সমর ঘোষ
বেলুচিস্তান পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি বিশাল, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অথচ রাজনৈতিকভাবে অশান্ত ও অবহেলিত প্রদেশ, যা দেশটির মোট আয়তনের প্রায় ৪৪ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত। এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে রূপক অর্থে তাদের জীবনের গভীর দুঃখ ও কান্নার সাগর বলা চলে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব
- বৃহৎ আয়তন: পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ, যার রাজধানী কুয়েতা।
- গোয়াদর বন্দর: আরব সাগরের তীরে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, যা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (CPEC) মূল কেন্দ্র।
- প্রাকৃতিক সম্পদ: গ্যাস, কয়লা, সোনা ও তামার বিশাল মজুদ রয়েছে এখানে।
সংকট ও বঞ্চনার কার
- সম্পদের বৈষম্য: প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া ও দরিদ্র অঞ্চল।
- অধিকার হরণ: স্থানীয় জনগণ মনে করে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের সম্পদ ব্যবহার করলেও তাদের ন্যায্য অধিকার ও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করছে।
- সংঘাত ও বিদ্রোহ: ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নানা দল ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী (যেমন- বিএলএ) স্বাধীনতার বা অধিকারের দাবিতে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

- বেলুচিস্তানের অন্তর্ভুক্তি:নভেম্বর ১৯৪৭ সাল থেকে মার্চ ১৯৪৮ সালের মধ্যে সামরিক চাপ প্রয়োগ করে তৎকালীন কালাত রাজ্যের স্বাধীন শাসককে চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করার মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার বেলুচিস্তানকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।
- জোরপূর্বক দখলদারি: বেলুচ জনগণের একাংশ শুরু থেকেই একে “জোরপূর্বক দখলদারি” বলে মনে করে, যার ফলে ১৯৪৭ সালের পর থেকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ওই অঞ্চলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলে আসছে।
- ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভাজনের সময় বর্তমান বেলুচিস্তানের প্রধান অংশ ‘কালাত রাজ্য’ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
- পাকিস্তানি সামরিক চাপ: পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথমে কালাতের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিলেও পরবর্তীতে ভূ-রাজনৈতিক কারণে চাপ সৃষ্টি করেন। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কালাত অবরোধ করে এবং এর শাসক বা ‘খান’-কে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগদানের চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে।
- অর্থনৈতিক বঞ্চনা: বেলুচিস্তান প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ হলেও এটি পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র ও অনুন্নত প্রদেশ। এখানকার সম্পদের লভ্যাংশ স্থানীয়দের না দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ভোগ করে বলে মূল ক্ষোভ বেলুচদের মনকে ক্ষতবিক্ষত করে।
- মানবাধিকার লঙ্ঘন: বেলুচদের জোরপূর্বক গুম করা এবং সেখানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত কর্তৃত্ব স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
-
- চীনা প্রভাব ও সিপেক (CPEC): চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু বেলুচিস্তানের গোয়াদর বন্দর। স্থানীয় বেলুচদের অভিযোগ, এই মেগা প্রকল্প থেকে তাদের কোনো কর্মসংস্থান বা অর্থনৈতিক লাভ হচ্ছে না। উল্টো বহিরাগতদের পুনর্বাসন এবং চীনা আধিপত্যের কারণে তারা নিজেদের ভূমিতেই সংখ্যালঘু হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনা প্রকৌশলী এবং কনভয়ের ওপর বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রাণঘাতী হামলা তীব্রতর হয়েছে।
৩. সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন
-
- বিচ্ছিন্নতাবাদী দলসমূহ: বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবিতে বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলো বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (BLA), বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্ট (BLF) এবং বেলুচ রিপাবলিকান আর্মি (BRA)।

- গেরিলা যুদ্ধকৌশল: এই গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো (যেমন গ্যাস পাইপলাইন, রেললাইন) এবং চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করে অতর্কিত হামলা, আইইডি (IED) বিস্ফোরণ এবং আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে থাকে।
৪. বর্তমান পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনীতি
- মানবাধিকার ও গুমের ঘটনা: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বেলুচিস্তানে “এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স” বা জোরপূর্বক গুমের ঘটনা নিত্যদিনের বিষয়। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার বেলুচ রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীকে অপহরণ এবং বিনা বিচারে আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এর প্রতিবাদে বেলুচ নারীদের নেতৃত্বে (যেমন মাহরাং বেলুচ) রাজধানী ইসলামাবাদ পর্যন্ত দীর্ঘ পদযাত্রা ও শান্তিপূর্ণ গণ-আন্দোলন গড়ে উঠেছে।
- ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব: বেলুচিস্তানের সীমান্ত ইরান ও আফগানিস্তানের সাথে যুক্ত। পাকিস্তান প্রায়ই অভিযোগ করে যে, বেলুচ বিদ্রোহীরা আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করছে এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা RAW তাদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে। অন্যদিকে, ইরান ও পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী বেলুচ অঞ্চলেও দুই দেশের মধ্যে প্রায়ই সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়।
সংক্ষেপে, ১৯৪৮ সালের বিতর্কিত অন্তর্ভুক্তির পর থেকে বেলুচিস্তান সমস্যাটি কেবল একটি আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন অর্থনৈতিক বঞ্চনা, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর (চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের এক জটিল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।




