ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামনারী জাগরণের দূত রোকেয়ার সমাজ-ভাবনা

নারী জাগরণের দূত রোকেয়ার সমাজ-ভাবনা

মো. শওকাত আলী

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত, যিনি প্রথাবদ্ধ সমাজে নারীর জন্য কেবলই স্বপ্ন নন, একরাশ মুক্তির আলোকবর্তিকা; কেবলই আশাহত বস্তু নন, তীব্র ভরসার আশ্রয়ভূমি। তিনি তাঁর কাজকর্মে বিশ শতকের নারীসমাজের উন্নতির জন্য নিজের মেধা, মনন ও সামর্থ্যকে উৎসর্গ করে গিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নারীদের জন্য স্কুল ও বিভিন্ন সভা-সমিতি। বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াসে কলম ধরেছিলেন সাহিত্য রচনায়। তাঁর সাহিত্য জুড়ে আছে নারীমুক্তির আকাঙ্ক্ষা, যা বাংলাদেশের বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

রোকেয়ার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে রংপুরের মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে। গ্রামের মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হওয়ায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার। বড় ভাই ও বোনের সাহচর্যে বাংলা ভাষা, ইংরেজি শিক্ষা এবং বিয়ের পর স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের আনুকূল্যে জ্ঞান অর্জন তাঁর চিন্তার পথ বিকশিত হতে সাহায্য করেছিল।

নারী যে শ্রম দেন, তার কোনো মূল্য নেই। যে নারী চাকরিজীবী-মা, তাঁকে একই সঙ্গে সংসার, অফিস, পরিবার– সব জায়গায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার পরও থাকতে হয় উপেক্ষিত। শিক্ষিত নারীকে সমাজ যেভাবে দোষারোপ ও কটাক্ষ করে, সে তুলনায় অশিক্ষিত, দাসানুগ্রাহী নারীর দোষ কমই গণ্য করা হয়। আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় এই মানসিক বিষয়গুলো স্বামী-স্ত্রী বা নারী-পুরুষকে অনির্দিষ্ট সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ সম্পর্ক শুধু মুসলিম সমাজেই নয়; আমাদের সামাজিক বিন্যাসে পুরুষের অবস্থান এবং হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে আপামর নারী সমাজেই পরিলক্ষিত হয়। বিশ শতকে রোকেয়া আক্ষেপের সুরে লিখেছিলেন, ‘আমাদের শয়নকক্ষে যেমন সূর্যালোক প্রবেশ করে না, তদ্রূপ মনোকক্ষেও জ্ঞানের আলোক প্রবেশ করিতে পারে না। যেহেতু আমাদের উপযুক্ত স্কুল, কলেজ এক প্রকার নাই।’ এই না-থাকা পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি বলে নারীর মন সেভাবে বিকশিত হতে পারছে না। আগে যেমন নারীকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, এখনও ঠিক তেমনি। ফলে আমাদের সমাজে মেয়েদের স্কুল-কলেজে গমনের অগ্রসরমান কিছু চিত্র দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে বয়স ১৮ হওয়ার আগেই ঝরে পড়ার হার বেশি। বাল্যবিয়ে, যৌতুক প্রথা থেকে এখনও নারীকে মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতনের চিত্রের সঙ্গে যৌন নির্যাতনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আইন যদিও আছে কিন্তু বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের দীর্ঘসূত্রতা অপরাধ ও অপরাধীকে আরও বেপরোয়া করে।

রোকেয়া একদিকে যেমন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গঠনমূলক সমালোচনা করেছেন; সেই সঙ্গে স্ত্রী বা নারী জাতিকেও সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন। তিনি অনুভব করেছেন, কেউ যদি নিজ থেকে চেষ্টা না করে তাহলে জগতের অন্য কেউ এসে তাকে সাহায্য করবে না। নিজের উন্নতির জন্য সবার আগে নিজেকে অগ্রসর হতে হয়। আসন্ন বিপদ, ঝুঁকি সামলানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। পাশ্চাত্য সমাজে বিশেষ করে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে নারীরা নিজেদের অধিকার আদায়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে দাবিদাওয়া পেশ করে নিজেদের প্রাপ্য ও সামাজিক অধিকার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। পক্ষান্তরে বাঙালি মুসলিম নারীসমাজ সেই সাহস ও দাবিদাওয়া চাইতে পারে না। উল্টো নিজেদের অধিকারপ্রাপ্তিতে পুরুষের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায়। রোকেয়া সেই প্রসঙ্গে বলেন, ‘নারীদের চিন্তা ও বুদ্ধি বিকাশের জন্য হলেও সুশিক্ষা দেওয়া দরকার। শুধু পাঠ্যপুস্তকের গৎবাঁধা বই পড়া এর জন্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থা।’ যার বদৌলতে নারীরা প্রকৃতভাবে নিজেদের অবস্থান ও পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারবেন। সচেতন হতে পারবেন নিজেদের অধিকার-সংক্রান্ত বিষয়ে।

বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয় একটি দৃশ্যমান সমস্যা। অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি ক্ষমতা, অর্থ বা স্বার্থের প্রলোভনে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। শিক্ষার আলো থাকা সত্ত্বেও সমাজে দুর্নীতি, মিথ্যাচার, হিংসা, নারী নির্যাতন কিংবা প্রতারণার মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে। এর ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও মূল্যবোধের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।

আমাদের সমাজে এখনও নারীরা অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে তাদের শ্রমের দাম পুরুষের চেয়ে কম দেওয়া হয়। শিক্ষায় ঝরে পড়ার হারও বেশি। পাশাপাশি সমাজে নারী নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ তো আছেই। তাই আমাদের সমাজ কাঠামোতে পুরুষ ও নারীর সহাবস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর প্রতি সব অবরোধ, প্রথা ও শৃঙ্খলা, নির্যাতন বন্ধ ব্যতীত আধুনিক সাম্য এবং সামাজিক সুবিচার ও মানবিক মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব নয়।

প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী: উপাচার্য, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular