নিজস্ব প্রতিবেদক: গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকারলঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে এখনই মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নিচ্ছে না জাতিসংঘ। বরং ৫ আগস্টের আগের অপরাধগুলোর পাশাপাশি পরবর্তী সহিংসতার অর্থাৎ সকল হত্যাকান্ডের জবাবদিহি চায় জাতিসংঘ। ঐসব ঘটনার অধিকতর ফৌযদারী তদন্তও চায় আর্ন্তজাতিক সংস্থাটি। গত বুধবার জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে এমন প্রত্যাশাই উঠেছে এসেছে।
জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টের শুরু থেকে পরবর্তী সময়ে ‘সহিংস মব’ পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হত্যাসহ গুরুতর প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। এ সময় হিন্দু, আহমদিয়া মুসলিম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। তাদের বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে এবং জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাজার, মন্দিরসহ ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা করা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এমন ব্যক্তিদের এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে ভুক্তভোগীদের মানবাধিকার রক্ষা করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
জাতিসংঘের তদন্তদল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে বিচারহীনতা ও প্রতিশোধের চক্রের মধ্যে আছে। আগস্টের শুরু থেকে প্রতিশোধমূলক সহিংসতা এবং নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন-নিপীড়নকারীদের অনেকে দৃশ্যত দায়মুক্তি পাচ্ছে। গত বছরের ১৪ অক্টোবর সরকার ঘোষণা দেয়, ‘শিক্ষার্থী ও জনতা, যাদের কারণে গণ-অভ্যুত্থান সফল হয়েছে, তারা কোনো বিচার, গ্রেপ্তার ও হয়রানির সম্মুখীন হবেন না।
বেশির ভাগ সহিংসতা আত্মরক্ষার্থে ও তুমুল উসকানির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘটেছে।’কিন্তু জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর মনে করে, হত্যা, যৌন নিপীড়ন, লুটতরাজ, আবাসিক ভবনে অগ্নিসংযোগ এবং জাতিগত, ধর্মীয় ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ক্ষেত্রে দোষীদের ছাড় দেওয়া যাবে না।
প্রতিবেদনে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা, থানায় হামলা-অগ্নিসংযোগ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মারধর ও হত্যা, নারীদের যৌন হয়রানি, ধর্ষণ এবং আওয়ামী লীগের নেতা-সমর্থকদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, হিন্দু, আহমদিয়া সম্প্রদায়, পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ওপর হামলা, মাজার ও মন্দির ভাঙচুর, আগুন দেওয়া, সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগস্টের শুরুর দিকে বিগত সরকার ক্রমেই নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে। এ সময় জনতা প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডসহ অন্যান্য সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে ধারণা করা ব্যক্তি, পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে বিবেচিত সংবাদমাধ্যমে হামলা চালানো হয়। বিক্ষোভের আগে-পরে হিন্দু সম্প্রদায়, আহমদিয়া মুসলিম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা ‘মব’-এর সহিংস হামলার শিকার হয়। বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত এসব হামলায় জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির কিছু সমর্থক এবং স্থানীয় নেতারাও জড়িত হন।
জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাপ্ত তথ্য মতে, ওই ঘটনাগুলো দৃশ্যত দলগুলোর কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে নির্দেশনা অনুযায়ী হয়নি। দলগুলোর নেতারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরপরই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে অগ্রাধিকার দেয়। সে সময় অস্থায়ীভাবে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আনসার-ভিডিপি সদস্যদের পুলিশ স্টেশনে মোতায়েন করা হয়। কিছুদিন পর সরকার পুলিশের কার্যক্রম আবার সচল করতে সক্ষম হয়। যদিও পুলিশের কার্যকারিতা তখনো সীমিত ছিল। প্রতিশোধমূলক হামলা ও সহিংসতা পুরোপুরি প্রতিরোধ করতে পারেনি সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম কয়েক দিনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জনগণকে সব ধরনের সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহবান জানান।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মানবাধিকারের প্রতি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে গুরুতর নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে হবে। একই সঙ্গে যথাযথ নিয়ম মেনে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে আওয়ামী লীগ সমর্থক, পুলিশ কর্মকর্তা এবং নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের ওপর হামলার তদন্ত করতে হবে।
জাতিসংঘ বলেছে, এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতের লক্ষ্যে যেসব তথ্য জাতিসংঘের তদন্তদলের পক্ষ থেকে চাওয়া হয়েছিল, সেগুলো সরবরাহ করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সমর্থক বা পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনায় মোট কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি সরকার।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, পুলিশ, ধর্মীয় ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ওপর সংঘটিত অপরাধের দ্রুত ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, এসব ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের মধ্যে যাদের পরিচয় জানা গেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। বিচারহীনতা ও প্রতিশোধের চক্র থেকে মুক্তির জন্য জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।



