ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeজাতীয়কামরাঙ্গীরচরে গ্যাস চুরির মহোৎসব, চরম ভোগান্তিতে এলাকাবাসী

কামরাঙ্গীরচরে গ্যাস চুরির মহোৎসব, চরম ভোগান্তিতে এলাকাবাসী

মো. জহিরুল সানী : রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে তিতাস গ্যাসের পাইপ লাইন থেকে গ্যাস লুট করে নিচ্ছে শতাধিক খানাডুলি (স্টিলের মির্ছিব) বানানোর কারখানা। রাত হলেই কারখানাগুলো রাইজার মেশিনের মাধ্যমে গ্যাস টেনে নিয়ে যাওয়ার ফলে বৈধ গ্ৰাহকরা চরম সংকটে ভুগছে। তিতাস গ্যাসের স্থানীয় কতিপয় কর্মকর্তা ও একটি চক্র মোটা অংকের মাসোহারার বিনিময়ে কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্যাস লুটে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

সূত্র বলছে, কামরাঙ্গীরচরের বড়গ্রাম, জাউলাহাটি, নবীনগর, আলীনগর, তারা মিয়ার গলি, নয়াগাও, হাজির ঘাট, বাগানবাড়ি গলি, থেকে শুরু করে বিশেষ করে কামরাঙ্গীরচর ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের ঝাউচর বাজার রোডে প্রায় প্রতিটি অলিগলিতেই খানাডুলি বানানোর কারখানা রয়েছে। দিনের বেলায় এসব কারখানা বন্ধ থাকলে গভীর রাত হলেই কারখানাগুলো পুরোদমে উৎপাদন শুরু করে ভোর পর্যন্ত অবৈধ গ্যাস সংযোগে রাইজার মেশিন প্রবল বেগে গ্যাস টেনে চেম্বারে জ্বলানো আগুনে চলতে থাকে খানাডুলির বিভিন্ন অংশ হিট দিয়ে প্রক্রিয়াজাত ও রং করার কাজ।

স্থানীয়দের বলছেন, একসময় এই কারখানা সংখ্যা তিন শতাধিক ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে কিছু কারখানা কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়া হলেও, এখনো বড় একটি অংশ কামরাঙ্গীরচরেই রয়ে গেছে। এর মধ্যে ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড যেন এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু। কারখানাগুলোর ভেতরের চিত্রও ভিন্ন ভিন্ন। কোথাও ২ থেকে ৩টি চেম্বার, আবার কোথাও ৪ থেকে ৮টি পর্যন্ত। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রতিটি কারখানাই নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি কারখানায় মাসে অন্তত ৫-২০ লাখ টাকার খানাডুলি উৎপাদন করা হচ্ছে। 

তাদের অভিযোগ, প্রায় এক দশক ধরে কামরাঙ্গীরচরের বৈধ গ্ৰাহকরা গ্যাস পাচ্ছে না। এলাকাটিতে দিনে গ্যাসের দেখা মেলে না বললেই চলে, আর রাতে সামান্য সরবরাহ এলেই তা চলে যায় এসব অবৈধ কারখানার দখলে। ফলে সাধারণ মানুষ রান্নাসহ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। এসব কারখানার বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযান হলে কিছুদিনের জন্য বন্ধ থেকে পুণরায় চালু হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, তিতাস গ্যাস কোম্পানির কতিপয় কর্মকর্তা মোটা অংকের মাসোহারার বিনিময়ে বছর পর বছর এসব অবৈধ কারখানা চলছে।

এলাকাবাসীর আশঙ্কা, ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় এভাবে অবৈধ শিল্পকারখানার বিস্তার শুধু গ্যাস সংকটই নয়, বরং বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড, শব্দদূষণ এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাতভর চলা গ্যাসচালিত হিট প্রক্রিয়া যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সরেজমিনে জানা গেছে, জাউলা হাটির রক্সির গলিতে পলাশ,তারেক সর্দার, তারা মিয়ার গলিতে রফিক ও রাসেল, জাউলাহাটির টুপি সালাম, আমিনুল, হাজির ঘাট এলাকায় নয়ন, নয়াগাঁওয়ে আমির আলী, ইমরান, আব্দুস সালাম, রহমান, জসিম অন্তত ৫০টি কারখানা পরিচালনা করেন।

তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মালিকরা আড়ালে থেকে কর্মচারী দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। এসব কারখানায় কিশোর ও নাবালক শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা যায়। উত্তপ্ত চেম্বার, তারা যৎসামান্য পারিশ্রমিকে ধোঁয়া আর গ্যাসে ভরা পরিবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি, নিরাপত্তাহীনতা—সবকিছুই যেন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা একাধিক শ্রমিক।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্যাস লুটের বিষয়ে একাধিক কারখানার মালিকের বক্তব্য জানতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে ফোন দেয়া হলে তারা কোন মন্তব্য না করে মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। 

কামরাঙ্গীরচরের খানাডুলি ব্যবসায়ী সালাম জানান, বর্তমানে ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ এবং সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, নিজেদের ব্র্যান্ডের পাশাপাশি ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী অন্য প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডেও পণ্য তৈরি করা হয় এবং প্রয়োজনে ভিন্ন হিসাবও প্রস্তুত করে দেওয়া সম্ভব। অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিষয়ে তিনি স্বীকার করেন, লাইনে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় তারা মাঝে মধ্যে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গ্যাস ব্যবহার করেন এবং সরকারি অভিযানের সময় এসব সংযোগ গোপন রাখা হয়; লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিলে পরে আবার সংযোগ দেওয়া হয়। তবে তিনি বলেন, সরকার যদি বৈধভাবে গ্যাস সংযোগ প্রদান করে তাহলে সেটিই তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে এবং এভাবে কার্যক্রম চালানোর প্রয়োজন থাকবে না। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, অনেক ক্ষেত্রেই কিছু খরচ জড়িত থাকে এবং অন্যরা যেহেতু চালায়, তাই তারাও চালাতে বাধ্য হন; তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে অনীহা প্রকাশ করেন তিনি।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ইমার্জেন্সি ধানমন্ডি-২ জোনের টিম লিডার নাজমুল হাসান জানান, অবৈধ গ্যাস সংযোগের অভিযোগ ও তথ্যের ভিত্তিতে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হলেও অসাধু চক্র সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরও পুনরায় অবৈধভাবে লাইন স্থাপন করছে; এতে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতার সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সংস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, ফলে সব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না এবং অনেক সময় ম্যাজিস্ট্রেট টিম পৌঁছানোর আগেই সংশ্লিষ্টরা অবৈধ সংযোগ সরিয়ে ফেলে, যার কারণে কার্যকর ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয় ও সঠিক তথ্যের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি অনেক সময় নিরুপায় অবস্থায় থাকে। তিনি আরও জানান, সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ফুটেজ পেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে গোড়া থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। বিশেষ করে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরও মাটির নিচ দিয়ে বিকল্প পথে পুনরায় লাইন স্থাপনের ঘটনা ঘটছে এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও কিছু অসাধু উৎস থাকার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন তিনি।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular