• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

থ্যালাসিমিয়া প্রতিরোধ করি: ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখি


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: বুধবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০৩:৪৪ পিএম
থ্যালাসিমিয়া প্রতিরোধে প্রজন্মকে নিরাপদ রাখব
থ্যালাসিমিয়া

শাহ আলম সরকার

থ্যালাসেমিয়া (ইংরেজি: Thalassemia) একটি  অটোজোমাল মিউট্যান্ট প্রচ্ছন্ন জিনঘটিত বংশগত রক্তের রোগ। এই রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়। থ্যালাসেমিয়া ধারণকারী মানুষ সাধারণত রক্তে অক্সিজেনস্বল্পতা বা “অ্যানিমিয়া”তে ভুগে থাকেন। অ্যানিমিয়ার ফলে অবসাদগ্রস্ততা থেকে শুরু করে অঙ্গহানি ঘটতে পারে। ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন জিনের কারণে থ্যালাসেমিয়া হয়। বাবা অথবা মা, অথবা বাবা- মা উভয়েরই থ্যালাসেমিয়া জীন থাকলে বংশানুক্রমে এটি সন্তানের মধ্যে ছড়ায়। এক সমীক্ষায় দেখা যায়,বাবা এবং মা উভয়ের থ্যালাসেমিয়া জীন থাকলে ভূমিষ্ট শিশুর শতকরা ২৫ ভাগ থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়।

সাধারণত জন্মগতভাবে একটি শিশু থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হয়ে থাকে যা, শিশু ও মা বাবার কোনো ভুল থেকে নয় বরং জেনেটিক্যালি বা জিনগত কারণে সংঘটিত হয়। শিশুর বয়স বৃদ্ধির ২ বছরের মধ্যে রোগ লক্ষণ প্রকাশিত হতে শুরু করে যা পরবর্তীতে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া তথা পরিক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগের নিরুপন করা হয়। থ্যালাসেমিয়া মেজর বা Cooley anemia তে আক্রান্ত সন্তান বড়ো হয়ে সাধারণত ৩০ বৎসর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

থ্যালাসেমিয়া প্রধানত দু ধরনের হয়ে থাকে – আলফা থ্যালাসেমিয়া ও বিটা থ্যালাসেমিয়া। সাধারণভাবে আলফা থ্যালাসেমিয়া, থ্যালাসেমিয়া থেকে কম তীব্র। আলফা থ্যালাসেমিয়া বিশিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ মৃদু বা মাঝারি প্রকৃতির হয়ে থাকে । অন্যদিকে বিটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা বা প্রকোপ অনেক বেশি; এক-দুই বছরের শিশুর ক্ষেত্রে ঠিকমত চিকিৎসা না করলে এটি শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিশ্বে বিটা থ্যালাসেমিয়ার চেয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি। আলফা থ্যালাসেমিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের সর্বত্র এবং কখনও কখনও ভূমধ্যসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়।
মাইনর থ্যালাসেমিয়াতে সাধারণত চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। থ্যালাসেমিয়া মেজরে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন প্রধান চিকিৎসা। বারবার রক্ত নেবার একটি বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো বিভিন্ন প্রত্যঙ্গে অতিরিক্ত লৌহ জমে যাওয়া। এর ফলে যকৃত বিকল হয়ে রোগী মারাও যেতে পারে। এধরনের জটিলতা প্রতিরোধে আয়রন চিলেশন থেরাপি দেওয়া হয়, অতিরিক্ত লৌহ বের করে দেবার জন্য।

বিশ্বের আনুমানিক ৬০-৮০ মিলিয়ন মানুষ বিটা থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করছে। থ্যালাসেমিয়া নেপাল, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে বেশি দেখা যায়। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী ৫০ বছরে থ্যালাসেমিয়া অনেক বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্বে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক সংখ্যা প্রায় ২৫০ মিলিয়ন। বিশ্বে প্রতিবছর ১ লাখ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বাংলাদেশের ১০-১২ ভাগ মানুষ এ রোগের বাহক। অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটিরও বেশি মানুষ তাদের অজান্তে এ রোগের বাহক। দেশে কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০ হাজার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু-কিশোর রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। থ্যালাসেমিয়া রোগীরা প্রতিমাসে এক থেকে দুই ব্যাগ রক্ত গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। চিকিৎসা না করা হলে এ রোগীরা রক্তশূন্যতায় মারা যায়।
    
অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন হচ্ছে এ রোগের সম্পূর্ণ নিরাময়কারী নির্দিষ্ট চিকিৎসা। শিশুকে রক্ত দেওয়ার পূর্বে তা করা হলে ৫০/৭০ ভাগ ক্ষেত্রেই ভালো ফল পাওয়া যায়, তবে আমাদের দেশে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত এক শিশুর দেহে সফলভাবে ‘হ্যাপলো ট্রান্সপ্লান্ট’ করেছে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল। যা বাংলাদেশে প্রথম। এর মাধ্যমে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। হ্যাপলো বা হাফ ম্যাচ ট্রান্সপ্লান্ট এমন এক পদ্ধতি যেখানে পরিবারের যে কেউ- যেমন বাবা-মা, ভাই-বোন ডোনার হিসেবে ভূমিকা  পালন করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে রোগীর ব্লাড ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়। এভারকেয়ার হাসপাতালের হেমাটোলজি ও স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগের কোঅর্ডিনেটর এবং জ্যেষ্ঠ কনসালটেন্ট ডা. আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ বলেন, সাধারণত শিশুর ২-৫ বছর বয়সের মধ্যেই এই ট্রান্সপ্লান্ট করতে হয়। তবে দুই বছরের আগেও করা যায়। দেশে প্রথমবারের মতো গত ৫ মে, ২১ মাস বয়সি শিশুর হ্যাপলো ট্রান্সপ্লান্ট সফলভাবে শেষ হয়। সফল অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন ব্যতীত অন্যান্য ব্যবস্থাপনার সাহায্যে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুকে ফলোআপ চিকিৎসা ও সঠিকভাবে রক্ত সঞ্চালন, শরীরে লোহার পরিমাণ সঠিক রাখলে এসব রোগীরা দীর্ঘজীবন লাভ করে। থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। এজন্য সন্তানের জন্মের পর থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা করিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করার চেয়ে অনেক বেশি শ্রেয় এরকম একটি শিশুর জন্ম না হতে দেওয়া। অসুখটি নতুন নয়, শুধু সামাজিক সচেতনতার সাহায্যে ভাবী পিতামাতারা এগিয়ে এলেই এ রোগে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কমিয়ে আনা সম্ভব।

সরকার দেশের চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চতুর্থ এইচপিএনএসপি’র আওতায় ৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজে থ্যালাসেমিয়া ম্যানেজমেন্ট সেন্টার গঠন করেছে। এই সেন্টারসমূহে ‘ন্যাশনাল গাইডলাইনস অন থ্যালাসেমিয়া মানেজমেন্ট ফর ফিজিশিয়ানস’ অনুযায়ী রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ সরবরাহ করা হবে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের রেজিস্ট্রেশন করে তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ‘ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ এবং থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি’ থেকে সরকার থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করছে।

এছাড়াও থ্যালাসেমিয়ায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। হাসপাতালে রোগ নির্ণয়, ব্লাড ট্রান্সফিউশন ও ঔষধ সরবরাহ আলাদা আলাদা জায়গায় হবে না, এক স্থানে হবে। এই ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ভোগান্তি কমবে।

থ্যালাসেমিয়ার মতো রোগের ক্ষেত্রে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এই রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। এই রোগ প্রতিরোধের জন্য সরকারের পাশাপাশি সমাজের সবাইকে সচেতনভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়াও কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে এ রোগের সেবা পৌঁছে দিতে পারলেই নির্মূল করা সম্ভব। তাছাড়া স্কুল পর্যায়ে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে জানাতে পাঠ্য বইয়ে বিষয়টি সংযোজন করা যেতে পারে যেভাবে অটিজম রাখা হয়েছে। থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কঠোরভাবে মানার ব্যবস্থা করতে হবে।

মনে রাখা জরুরি থ্যালাসেমিয়ার বাহকরা রোগী নয়। তারা আপনার আমার মতোই সুস্থ। যদি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে যে কোনো একজন বাহক হয় তাহলে তাদের সন্তানেরা বাহক হিসেবে জন্মাতে পারে কিন্তু কেউ রোগী হয়ে জন্মাবে না। একটু সচেতনতাই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ জীবন উপহার দিতে। আসুন আমরা সবাই মিলে থ্যালাসেমিয়ামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে নিজেরা থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে জানি ও অন্যদের জানাই।

 

ঢাকানিউজ২৪.কম / কেএন

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image