• ঢাকা
  • শনিবার, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ; ১৩ জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image
website logo

মিয়ানমারে সংঘাত, সীমান্তে সক্রিয় দালালরা 


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: বুধবার, ১০ জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ০৬:৪৬ পিএম
সীমান্তে সক্রিয় দালালরা 
মিয়ানমারে সংঘাত

টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি : নাফ নদীর এক পাড়ে কক্সবাজারের টেকনাফ অন্য পাড়ে রাখাইনের মংডু শহর। এই নদী বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত। নাফের ওপাড়ে চলমান সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর চলমান যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও তৎপর হয়ে উঠেছে দু’দেশের রোহিঙ্গা পারাপারের দালাল চক্ররা। 

অভিযোগ উঠেছে, অর্থের বিনিময়ে এই চক্রের মাধ্যমে নতুন করে বাংলাদেশে আসছেন রোহিঙ্গারা। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলো অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে তৎপর রয়েছে দাবি করা হলেও সম্প্রতি কতজন বাংলাদেশের এসেছেন সে সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য কোনো কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি। গত কয়েক সপ্তাহে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। 

তাঁরা জানান, প্রাণ বাঁচাতে তাঁরা বাংলাদেশে এসেছেন। বর্ডার পার হতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের চক্রকে টাকা দিতে হয়েছে। আর সীমান্তবর্তী স্থল-নাফ নদী পার করে নাইক্ষ্যংছড়ি, তুমব্রু ও টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ করছে।

নাফনদে রোহিঙ্গা পারাপারের দালালার চক্র হয়ে উঠেছে বলে স্বীকার করেছেন টেকনাফের নৌ-পুলিশের ইনচার্জ পরিদর্শক তপন কুমার বিশ্বাস। 

তিনি জানান, ‘মিয়ানমারে চলমান যুদ্ধের সুযোগে কিছু দালাল চক্র রোহিঙ্গা পারাপারের বাণিজ্যে গড়ে তুলার খবর আমরাও শুনেছি। আমরা সেসব দালালদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ করছি। এছাড়া নাফনদ দিয়ে যাতে কোন অনুপ্রবেশের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য আমরা টহল অব্যাহত রেখেছি। কিন্তু আমাদের জনবল সংকটের পাশপাশি নৌযান না থাকায় যখন-তখন অভিযানে নামতে পারিনা।’  

রাখাইন থেকে প্রথমে হেঁটে নাফ নদীর ওপারের তীরে আসে রোহিঙ্গারা। ওই নদীতীরেনৌকা নিয়ে বসে থাকে দালালেরা। এপারে বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তে থাকে দালালেরা। রাতে দুই পারের দালালেরা টাকা নিয়ে রোহিঙ্গারা ঢুকচ্ছে বাংলাদেশে।

জানা গেছে, দালালরা ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকার বিনিময়ে উখিয়া-টেকনাফের সীমান্তে রাতে আধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে এ অবৈধ পাচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কাজে সীমান্তের অন্তত ২০ জনের বেশি নাম পাওয়া গেছে। 

টেকনাফের বদি আলম, হেলাল উদ্দিন, মো. রহিম বাদশা, মো. বলি, নুর মোহাম্মদ, মোহাম্মদ শালমান, মো. শামসুল আলম, মো. জাবেদ, ইমান হোসেন ইউচুপ, মো.ইউনুছ, মো. সিরাজ, আজিজ উল্লাহ, জাফর আলম, মো. জিয়াবুল, মো. শফিক, মুহাম্মদ মান্নান, করিম উল্লাহ, নজির আহমেদ, মো. শফিক, মো. ফারুক, মো. জয়নাল, নুর হোসেন ও মো. সাদ্দাম প্রমুখ। 

পুলিশের মানব পাচার তালিকায় এদের নাম রয়েছে। আছে অনেকের মানব পচারের আইনে মামলাও।  এসব দালালরা ১৬টি পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসছে। 

এ বিষয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহফুুজুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তের এই পরিস্থিতিতে মধ্যস্থকারী (দালালদের) আবিভার্ব না ঘটে সেজন্য আমাদের গোয়েন্দা নজরদারী বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সাধারন মানুষদের সাথে নিয়ে যাতে কোন অনুপ্রবেশ না ঘটে, সেজন্য কাজ করছি। পাশপাশি যদি এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটে, আমরা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করব।’ 

সম্প্রতি শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এক স্বজনের সঙ্গে একটি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন মোহাম্মদ সাজে।  মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে নৌকায় আরও ১২ জন রোহিঙ্গার সঙ্গে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।

এ রোহিঙ্গা তরুণ বলেন, “আমার বাড়ি বুথিডাংয়ে। সেখানে যুদ্ধে সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেছে।  আমার বাবা মর্টার শেলের আঘাতে নিহত হয়েছেন। আরাকান আর্মি গ্রামে প্রবেশ করে এক ঘণ্টার মধ্যে সবাইকে গ্রামটি খালি করতে বলে।  গ্রাম না ছাড়লে সবাইকে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেয়। কিছু খাবার নিয়ে আমরা গ্রাম ছেড়ে আসি।

তিনি আরও জানান, '৬০ জন যুবক আরাকান আর্মির হাতে ধরা পড়েছিল, আমি জানি না তাঁদের পরিণতি কী হয়েছে। পালানোর সময় আমি নিজের চোখে দেখেছি অনেক যুবককে হত্যা করা হয়েছে। মংডুতে এসে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে আমরা তিন দিন আশ্রয় নেই। তারপর দালাল মোহাম্মদ ইউনুসের মাধ্যমে প্রত্যেকে চার লাখ কিয়াট দিয়ে পালিয়ে আসি।'

টেকনাফ সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের টহলের কারণে দুই দিন তাঁকে নৌকায় ভাসতে হয়েছে জানিয়ে সাজে বলেন, 'প্রবল বর্ষণের মধ্যে এক রাতে আমরা গোলারচর এলাকা দিয়ে শাহপরীর দ্বীপে প্রবেশ করি। সে সময় তিনজন দালাল ছিলেন, আমি তাঁদের আগে কখনো দেখিনি।'

অনুপ্রবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে ৮-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আমির জাফর  বলেন, 'গত কয়েক মাস ধরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ চলছে, ফলে সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা সেখানে টিকে থাকতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।  তারা এখানে (বাংলাদেশ) আসার চেষ্টা করছে, কেউ কেউ হয়তো ঢুকেছে। পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।’

কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের নেতা মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, 'আমরা যেভাবে জীবনযাপন করছি তা মোটেও ভালো নয়। তবে রাখাইনে রোহিঙ্গারা মৃত্যুর মুখোমুখি, তাই পালিয়ে এখানে নিরাপদ আশ্রয়ে আসার চেষ্টা করছে। এ সুযোগে দালালরা বাণিজ্যে করছে।’ 

গত ২০ মে ২৩ জুলাই পর্যন্ত টেকনাফের জেলেদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবুও অনেকে নৌকায় সাগরে নামছেন। মাছ ধরার নামে কৌশলে টাকার বিনিময়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা পারাপারের উদ্দেশ্য সরকারি নির্দেশ অমান্য করে সাগরে নামছে দালাল চক্রের সদস্যরা। 

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা দোলোয়ার হোসেন বলেন, ‘অভিযানের পরও আমাদের অজান্তে কিছু নৌকা নামছে সেটা সত্য। কিন্তু এসব নৌকা রোহিঙ্গা পারাপার করছে কিনা সেটা বলা মুশকিল। বিষয়টি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় তুলে ধরব।’

সীমান্ত অনুপ্রবেশ ঠেকানার পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবি সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ।

ঢাকানিউজ২৪.কম / কেএন

আরো পড়ুন

banner image
banner image