ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅর্থনীতিআগস্টের শেষে রুপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যোগ হবে

আগস্টের শেষে রুপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যোগ হবে

ঢাকা নিউজ রিপোর্ট: পারমাণবিক প্রযুক্তিতে আমাদের এই বিনিয়োগ আসলে জাতীয় উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং মানুষের কল্যাণের পেছনেই বিনিয়োগ। তিনি বলেন, একই সাথে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পারমাণবিক শক্তি এক অনন্য দায়িত্বও বয়ে নিয়ে আসে।একটি সফল পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য কেবল প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ মানবসম্পদ, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সর্বোপরি নিরাপত্তা ও সুরক্ষার একটি সুদৃঢ় সংস্কৃতি বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ।

১২ জুন শুক্রবার পাবনার ঈশ্বরদীতে স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্টের সভাকক্ষে “High-Level Strategic Roundtable Discussion Nuclear Energy: Strategy, Realities and Bangladesh’s Path Forward”শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথি”র বক্তৃতায় এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, এখানে আমরা আলোচনা করছি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং জাতীয় অগ্রগতি নিয়ে। তিনি বলেন, গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি (ফুয়েল) লোড করার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত সাফল্যই ছিল না, বরং এটি ছিল একটি যুগান্তকারী জাতীয় মুহূর্ত। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের সেইসব উন্নত ও পরিশীলিত প্রযুক্তি সমৃদ্ধ দেশগুলোর কাতারে শামিল হলো, যারা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তি সফলভাবে ব্যবহার করছে। ​এই অর্জন আমাদের নীতি-নির্ধারক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কয়েক দশকের দূরদর্শিতা, পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং নিষ্ঠারই প্রতিফলন।

গত পাঁচ দশকে আমাদের দেশ এক বিশাল চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি থেকে রূপান্তরিত হয়ে বিশ্বের অন্যতম গতিশীল ও স্থিতিস্থাপক অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে আমরা অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছি।

​আমাদের অর্থনীতি যত বিকশিত হচ্ছে, তার সাথে সাথে জ্বালানির চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে। ​আমাদের শিল্পকারখানা সচল রাখতে, ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে, নাগরিক সেবার মান বাড়াতে এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি অপরিহার্য। আমাদের দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যও এটি অত্যন্ত জরুরি।

​এই প্রেক্ষাপটে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।​আমাদের ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষ্যে পারমাণবিক শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। এটি আমাদের জাতীয় গৌরবের বিষয়। এটি আমাদের আত্মবিশ্বাস, আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে গ্রহণ করার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করে।

​​পারমাণবিক শক্তি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা বড় পরিসরে নির্ভরযোগ্য ও কম-কার্বনযুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে। অন্যান্য অনেক জ্বালানি উৎসের মতো এটি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করে, শিল্পখাতের বিকাশ ঘটায় এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বে অবদান রাখে।​পুরোদমে চালু হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আমাদের জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করবে। এটি আমাদের জ্বালানির মিশ্রণে (energy mix) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এবং আমাদের অর্থনীতির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। ​তবে, পারমাণবিক প্রযুক্তির মূল্য কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ​ক্যান্সার রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায়, উন্নত জাতের ফসল উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষিতে, উন্নত প্রয়োগের মাধ্যমে শিল্পখাতে, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পারমাণবিক বিজ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

একটি সফল পারমাণবিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো জনগণের আস্থা।পারমাণবিক শক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় এবং এর ঝুঁকিগুলো কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়—তা জনগণকে বুঝতে হবে। আর এই আস্থা তৈরি করতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সম্পৃক্ততা, উন্মুক্ত যোগাযোগ এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব।​ঠিক এই কারণেই আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

মন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে পারমাণবিক বিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং এই সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর ওপর আরও বেশি জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।এই বিষয়ে আমি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।বাংলাদেশের পারমাণবিক যাত্রায় আইএইএ (IAEA) সবসময় একটি বিশ্বস্ত অংশীদার। তাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা, বিশেষজ্ঞ নির্দেশনা, সক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতি দায়বদ্ধতা আমাদের জাতীয় প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে অমূল্য ভূমিকা পালন করেছে।

ফকির মাহবুব আনাম বলেন, পারমাণবিক শক্তি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়, এটি বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করার বিষয়। এটি আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়,  মানুষের পেছনে বিনিয়োগ করার বিষয়, আগামী প্রজন্মের জন্য সুযোগ সৃষ্টির বিষয়। এটি নিশ্চিত করা যে বাংলাদেশ যেন একটি সমৃদ্ধ, উদ্ভাবনী, স্থিতিস্থাপক এবং জ্ঞানভিত্তিক জাতি হিসেবে তার যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে।

​তিনি বলেন, এ গোলটেবিল আলোচনা বাংলাদেশের পারমাণবিক গভর্ন্যান্স (শাসন ব্যবস্থা) এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করবে। এটি নীতি-নির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিজ্ঞানী, শিল্প উদ্যোক্তা, গণমাধ্যমকর্মী এবং উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য নিজেদের আইডিয়া বিনিময়, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি এবং আগামী দিনের পথনকশা তৈরির একটি মূল্যবান সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

আজকের এ গোলটেবিল বৈঠক থেকে আসা সুপারিশগুলো বাংলাদেশের পারমাণবিক যাত্রার পরবর্তী ধাপকে পথ দেখাবে এবং জাতীয় উন্নয়নে পারমাণবিক প্রযুক্তির নিরাপদ, সুরক্ষিত ও শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে অবদান রাখবে।আগামী আগস্টের শেষের দিকে রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যোগ হবে এবং আগামী ২০২৭ সালের এপ্রিল মাসে ২য় ইউনিটের নিউক্লিয়ার ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হবে বলে মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন,  আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা রয়েছে জাতীয় গ্রীডে এখান থেকে দ্রুত  বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।

এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখানে হওয়ায় এই এলাকার লোক ভাগ্যবান। এটি বড় শহর হবে, সবচেয়ে বেশী লাভবান হবে ঈশ্বরদীবাসী। ইন্টারনইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এজেন্সি (IAEA)-এর সহযোগিতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (MoST) এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (BAEC) এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে সভাপতির বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু তালেব মন্ডল, পাবনা-২( সুজানগর-বেড়া) আসনের সংসদ সদস্য এএডভোকেট সেলিম রেজা হাবিব, পাবনা জেলা বিএনপির আহবায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব, আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর শওকত আজিজ রাসেল প্রমুখ।

সেমিনারে পারমাণবিক বিদ্যুৎ বিষয়ক পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড.এম মঈনুল ইসলাম এবং ব্রিগেডিয়ার রোবায়েত, প্রধান সমন্বয়ক (এনএসপিসি)। সেমিনারে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি ( IAEA)  এর প্রতিনিধি Mehmet Ceyhan, টেকনিক্যাল লিড, নিউক্লিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট সেকশন বক্তব্য রাখেন।

সেমিনারে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড.মোঃ কবির হোসেন,  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক/একাডেমিয়া,  শিল্পখাতের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ,ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ঢাকা নিউজ/শহীদ 

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular