ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামহাসপাতাল পরিদর্শনের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বাস্থ্যখাতে শুদ্ধি অভিযান

হাসপাতাল পরিদর্শনের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বাস্থ্যখাতে শুদ্ধি অভিযান

✍️ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি; অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট, সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন, রোগীর ভোগান্তি এবং জবাবদিহিতার অভাব।

বছরের পর বছর ধরে এসব সমস্যা জমে আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী, বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার সাখাওয়াত হোসেন এমপি, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করে বাস্তব পরিস্থিতি নিজ চোখে দেখার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সাহসী পদক্ষেপ।

তিনি কেবল দাপ্তরিক প্রতিবেদন কিংবা ফাইলের ওপর নির্ভর করেননি; বরং হাসপাতালের ওয়ার্ডে গিয়ে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং সেবার বাস্তব চিত্র সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা নিয়েছেন।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী প্রফেসর ডা. এম এ মুহিতের সাথে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজীর সৌজন্য সাক্ষাৎ

এতে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—রাষ্ট্র এখন মাঠের বাস্তবতা জানতে আগ্রহী। কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে এখানেই শুরু হয় মূল প্রশ্ন।

যেসব হাসপাতালে অনিয়ম ধরা পড়েছে, সেখানে কতজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? কতটি হাসপাতালের সমস্যার সমাধান হয়েছে? কতজন রোগী এখন আগের তুলনায় উন্নত সেবা পাচ্ছেন? জনগণ শুধু পরিদর্শনের সংবাদ নয়, সেই পরিদর্শনের ফলাফলও জানতে চায়।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সংকট কেবল অর্থের অভাবে সৃষ্টি হয়নি। বরং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, নিয়মিত তদারকির অভাব, প্রশাসনিক শৈথিল্য, দুর্নীতি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতাই আজকের সংকটকে গভীর করেছে।

প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে ভুল চিকিৎসা, অস্ত্রোপচারের জটিলতা, প্রসূতির মৃত্যু, নবজাতকের মৃত্যু, জরুরি চিকিৎসা না পাওয়া কিংবা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ। প্রতিটি ঘটনাই জনগণের আস্থাকে আরও দুর্বল করে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যখাত কোনো একক পেশার ওপর নির্ভর করে না। চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী—সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তাই নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে সকল পেশাজীবীর যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

স্বাস্থ্যখাতে সংস্কারের জন্য এখন কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি—
       -হাসপাতালভিত্তিক নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শন অব্যাহত রাখা।
       -অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
       -রোগীদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির স্বাধীন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
       -চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
       -ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সরকারি সম্পদের ব্যবহারে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
       -হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল মনিটরিং ও কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন চালু করা।

বাংলাদেশের মানুষ এখন আর আশ্বাস শুনতে চায় না; তারা পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা এমন হাসপাতাল চায়, যেখানে রোগীকে দালালের কাছে যেতে হবে না, চিকিৎসক সময়মতো উপস্থিত থাকবেন, নার্সরা পর্যাপ্ত সংখ্যায় সেবা দেবেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা সহজলভ্য হবে এবং প্রতিটি রোগী সম্মান ও মানবিক আচরণ পাবেন।
মাননীয় মন্ত্রীর সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের তৎপরতা জনগণের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু সেই আশাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে স্বাস্থ্যখাতে একটি সর্বাত্মক শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। শুধু পরিদর্শন নয়, পরিদর্শনের পর কঠোর জবাবদিহি, কার্যকর সংস্কার এবং ধারাবাহিক নজরদারিই পারে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে।

স্বাস্থ্যসেবা কোনো দয়া নয়—এটি সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আজকের এই উদ্যোগ যদি ধারাবাহিকতা পায়, যদি অনিয়মের বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থে শূন্য সহনশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

জাতি আজ সেই পরিবর্তনের অপেক্ষায়। প্রার্থনা একটাই—মানুষ যেন হাসপাতালের দরজায় এসে আর হতাশ না হয়; বরং সুস্থ হয়ে নতুন জীবনের আশা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারে।

লেখক- নার্সিং শিক্ষাবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular