মোঃ গোলাম মোস্তফা, (গবেষক, আইন, মানবাধিকার , HSIF এবং জননীতি বিশ্লেষক): বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হাম (Measles) সংক্রমণ, শিশু অপুষ্টি এবং প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। UNICEF, WHO এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে টিকাদান কভারেজের ঘাটতি, MR (Measles-Rubella) টিকার সংকট, অপুষ্টি, ভিটামিন-এ ঘাটতি, হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ দিয়েছে।
এই গবেষণা নিবন্ধে বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতি, শিশুমৃত্যুর প্রকৃতি, হাসপাতাল ব্যবস্থার বাস্তব অবস্থা, টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যু রোধে জরুরি নীতিগত ও মানবিক করণীয় তুলে ধরা হয়েছে।
১. বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় টিকাদান কর্মসূচি ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। Expanded Programme on Immunization (EPI)–এর মাধ্যমে বহু সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হাম (Measles) সংক্রমণ, শিশু অপুষ্টি এবং প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি সেই অর্জনকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
WHO এবং UNICEF–এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে গত এক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় হাম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু এবং তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ অপুষ্ট, অপর্যাপ্ত টিকাপ্রাপ্ত অথবা সম্পূর্ণ টিকাবঞ্চিত।
এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; বরং এটি শিশু অধিকার, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা এবং নীতিগত জবাবদিহিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
২. বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র
WHO–এর Disease Outbreak News অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে বাংলাদেশে ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং কয়েক হাজার সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে বহু শিশুমৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
পরবর্তীতে WHO Bangladesh–এর আপডেটে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায় এবং হাসপাতালগুলোতে জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক দশ হাজারে পৌঁছায় এবং শত শত শিশুর মৃত্যু ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মৃত্যুর বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য ছিল।
৩. টিকাদান ব্যবস্থার সংকট
৩.১ MR টিকার ঘাটতি
WHO এবং UNICEF–এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে Measles-Rubella (MR) টিকার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। অনেক এলাকায় শিশুদের নির্ধারিত সময়ে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ফলে দেশে “immunity gap” তৈরি হয় এবং বিপুল সংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।
৩.২ Zero-dose Children
UNICEF–এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বহু শিশু এখনও পূর্ণ টিকাদান থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে:
* নগর বস্তি,
* চরাঞ্চল,
* দুর্গম গ্রামীণ এলাকা,
* এবং দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদের অনেকেই কোনো টিকাই পায়নি।
৩.৩ EPI ব্যবস্থার দুর্বলতা
বিশেষজ্ঞদের মতে:
* নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন,
* পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব,
* টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা,
* এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা
বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।
COVID-19–পরবর্তী সময়ে জাতীয় MR ক্যাম্পেইন দীর্ঘ সময় বন্ধ বা সীমিত থাকাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
৪. হাসপাতালের বাস্তব অবস্থা
বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতাল বর্তমানে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। UNICEF–এর পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে:
* শিশু ওয়ার্ডগুলো overcrowded,
* ICU সংকট রয়েছে,
* অক্সিজেন ও isolation facility সীমিত,
* এবং শিশু বিশেষজ্ঞের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।




