নিউজ ডেস্ক : জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২ এপ্রিল নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্বিতীয় মাসে গড়িয়েছে এবং বিশ্ব “আরও বড় যুদ্ধের কিনারায়” দাঁড়িয়ে আছে। জাতিসংঘের ভাষায়, সংঘাত দীর্ঘ হলে এর মানবিক ক্ষতি ভয়াবহ হবে এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়বে। গুতেরেস তাই সব পক্ষকে দ্রুত শত্রুতা বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে ফিরতে আহ্বান জানান। তাঁর এই বক্তব্যে বেসামরিক অবকাঠামো, তেল-গ্যাস সরবরাহ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতি রক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
একই সময়ে রাশিয়াও মধ্যপ্রাচ্য সংকটে কূটনৈতিক ভূমিকা রাখার আগ্রহ দেখিয়েছে। রুশ প্রেস সেক্রেটারি দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরান-সংকট সমাধানে অবদান রাখতে প্রস্তুত, এবং প্রয়োজন হলে মস্কো “সামরিক পরিস্থিতিকে শান্তিপূর্ণ পথে” আনতে সহায়তা করবে। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুতিন ২ এপ্রিল মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তির সঙ্গে বৈঠক করেন, যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরান যুদ্ধ ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি। ফলে ওয়াশিংটন, তেলআবিব, তেহরান, কায়রো ও মস্কো—সব পক্ষই এখন সংকট নিরসনে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে রয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অস্থিরই রয়ে গেছে। এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন জানায়, ২৭ মার্চ সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ারবেসে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন E-3 Sentry AWACS বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই হামলায় ১০ জনের বেশি মার্কিন সার্ভিস সদস্য আহত হন, যাদের মধ্যে দুজন গুরুতরভাবে আঘাতপ্রাপ্ত। প্রকাশিত ছবিতে বিমানের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায় এবং বিশ্লেষকদের মতে, সেটি আর মেরামতযোগ্য নাও হতে পারে। এই AWACS ধরনের বিমান আকাশে নজরদারি, যুদ্ধক্ষেত্র ব্যবস্থাপনা ও লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ, তাই এ ক্ষতি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় বড় চাপ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেছে—এমন ধারণাকে সমর্থন করছে না সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়ন। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংসের বিষয়টিই নিশ্চিত করতে পারছে, আর ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ৩৩৫টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্র নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তবে জেরুজালেম পোস্টে প্রকাশিত, সিএনএন-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক লঞ্চার এবং বহু ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন এখনো কার্যকর রয়েছে। ভূমির নিচে লুকানো ভান্ডার, মোবাইল লঞ্চার ও ছড়িয়ে থাকা অবকাঠামোর কারণে ইরানের পাল্টা হামলা সক্ষমতা এখনো উল্লেখযোগ্য বলেই গোয়েন্দারা মনে করছেন।

এই সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব দেখা গেছে জ্বালানি বাজারে। ২ এপ্রিল তেলের দাম তীব্রভাবে বেড়ে ব্রেন্ট ১০৯.০৩ ডলার এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ১১১.৫৪ ডলারে ওঠে, কারণ ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছিলেন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধাক্কা দেবে। তাই গুতেরেসের যুদ্ধবিরতির আহ্বান, রাশিয়ার মধ্যস্থতার আগ্রহ, এবং সামরিক ঘাঁটি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে নতুন তথ্য—সব মিলিয়ে একটি বিষয়ই সামনে আসছে: মধ্যপ্রাচ্যে এখন কেবল যুদ্ধ নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যেরও পরীক্ষা চলছে।
ঢাকানিউজ২৪/মহফ




