• ঢাকা
  • বুধবার, ১৯ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ০১ ফেরুয়ারী, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

মুক্তির লড়াইয়ের প্রেরণা মণি সিংহ


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: শনিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০৬:০৮ পিএম
৭১-এর ২৬ মার্চ যেদিন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়
কমরেড মণি সিংহ

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

কমরেড মণি সিংহকে আমি প্রথম দেখেছিলাম ১৯৬৬ সালের মে মাসের এক সন্ধ্যায় একটি আন্ডারগ্রাউন্ড সভায়। সেদিনের সেই বৈঠকে সাদা পায়জামার ওপর সাদা ফুল হাতা লম্বা কুর্তা-শার্ট গায়ে ফর্সা, লম্বা, কালো চশমা পরা কমরেড আজাদ নামের যে মানুষটির তেজোদীপ্ত বক্তৃতা শুনেছিলাম, পরে জানতে পেরেছিলাম- তিনিই ছিলেন কমরেড মণি সিংহ। এর কিছুদিন পরে তিনি আত্মগোপন থাকা অবস্থাতেই গ্রেপ্তার হয়ে যান। '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে মুক্ত হয়ে আসার পর তাঁর সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ ও সামনাসামনি কথাবার্তা বলার প্রথম সুযোগ হয়েছিল।

'৬৯-এর তাঁর স্বল্পকালীন মুক্ত থাকা অবস্থায় কমরেড মণি সিংহ আমাদের বলেছিলেন, মনে রাখবে, তোমাদের এই ১১ দফার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান 'আরও বড় সংগ্রামের ড্রেস-রিহার্সাল মাত্র।' তিনি আরও বলেছিলেন, 'আর্মড স্ট্রাগল ইস ইন দি এজেন্ডা নাও;' অর্থাৎ 'সশস্ত্র সংগ্রামের বিষয়টি এখন আলোচ্য বিষয়।' এই দুটি মাত্র বাক্যে তিনি আসন্ন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে আমাদের নির্দেশনা প্রদান ও উজ্জীবিত করেছিলেন।

ইয়াহিয়ার সামরিক শাসনের পর কমরেড মণি সিংহকে আবার আত্মগোপনে যেতে হয়েছিল এবং সেই অবস্থাতে তিনি আবার গ্রেপ্তার হয়ে যান। '৭১-এর ২৬ মার্চ যেদিন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, সেদিন তিনি রাজশাহী জেলে বন্দি ছিলেন। জনগণ কারাগার ভেঙে তাঁকে মুক্ত করে এনেছিল।

কমরেড মণি সিংহের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ-পরিচয় ঘনিষ্ঠতার পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়। তখন মাঝেমধ্যেই তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। কোনো কোনো দিন একই বাসায় রাত কাটিয়েছি। আমি ছিলাম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা, বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রথম দলের একজন কমান্ডার। তিনি আমার কাছে অস্ত্রশস্ত্র সম্পর্কে, যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে, আমাদের গেরিলা দলগুলোর তৎপরতা সম্পর্কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু জানতে চাইতেন। এসব বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করার সময় তাঁর চোখ-মুখ উজ্জল হয়ে উঠত। মনে হতো, আমি যে অস্ত্র ধারণ করে হানাদার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি, তা যেন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এবং টংক শোষকদের বিরুদ্ধে তাঁর যৌবনকালের সশস্ত্র সংগ্রামের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে। আমাকে দেখলেই তাঁর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠত, মনে হতো যেন তিনি তাঁর যৌবন আবার ফিরে পেয়েছেন। আমিও অনুভব করতাম যেন গারো পাহাড় এলাকার টংক প্রথাবিরোধী সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের সেনাপতি, অস্ত্র কাঁধে ঝোলানো সাদা ঘোড়ায় সওয়ার চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকের মণি সিংহ এখন আমার সামনে উপস্থিত।


কমরেড মণি সিংহ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা- স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য এবং কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক-সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ৭০ বছর বয়সের এই মানুষটি সে সময় ৯ মাস ধরে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক, আন্তর্জাতিক, আদর্শিকসহ বহু কাজে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের গতিধারা সঠিক পথে প্রবাহিত করতে, তার প্রগতিমুখিনতা নিশ্চিত করতে, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দেশি-বিদেশি শক্তির সমাবেশ ও ঐক্য গড়ে তুলতে এবং জাতির এই মরণপণ সংগ্রামকে বিজয়ের পথে নিয়ে যেতে তিনি অমূল্য অবদান রেখেছেন।

স্বাধীনতার পর আরও অনেক কাছে থেকে কমরেড মণি সিংহকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। অগণিত জনসভায়-সভায়, প্রকাশ্য-গোপন বৈঠকে, আন্ডারগ্রাউন্ডে এক ডেনে, জেলা সফরে, জনসভায়, বিদেশ সফরে, পার্টির সমাবেশে, কৃষক সমিতি-ক্ষেতমজুর সমিতির কর্মসূচিতে তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবং এক পর্যায়ে পার্টির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীতে তাঁর সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্যও আমার হয়েছিল। তাঁকে কাছে থেকে দেখেছি, তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তাঁর মাঝে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম একজন বিশুদ্ধ কমিউনিস্টকে, অসাধারণ এক বড় মাপের মানুষকে।

আমার দুর্লভ সুযোগ হয়েছিল তাঁর সঙ্গে অনেক মাস জেলখানায় একই ওয়ার্ডে পাশাপাশি সিটে থাকার। আমার কারাজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন ছিল কমরেড মণি সিংহের নিবিড় সঙ্গ পাওয়া, এরূপ একজন সুনিপুণ আচার্যের সান্নিধ্য পাওয়া। বিপ্লবী রাজনৈতিক জীবনবোধের নিখুঁত প্রতিফলন, তাঁর মাঝে তখন দেখেছি। শৃঙ্খলাপূর্ণ প্রাত্যহিক জীবনাভ্যাস, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-বিনোদন, বন্দিদের প্রতি মমত্ববোধ, সাধারণ কয়েদিদের প্রতি প্রীতিময় আচরণ- তখনকার পঁচাত্তর বছর বয়সী মণি সিংহের কারাগারের দিনগুলো এসব বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত ছিল।

মার্কসবাদী বিপ্লবী জীবনাদর্শই কমরেড মণি সিংহকে একজন বড় মাপের মানুষ হিসেবে ইতিহাসে তাঁর পরিচয় লিপিবদ্ধ করে যেতে পথ দেখিয়েছে। তাঁর জীবনসংগ্রাম ছিল মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য এবং তাঁর মধ্য দিয়ে সার্বিক মানবমুক্তির জন্য। মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ তথা সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল তাঁর আমৃত্যু সংগ্রামী প্রয়াস। তাঁর সাধনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল 'মানুষ'। 'মানুষের' মুক্তিসাধনের কাজে মেহনতি শ্রেণিকেই যে অগ্রবাহিনী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে, সে কথা তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং সে কাজটি যে কেবল শ্রেণিসংগ্রামের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে একটি সমাজবিপ্লবের মাধ্যমেই সম্পন্ন হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন। তাই তিনি সাধারণ 'মানবতাবাদের' কথা না বলে সবসময় 'বিপ্লবী মানবতাবাদের' কথা বলতেন। মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মানবপ্রেমকে সমাজে সর্বজনীন করে তুলতেই মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছিল তাঁর আজীবন বিপ্লব প্রয়াস।

কমরেড মণি সিংহ ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ; ছিলেন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সৃজনশীল বৈজ্ঞানিক মতাদর্শে দৃঢ় আস্থাবান একজন খাঁটি কমিউনিস্ট নেতা। সেই পরিচয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ জাতীয় নেতা।

লেখক:  মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: রাজনীতিবিদ

ঢাকানিউজ২৪.কম /

স্মরণীয় ও বরণীয় বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image