ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeনারী ও শিশুহাম (Measles) সংকটের ছায়ায় শিশুস্বাস্থ্য: আমাদের করণীয়

হাম (Measles) সংকটের ছায়ায় শিশুস্বাস্থ্য: আমাদের করণীয়

প্রফেসর মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী

হাম (Measles) সংকটের ছায়ায় শিশুস্বাস্থ্য: বাংলাদেশ আজ এমন এক জটিল জনস্বাস্থ্য বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ—হাম (measles)—পুনরায় শিশুদের জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। টিকার ঘাটতি, হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা, এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে, চিকিৎসক ও নার্সরা সীমিত সম্পদের মধ্যে জীবন বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সেই লড়াই শেষ পর্যন্ত সফল হচ্ছে না। এই বাস্তবতা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতাগুলোকে নির্মমভাবে উন্মোচিত করছে।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ: হাম বাতাসের মাধ্যমে সহজেই ছড়ায়। একটি আক্রান্ত শিশু কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে আশেপাশের বহু শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশু এবং যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগ দ্রুত জটিল আকার ধারণ করে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখের মারাত্মক সংক্রমণ এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ—এসব জটিলতা শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অথচ একটি কার্যকর টিকার মাধ্যমে এই রোগ সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব—এটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

বর্তমান সংকট বিশ্লেষণ: এটি কোনো একক কারণে সৃষ্ট নয়; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক ব্যর্থতার ফল।

প্রথমত, টিকার সরবরাহ ব্যবস্থায় অসামঞ্জস্য একটি প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। কোথাও টিকা পর্যাপ্ত নেই, কোথাও আবার বিতরণে বিলম্ব হচ্ছে। একটি কার্যকর লজিস্টিক ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থার অভাব এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। বাস্তবতা হলো—টিকা থাকলেও তা সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে পৌঁছাতে না পারলে তার কোনো কার্যকারিতা থাকে না।

দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা নেই, আইসোলেশন সুবিধা সীমিত, এবং অনেক ক্ষেত্রে অক্সিজেন সরবরাহও পর্যাপ্ত নয়। ফলে যখন হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়, তখন পুরো ব্যবস্থাই চাপের মুখে পড়ে। চিকিৎসকরা বাধ্য হচ্ছেন সীমিত সম্পদ দিয়ে একাধিক সংকটাপন্ন রোগী সামলাতে, যা চিকিৎসার মানকে প্রভাবিত করে।

তৃতীয়ত, মানবসম্পদের ওপর চাপ একটি গুরুতর সমস্যা। ফ্রন্টলাইন চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছেন, পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন না, এবং একই সঙ্গে নিজেরাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই পরিস্থিতি শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও তাদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

চতুর্থত, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে যে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছিল, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, ফলে একটি “ইমিউনিটি গ্যাপ” তৈরি হয়েছে, যা হাম ভাইরাসের বিস্তারের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

তাৎক্ষণিক এবং কার্যকর পদক্ষেপ: এই প্রেক্ষাপটে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তাৎক্ষণিক এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।

প্রথমত, জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহ এবং একটি শক্তিশালী বাফার স্টক গড়ে তোলা অপরিহার্য। এটি শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলার জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্যও একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে।

দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত “আউটব্রেক রেসপন্স ইমিউনাইজেশন” কার্যক্রম চালু করতে হবে। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে—এমনকি যারা আগে টিকা পেয়েছে তাদেরও পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে সংক্রমণের শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়া যায়।

তৃতীয়ত, হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। অস্থায়ী শিশু ওয়ার্ড স্থাপন, অতিরিক্ত শয্যা বৃদ্ধি, অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুদ বাড়ানো—এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে আইসোলেশন ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সংক্রমণ হাসপাতালের ভেতরে ছড়িয়ে না পড়ে।

চতুর্থত, ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জন্য মানসম্মত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE), এন৯৫ মাস্ক, গ্লাভস এবং ফেস শিল্ড সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, সকল স্বাস্থ্যকর্মীর টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইনফেকশন প্রিভেনশন ও কন্ট্রোল (IPC) প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

পঞ্চমত, কাজের সময় ও দায়িত্ব ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য আনা জরুরি। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করলে ক্লান্তি বাড়ে, যা ভুলের সম্ভাবনা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি উভয়ই বাড়ায়। তাই শিফট রোটেশন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।

ষষ্ঠত, তথ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। কোথায় কত টিকা আছে, কোথায় কত রোগী, কোথায় সংকট বেশি—এসব তথ্য রিয়েল-টাইমে বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সপ্তমত, জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে গুজব, ভুল ধারণা এবং অবহেলার কারণে অভিভাবকরা শিশুদের টিকা দিতে আগ্রহী হন না। তাই গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদে, বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর টিকা উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা একটি ঝুঁকি তৈরি করে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ জোরদার এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য।

সবশেষে, এই সংকট আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি আমাদের শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারছি? হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। তবুও যদি টিকার অভাবে একটি শিশুর মৃত্যু হয়, তবে সেটি কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি জাতীয় ব্যর্থতা।

এই মুহূর্তে প্রয়োজন দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, সমন্বিত পদক্ষেপ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন। কারণ প্রতিটি বিলম্ব মানে আরেকটি শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়া।

বাংলাদেশ অতীতে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে এবং সফল হয়েছে। এই সংকটও অতিক্রম করা সম্ভব—যদি আমরা এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নেই এবং তা বাস্তবায়নে দৃঢ় থাকি। কারণ প্রতিটি শিশুর জীবনই অমূল্য— এবং তা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

লেখক: নার্সিং শিক্ষাবিদ ও গবেষক।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular