মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার সদর প্রাচীন ঐতিহ্য হযরত সৈয়দ শাহ্ মোস্তফা (রহ.) মেলায় ১৫ বছর পরে আবার দেখা মিলেছে অন্যতম চুঙ্গাপুড়া পিঠার ঢলুবাঁশ ।
আগের মতো এখন আর গ্রামীন এলাকার বাড়িতে বাড়িতে চুঙ্গাপুড়ার আয়োজন চোখে পড়ে না। শীতের রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে সারারাত চুঙ্গাপুড়ার দৃশ্যও তাই দেখা যায় না। বর্তমানে সেই দিন আর নেই। চুঙ্গাপিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল (বিরইন ধানের চাল) সরবরাহ এখন অনেক কমে গেছে। অনেক স্থানে এখন আর আগের মতো চাষাবাদ ও হয় না। মৌলভীবাজারে চা-বাগানের টিলায়, ঢলুবাঁশ পাওয়া যেতো।
অনেক আগেই বনদস্যু ও ভুমিদস্যু এবং পাহারখেকোদের কারনে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে ঢলুবাঁশ। ঢলুবাঁশে অত্যধিক রস থাকায় আগুনে না পুড়ে ভিতরের পিঠা আগুনের তাপে সিদ্ধ হয়। ঢলুবাঁশের চুঙ্গা দিয়ে ভিন্ন স্বাদের পিঠা তৈরি করা করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো জায়গায় চুঙ্গার ভেতরে বিন্নি চাল, দুধ, চিনি, নারিকেল ও চালের গুড়া দিয়ে পিঠা তৈরি করা হয়। অনেক স্থানে এখন আর আগের মতো চাষাবাদ ও হয় না।
পাহাড়ে বাঁশ নাই বলে বাজারে ঢলুবাঁশের দামও এখন তাই বেশ চড়া। ব্যবসায়ীরা দুরবর্তী এলাকা থেকে ঢলুবাঁশ ক্রয় করে নিয়ে যান নিজ নিজ উপজেলার বাজার সমুহে বিক্রির আশায়। আলাপকালে অনেকেই আক্ষেপ করে জানান, এ বাঁশটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া জরুরী।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুরের বাঁশ বিক্রেতা হাসিম মিয়া বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে ক্রয় করে এনে ৫/৬ টাকা দামে পিস হিসেবে বিক্রি করি। আস্তাবাঁশ প্রতি পিস ৮০ থেকে ১০০ টাকা বিক্রি করি। এখন বাঁশ পাওয়া যায় না। তবে দেওড়াছড়া, প্রেমনগর এবং গিয়াসনগর বাগানে কিছু কিছু বাঁশ পাওয়া যায়। পাঁচশো বাঁশ এনেছিলাম। প্রায় চার হাজার টাকা বিক্রি করেছি।
পিঠা তৈরী করার জন্য সদর উপজেলার হযরত সৈয়দ শাহ্ মোস্তফা (রহ.) মেলায় ঢলুবাঁশ কিনতে আসা মাসুদ মিয়া বলেন, চুঙ্গাপিঠার বাঁশ কেনার জন্য এসেছি। আমাদের পূর্বপুরুষরা এ পিঠা বানিয়ে খেতেন। ২ আটি বাঁশ ৬০০ টাকা দাম চাচ্ছেন। আমি ৫০০ টাকা বলেছি। আমরা প্রতিবছর এখান থেকে বাঁশ নিয়ে পিঠা বানিয়ে খাই। আজ থেকে ১৫ বছর আগে প্রচুর দেখা যেতো।
ক্রেতা জিয়াউর রহমান বলেন, চুঙ্গাপিঠা খাওয়ার জন্য বাঁশ কিনতে এসেছি। আগের মুরুব্বিরা চুঙ্গাপিঠা খেতেন শুনেছি। আমরা কখনো খাইনি, এবার খেয়ে দেখব কেমন মজা হয় চুঙ্গাপিঠা।
কালাপুর থেকে আসা আরেক বাঁশ বিক্রেতা মুজাহিদ মিয়া বলেন, আমি বিগত কয়েক বছর ধরে এখানে এসে বাঁশ বিক্রি করি। দিনে দিনে এই ব্যবসা কমতে আছে। এখনকার লোকেরা আগেকার ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে না। শহরের লোকেরা এসব খেতে অভ্যস্ত নয়। এখনও গ্রামের মানুষরাই এ বাঁশ কিনে নিয়ে যায়।
মৌলভীবাজার জেলার লেখক-গবেষক আহমদ সিরাজ জানান, ‘আগে কম-বেশি সবার বাড়িতে ঢলু বাঁশ ছিল। এখন সেই বাঁশ আগের মতো নেই। এই বাঁশ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। একসময় এই ঢলুবাঁশ দিয়ে চুঙ্গাপুড়ার ধুম লেগেই থাকতো।’



