• ঢাকা
  • বুধবার, ১২ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ; ২৬ জানুয়ারী, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

মন্ত্রী যখন নিজেই প্রতারিত


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: রবিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ০৬:৫৩ এএম
অনলাইন, জালিয়াতি
ছবি: অনলাইনে জালিয়াতি সংগৃহীত।

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: কথায় বলে ‘চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড়ে ধরা’। ধরা না পড়লে চোরকে চেনা বড় দায়। পৃথিবীতে যে কত ধরনের চোর কত প্রকারের চৌর্যবৃত্তিতে পারঙ্গম তা একজন ভদ্র মন্ত্রীর দামী মোবাইল ফোনসেট চুরি অথবা আরেকজন নম্র-ভদ্র মন্ত্রীকে কোরবানীর ঈদের সময় নমুনা হিসেবে দেখানো আসল গরুটি না দিয়ে ভিন্ন একটি গরু গছিয়ে দেয়ার সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে। বিষয়টি গণমাধ্যমে না এলে হয়তো আমরা কেউ জানতেই পারতাম না এসব কথা। এতে বোঝা গেল- দেশের কেউই প্রতারকদের খপ্পর থেকে কোনভাবেই নিরাপদ নন।

চোর, প্রতারক, জালিয়াত, ঠগ-বাটপার দেশের সব জায়গায় গিজ্ গিজ্ করছে। ছোটলোক, বড়লোক, ধনী-গরীব, বিত্তহীন-বিত্তবান সব জায়গায় ওদের বিচরণ লক্ষ্যণীয়। সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে অনলাইনে চরম জালিয়াতি। এই জালিয়াতি চক্র নৈতিকতাবিহীন কর্মকান্ড পরিচালনা করে নিরীহ সৎ মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করে সর্বস্বান্ত করে তুলছে। কেড়ে নিচ্ছে সারা জীবনের সঞ্চয়। তার সাথে নি:শেষ করে দিচ্ছে আরো কিছুদিন এই সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আশা-ভরসা।
 
বাণিজ্যমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে নিরুপায় হয়ে অকপটে স্বীকার করলেন গত কোরবানী ঈদের গরু জালিয়াতির ঘটনা (ইত্তেফাক ২৭.০৯.২০২১)। তিনি অনলাইনে যে গরুটির ছবি বা ভিডিও দেখে কোরবানী করার জন্য ১ লক্ষ টাকায় কেনার অর্ডার দিয়েছিলেন তাঁকে সেটি না দিয়ে ঐ দামে ভিন্ন একটি গরু সরবরাহ করা হয়েছে। তাতে তিনি সন্তুষ্ট হননি। হয়তো ক’বছর আগের ডেসটিনি, এবছরের ইভ্যালী, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, রিং আইডি ইত্যাদির ঘটনাগুলো মানুষের গোচরে না এলে তাঁর মুখ থেকে এমন কথা সহজে বের হতো না। হাজার হোক তিনি একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। একজন বড় দায়িত্বশীল ব্যক্তির ক্ষেত্রে যদি কোরবানীর ঈদের গরু কেনার মত ধর্মীয় অনুভূতি জড়িত বিষয়ে জালিয়াতরা ধিক্কার বোধ হারিয়ে প্রতারণা করে থাকে তাহলে সারা দেশে অনলাইন গরুর হাটে না জানি আরো কত কিছু ঘটে গেছে- যা আদতেই তাদের আপনজন ছাড়া দেশবাসী কেউই জানেন না।

কিছুদিন আগে চোরাই মোবাইল ফোনের বেচা-কেনার মার্কেট থেকে গোয়েন্দা পুলিশ কিছু চোরকে গ্রেপ্তার করেছিল। সেই চোর হয়তো পরিকল্পনামন্ত্রীর মন্ত্রীর চেহারা চিনতো না। তাই বিজয় সরণীতে গাড়িতে বসে কথা বলা অবস্থায় তাঁর হাত থেকে দামী মোবাইল ফোন সেট (আই ফোন এক্স) ছিনিয়ে নিয়ে সটকে পড়ে (প্রথম আলো ০১.০৬.২০২১)। সেটটি বিক্রি করে দেয় একজন গ্রাহকের কাছে। গ্রাহক সেটা ব্যবহার করতে থাকলে প্রযুক্তির কল্যাণে অনবরত অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে ব্যবহারকারীকে চিহ্নিত করা হয়। তাকে পাকড়াও করা হলে সে কেনার জায়গা ও সেই চোরাই সেট  বিক্রি করা ব্যক্তিটিকেও দেখিয়ে দেয়। আর দেখিয়ে দেবেই না-বা কেন? মন্ত্রীর ফোনসেট বলে কথা! আইন-শৃংখলা রক্ষায় কর্মরতগণ তাঁর সেট উদ্ধার করতে না পারলে চাকুরী নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যেতে পারে। 

যদিও বহু বছর আগে আগারগাঁওয়ের বাণিজ্য মেলায় টিকিট কাউন্টারে হাত ঢোকানোর পরক্ষণেই দেখি আমার নিজের মোবাইলটি পকেটে নেই! পুলিশ ক্যাম্পে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করলে তারা লিখিত দিতে বললেন। তাও দিয়েছি। তারপর বহুদিন সেটা পাব পাব বলে অপেক্ষাও করেছি। কিন্তু যুগ পেরিয়ে গেলেও তা আর হাতে আসেনি। আমরা সাধারণ মানুষ, তাই আমাদের হারিয়ে যাওয়া জিনিষ উদ্ধার করবে কে? আর উদ্ধার করা হলো কি-না জানাবেই বা কে? তাই সেটা ভুলে গিয়ে কমদামী ফোনসেট ব্যবহার করা শুরু করেছিলাম। কিন্তু এখন তো পেশার প্রয়োজনে আধুনিকটাই ব্যবহার করতে হয় দিনরাত।

২০০৭ সালে বুয়েটের এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে কী-নোট স্পীকার হিসেবে যোগদান করতে এসেছিলেন আমার পিএইচডি সুপারভাইজার। ইনোগরাল সেরিমোনি শেষে টিচার্স লাউঞ্জে বসেছিলেন অন্যান্য ডেলিগেটদের সাথে। জাপানীজ নিয়মে তাঁর হাতব্যাগটি দেয়ালের পিঠে ঠেশ দিয়ে রেখে বসে নাস্তা খাচ্ছিলেন। দেশী বিদেশী অনেকেই তাঁর সাথে গল্পে-পরিচয়ে মশগুল ছিলেন। নাস্তা শেষে তিনি দেখলেন তাঁর ব্যাগটি নেই। সর্বনাশ! ওটাতে তাঁর ল্যাপটপ ও পরবর্তী প্রেজেনন্টেশনের কাগজপত্র ছিল। অনেক খোঁজাখুজি করেও সেদিন সে ব্যাগের দেখা মিললো না। আমি আমার পরিচিত এক উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারকে বিষয়টি জানালাম। তিনি এলেন, নোট নিলেন। থানায় জানালেন। কিন্তু ল্যাপটপটি আজও খুঁজে পাননি আমার সেনসেই! আমার এখনও খুব লজ্জা লাগে সেই কথা স্মরণ হলে।

পরে জেনেছিলাম, একদল মাদকাসক্ত কনফারেন্সের সময় বিদেশীদের ব্যাগ, ল্যাপটপ চুরি করে। তারা কমদামে চোরাই মার্কেটে সেগুলো বিক্রি করে থাকে। তাদের বেশীরভাগই মাদকাসক্ত ছাত্র! এখনও বহু মেধাবী ছাত্র, ধনীর দুলাল মাদকদ্রব্য কেনার টাকা যোগাড় করতে চুরি, হাইজ্যাক করে থাকে। দেশ থেকে মাদক ব্যবসা বন্ধ না হলে এবং আসক্তদের সংখ্যা বেড়ে আরো বড় বাজার তৈরী হলে দিন দিন এই সংকট জাতিকে মেধাশূন্য করে চোর-জালিয়াত বানাবে এবং এখন সেটা বানাচ্ছে।

এক সংবাদে জানা গেল, পুলিশের ডাকাতি করার তথ্য (প্রথম আলো ২৭.০৯.২০২১)। পুলিশের একজন এসআই ডাকাতি করে কোটিপতি হয়েছেন। ভয়ংকর এসব তথ্য এখন খুব মামুলী ব্যাপার। সেবকরা এসব ঘৃণ্যকাজে নিয়োজিত থাকলে আর কাকে দোষ দেবেন? তাহলে মানুষ সেবা পাবে কার কাছে? আজকাল পকেটমার. ছিনতাই-এর ঘটনা এত বেড়ে গেছে যে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে উঠলে কিছুক্ষণ পর পর প্যান্টের পিছনে মানিব্যাগ আছে কি-না হাত দিয়ে নেড়ে দেখতে হয়। বাসে ওঠার সময় একটু অসাবধান হলে বা জানালার কাছে মোবাইলে কথা বললে একটু অসতর্কতায় বাইরে থেকে কেউ একজন সেটটি ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালাতে থাকে। সেটা আর উদ্ধারের কোন উপায় থাকে না।

কেন এমন নাজুক অবস্থা আমাদের সমাজে? কেন এই অনিরাপত্তা? প্রশ্নটির উত্তর খুব সহজ। জালিয়াতি শুরু হয় বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তির সময় ডোনেশনের নামে ঘুষ প্রদান থেকে। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল প্রভৃতিতে ভর্তি জালিয়াত চক্র কতটা তৎপর তা অনেকেই জানেন। ধনীদের সন্তানের জন্য বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারী মেডিকেল কলেজ রয়েছে। সেগুলোতে ভর্তি ও পড়াশুনার খরচের বাহার ও বহর কারো অজানা থাকার কথা নয়। কারণ, ২০-২২ লক্ষ টাকা খরচ করে একজন দরিদ্র বাবা-মা তাদের সন্তানকে সেখানে ভর্তি করাতে পারেন না। সিংহভাগ ক্ষেত্রে বিত্তশালীদের সন্তানরা সেগুলো থেকে খুব ভাল ফল নিয়ে পাশ করলেও তাদের অনেকেই সরকারী চাকুরীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে অপারগ। কিন্তু তাদের বাবা অথবা অভিভাবকরা তাদের জন্য দেশে চাকুরী কিনে দেন অথবা  বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে ক্ষান্ত হন। বিদেশে গিয়ে তারা অনেকেই দেশ থেকে পাঠানো টাকা দিয়ে ব্যবসা করে।
 
আর গ্রাম থেকে নদীভাঙ্গা, অতিদরিদ্র পরিবারের সন্তানরা শহরে এসে ছোটখাটো কাজ করতে করতে একসময় চোর-জালিয়াতদের খপ্পরে পড়ে হয়ে যায় মাদক বিক্রেতা অথবা অপরাধী।  এদেরকে ঠেকানা খুবই কঠিন। কারণ, এদের দায় ক্ষুন্নিবৃত্তির সংগে, বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সংগে। এরা বোঝে না কে বড় নেতা বা কে মন্ত্রী । তাই তারা সবার পকেটে হাত চালায়। পথে ভাসমান এদের নিয়ন্ত্রণে যারা থাকেন তারাও ১ লক্ষ টাকা দামী মোবাইল ফোন সেট ব্যবহার করেন। ম্যাকিয়াভেলী বলেছেন, ‘এন্ড জাস্টিফাইজ দ্য মিনস্’। তিনি আরো বলেন, ‘রাজ্য শাসন করতে গেলে শিয়ালের মত ধূর্ত হতে হবে’। এই কথাগুলোর অর্থ খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর আরেকটি অর্থ হলো- আমার উদ্দেশ্য ঠিক থাকলে যাই করি না কেন সেটাই বৈধ। যেমন একজন শুধু চাই চাই বা খাই খাই স্বভাবের মানুষের জন্য এটার অর্থ এক আবার একজন প্রকৃত ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য এর অর্থ ভিন্ন। কিন্তু সব শ্রেণির অনৈতিক মানুষগুলোর উদ্দেশ্য হলো ক্ষুন্নিবৃত্তির তাগিদে চোর হওয়া, আরো বিত্ত ও ক্ষমতাশালী হবার জন্য ধূর্ত হওয়া। ফলে তারা কেউ মোবাইল চোর, কেউবা মন্ত্রীকে কোরবানীর ঈদের জন্য মোটা গরুর ছবি দেখিয়ে হাড্ডিসারটা সরবরাহ করে। 

এই হীন অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানোর জন্য আমাদের যে সদগুনসম্পন্ন মানুষের প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন তা সুশাসনের ঘাটতিতে দিন দিন সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তাইতো ওরা সমাজে মিশে গেছে এবং গুণধর মন্ত্রীমশাই ও অগুণধর সেপাই-প্রজা সবাই ওদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছি প্রতিদিন।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান। E-mail: [email protected]

ঢাকানিউজ২৪.কম / মো: জাহিদুল ইসলাম জাহিদ।

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image