নিউজ ডেস্ক : রবিবার (৩০ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদ বিশেষ সভায় শরীয়াহভিত্তিক পাঁচটি সমস্যাজনিত ব্যাংক একত্রে নিয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’-কে চূড়ান্ত লাইসেন্স দিয়েছে।

সরকারি মালিকানার এই নতুন ব্যাংকটি ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা প্রকাশ করেছে। ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক সচিব মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া নিয়োগ পেয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সম্মিলিত ব্যাংকের মোট পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকার ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ব্যাংক একীভূতির পর আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ‘শিগগিরই’ পরিশোধ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক – এ পাঁচটি ব্যাংকই দীর্ঘদিন ধরে আর্থিকভাবে সমস্যায় ছিল। এসব ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ খেলাপি হওয়ার হার অত্যন্ত উঁচু, ফলে পৃথকভাবে এগুলোর পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছিল।
৫ নভেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। এরপরই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সরকারকে চিঠিতে পরামর্শ দেয় পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠন করার। এ পরিস্থিতিতে গভর্নর আহসান হাকিম মনসুর বলেন, আর কোনো বিকল্প ছিল না, এই একীভূতির মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
আমানতকারীর স্বার্থে পাঁচটি ব্যাংক একীভূতির ফলে আমানতকারীদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার নিশ্চিত করেছে যে একীভূত ব্যাংকে আমানতকারীরা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত নিজের আমানত তোলার সুযোগ পাবেন। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে পরিশোধ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে, যার ফলে সাধারণ গ্রাহকদের সুরক্ষিত থাকার পরিশেষ আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
পুঁজি ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ -নতুন ব্যাংকের পেইড-আপ ক্যাপিটাল ৩৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ এবং সরকারের ২০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ দেশের ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন। বৃহৎ পুঁজি ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের অবিশ্বাস নির্মূলে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইসলামি ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সম্মিলিত ব্যাংকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশার কথা জানিয়েছেন।
আমানতকারীর সুরক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে নতুন ব্যাংকের সম্মিলিত আমানতকারীদের জন্য ফেরত কর্মসূচি শুরু হবে। শীঘ্রই আমানত, সুদের হার, বেতনস্কেলসহ অন্যান্য ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে। এতে আমানতকারীরা আপত্তিকর পরিস্থিতিতে টাকার দ্রুত উত্তোলনের সুযোগ পাবেন।

‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নতুন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ইতিমধ্যে গঠিত হয়েছে; সভাপতি হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যান্য সদস্যরা সরকারি বিভিন্ন বিভাগের সচিব ও যুগ্ম সচিবরা। শীর্ষ পদে পেশাদার ব্যাংকার, হিসাববিদ ও আইনজীবী নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি করা হয়েছে। নতুন এমডি ও কর্মকর্তাদেরও একইভাবে অনুক্রমে নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে বলা হয়, এই ব্যাংকগুলোকে একীভূত করলেও মোট আমানত প্রায় ১,৫৩ হাজার কোটি এবং বিনিয়োগ ১,৯২ হাজার কোটি টাকা দাঁড়াবে; খেলাপি ঋণের গড় হার ৭৩%। তাই মার্জার করলে নতুন ব্যাংকটি হয়তো আরও বড় একটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে। একই দৃষ্টিভঙ্গিতে, মার্জারের ফলে আদৌ সমস্যার মূলে কাজ হবে কি সন্দেহ করা হচ্ছে – কারণ নতুন ব্যাংক এক নতুন সত্ত্বা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ববর্তী দুর্নীতির হিসাব-নিকাশ হারিয়ে যেতে পারে, যা মোরাল হ্যাজার্ড তৈরি করবে। ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞরা বলছেন, মার্জার চিহ্নিত বিনিয়োগে অস্থিরতা বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সংবেদনশীল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।
নতুন ব্যাংক প্রথমে সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন থাকবে, পরবর্তী ধাপে (প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে) বেসরকারি খাতে বেচে দেওয়া হবে। অর্থাৎ সরকারের উদ্যোগে দেউলিয়া ব্যাংকগুলোকে একত্রিত করে পর্যায়ক্রমে পরিচালনা ও মালিকানা স্থিতিশীল করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাজস্বের স্বার্থে দেওয়া ব্যয় বাড়লেও ব্যাংকিং খাতকে বড় ধরনের ধাক্কা থেকে বাঁচানোর চেষ্টা হিসেবে এই পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, এই একীভূতির ফলে দেশের সর্ববৃহৎ সরকারি মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংক গঠন হয়েছে, যা ব্যবসায়িক ও আমানতদাতা উভয়ের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে অভিজ্ঞ বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যথাযথ শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে এবং পরিচালনায় স্বচ্ছতা না থাকলে এই উদ্যোগের প্রকৃত সুফল পাওয়া কঠিন। এর ফলে আগামী দিনে ব্যাংকিং খাতে এ পরিবর্তনের প্রভাব সঠিকভাবে নিরীক্ষণ করতে হবে।
ঢাকানিউজ২৪/মহফ



