স্বাস্থ্য বিভাগের এসবই গুরুদায়িত্ব। সীমান্ত কিংবা প্রবেশপথ তো বটেই, দেশের ভেতরেও সর্বক্ষেত্রে কোনো ঢিলেঢালা ভাব যেন সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল কারও মধ্যেই দেখা না দেয়। নতুন করে আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আগত সবার ক্ষেত্রেই সীমান্ত এবং বিমানবন্দরে পরীক্ষার পাশাপাশি নিয়মের অনুশীলন করতে হবে যথাযথভাবে। যেমন কেউ যখন সীমান্ত কিংবা বিমানবন্দরে এলো। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেল তার মধ্যে উপসর্গ নেই, কিন্তু তার ভেতরে যে তা লুকিয়ে নেই, তা নিশ্চিত হতে বাকি ধাপ ও নিয়ম মানার ক্ষেত্রে বিধি অনুসরণে কোনো শৈথিল্য দেখানো যাবে না। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তির সচেতনতা-সতর্কতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দায়ের কথা আমলে রাখতে হবে গুরুত্বের সঙ্গে।.

বিদেশ প্রত্যাগতদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে নতুন করে আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যারা আসবেন, তাদের ১৪ দিন নিয়ম মানার বিষয়ে সতর্ক থাকতেই হবে। অর্থাৎ সংক্রমণ ছড়ানোর সব পথ রুদ্ধ করা জরুরি। করোনার নতুন ওষুধ আমাদের বাজারেও এসেছে। এই ওষুধ দেশে উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও জোরালো হচ্ছে। এটিও স্বস্তির খবর। তবে করোনার নিশ্চিত ওষুধ এখনও কিন্তু কোনোটিই নয়। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এই ওষুধ রোগীদের গুরুতর পরিস্থিতি থেকে অনেকটাই মুক্ত রাখছে। এভাবেই নতুন ওষুধ আসবে এবং কার্যকরও হবে। বাংলাদেশ এ প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তা ভালো। কিন্তু তাতেই আমরা সবকিছু পেয়ে গেলাম, এমনটি ভাবার কারণ নেই। অবশ্যই আমলে রাখতে হবে, প্রতিকারের চেয়ে সর্বাবস্থায় প্রতিরোধই উত্তম। নিশ্চয় শেষ পর্যন্ত কোনো কোনো ওষুধ আমাদের করোনা থেকে জীবন রক্ষার পথ খুলে দেবে।.

শিক্ষার্থীদের টিকাদানে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এ জন্য অতিরিক্ত জনবল লাগবেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা দীর্ঘদিন পর প্রতিষ্ঠান খোলায় শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত। সমস্যা যা দেখা দিয়েছে এ ক্ষেত্রে, এর সমাধান বড় কোনো চ্যালেঞ্জ বলে মনে করি না। চ্যালেঞ্জ হলো টিকাদান অব্যাহত রাখা। টিকার মজুদ আমাদের পর্যাপ্ত নয়। সারাবিশ্বেই করোনার টিকা বৈষম্য জিইয়ে আছে। সমন্বয়ের যে ঘাটতি রয়েছে, এর সমাধানে অঙ্গীকারবদ্ধ জনবল খুব জরুরি। এ কার্যক্রম তো একদিন বা এক মাসে শেষ হয়ে যাচ্ছে না। যেহেতু এ কর্মসূচি পরিস্থিতির কারণেই বিস্তৃত হচ্ছে, সেহেতু জনবলও সেই নিরিখে বাড়াতে হবে। সরকারকে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর কাছে সহায়তা চাওয়ার পাশাপাশি জনবল নিয়োগ কার্যক্রম চালাতে হবে। অনেক স্বেচ্ছাসেবী এ কর্মযজ্ঞে যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু টিকাদান কর্মসূচিভুক্ত কাজ অনেক। এর মধ্যে প্রযুক্তিগত বিষয়ও রয়েছে। সবকিছুই আমলে রাখা দরকার।.

শুধু দোষারোপ করলে চলবে না। কীভাবে সংশ্নিষ্ট সবার মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়, মনোযোগ দিতে হবে সেই দিকে। যে কোনো সময় সংক্রমণ বাড়তে পারে। ইউরোপ আর আমাদের দেশের আবহাওয়া ও তাপমাত্রার মধ্যে যেমন পার্থক্য আছে, তেমনি এ সবকিছুর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও পার্থক্য বিদ্যমান। এ ক্ষেত্রে তাপমাত্রার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের আচরণ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় সচেতনতা-সতর্কতা। শীতপ্রধান দেশের মতো আমাদের বিপদাশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠবে না, যদি আমরা স্বাস্থ্যবিধির ব্যত্যয় না ঘটাই। আমাদের দেশেও শীতকালে ঝুঁকি আছে। কিন্তু ঝুঁকি এড়ানোর ব্যবস্থাও আমাদের জানা। তাই সর্বাবস্থায় নিয়ম মেনে চলতে হবে। সামাজিক সম্মিলনের ক্ষেত্রে অবশ্যই অধিক সতর্ক থাকতে হবে।
উপদেষ্টা ও সাবেক সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর ।.

.

ঢাকানিউজ২৪.কম /

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image