মাহমুদ মীর
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সারা বিশ্বে এ দিবসটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। যথাযথ মর্যাদায় বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠন দিবসটি উদযাপন করছে।
দিবসটি পালনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ সালে মজুরি বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং অমানবিক কর্মপরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা রাস্তায় নামেন। সেই মিছিলে সরকারের লেঠেল বাহিনী দমন-পীড়ন চালায়।

১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এক সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেৎকিনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনের সূচনা হয়। ক্লারা জেৎকিন ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ এবং জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৭টি দেশ থেকে প্রায় ১০০ নারী প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। ওই সম্মেলনে ক্লারা জেৎকিন প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন।
সিদ্ধান্ত হয়, ১৯১১ সাল থেকে দিনটি নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে পালন করা হবে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতারা দিবসটি পালনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
১৯১৪ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হতে থাকে।
বাংলাদেশেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের আগ থেকেই দিবসটি পালন করা শুরু হয়।
১৯৭৫ সালে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। দিবসটি পালনের জন্য জাতিসংঘ বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায়। এরপর থেকে সারা বিশ্বে যথাযথ মর্যাদায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর দিবসটি উপলক্ষে একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়।
‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’- এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপিত হচ্ছে।
দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থা দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক ‘অদম্য নারী পুরস্কার’ প্রদান, আলোচনা সভা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে। এরই অংশ হিসেবে রয়েছে সাবেক ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননা প্রদান।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে নারী অধিকার, সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রাখা নারীদের স্বীকৃতি প্রদানসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
এছাড়া অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকেও দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় উদযাপন করা হচ্ছে।
এ বছর বিশ্বব্যাপী ‘গিভ টু গেইন’ (দিয়ে অর্জন) প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে, যা নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠায় পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেয়। এই কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজে তাদের অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। উল্লিখিত প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জেলা ও উপজেলায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য অনুরোধ জানায় মহিলা অধিদপ্তর।
বাংলাদেশের দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা বিশ্বের সকল নারীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।

শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের যে ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেটিকে আরও শক্তিশালী ও সময়োপযোগী রূপ দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
রবিবার (৮ মার্চ) রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি।
এ সময় তিনি নারীশিক্ষায় বেগম খালেদা জিয়ার নেওয়া নানা পদক্ষেপের প্রশংসা করে বিশ্বব্যাপী তার স্বীকৃতি ও সুনামের কথা তুলে ধরেন।
নারী অধিকার রক্ষায় বিএনপি সরকারের ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন পদক্ষেপেরও প্রশংসা করেন তিনি।
এ সময় নারীদের অধিকার রক্ষায় বিএনপি সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপে সবাইকে পাশে থাকার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
এর আগে অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ‘গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননায় ভূষিত করা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতির হাত থেকে খালেদা জিয়ার পক্ষে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন তার নাতনি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।
আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অদম্য নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়ার অসামান্য অবদানের জন্য এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য এবার মোট পাঁচটি ক্যাটাগরিতে পাঁচজনকে দেওয়া হয়েছে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারীর পুরস্কার।
এ বছরের পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন-
১. গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ খালেদা জিয়া
২. অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী নুরুন নাহার আক্তার

৩. শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী মোছা. ববিতা খাতুন

সহকারী শিক্ষক
লালন শাহ রেজিঃ বেঃ প্রাঃ বিদ্যালয়
৪. সফল জননী নুরবানু কবীর
৫. নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে ফেলে জীবনসংগ্রামে জয়ী নারী মোছা. শমলা বেগম
৬. সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা নারী মোছা. আফরোজা ইয়াসমিন
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেন, ‘শত অত্যাচারে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অদম্য ও অবিচল। নারীদের সাহস প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে। সমতা, মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে নারীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে সব ক্ষেত্রে। নারীরা এগিয়ে গেলে জাতিও এগিয়ে যায়।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ও খালেদা জিয়ার পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন নারীর অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে বলে আমি মনে করি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। নারীদের রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনীতির মূলধারার বাইরে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশেষ করে, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে ঘরে বাইরে সামগ্রিক উন্নয়নের সুফল সম্ভব নয়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। নারীদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মাদার অব ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়া যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিলেন। শহীদ জিয়ার শাসনামলে ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে ‘নারী বিষয়ক দফতর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭৮ সালে গঠন করা হয় ‘মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ যা পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ১৯৯৪ সালে ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’-এ রূপান্তরিত হয়েছিল।

নারীর আর্থসামাজিক ক্ষমতায়নে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেছিলেন। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। একই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করেছে। বর্তমান সরকার শিক্ষা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও রাজনীতিসহ সকল স্তরে নারীর সক্রিয় ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে নারী-পুরুষ সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। সম্মান ও মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজে কাজ করবে। আমাদের বিদ্যমান সমাজে সমতা হোক অঙ্গীকার, মর্যাদা হোক বাস্তবতা, আর ক্ষমতায়ন হোক উন্নয়নের ভিত্তি। আমি ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ উপলক্ষ্যে গৃহীত সকল কর্মসূচির সফলতা কামনা করছি।
দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব আলোচনা সভা, সম্মাননা প্রদান ও প্রদীপ প্রজ্বলন কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও (ডিআরইউ) দিবসটি উপলক্ষে র্যালিসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে।




