হাসপাতাল, রোগীর জীবন, সরকারি ওষুধ ও নার্সিং শিক্ষার্থীরা, ওয়ার্ডবয়দের সিন্ডিকেটের বাধায় হাতে কলমে কাজ শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত! সব জেনে শুনেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নীরব!
ইন্ডেন্টের ওষুধ, রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কেনা, প্রতিবাদ করলেই মারধোর, নীরব প্রশাসন, বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলো এটি একটি সাধারণ চিত্র।
এসব হাসপাতাল দেশের দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল। একজন অসুস্থ মানুষ যখন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন তার প্রত্যাশা থাকে—রাষ্ট্র তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেবে, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ করবে এবং দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সের মাধ্যমে নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবে।
কিন্তু দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল সম্পর্কে যে অভিযোগগুলো ক্রমাগত সামনে আসছে, তা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেতরে একটি গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট তৈরি হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম, ইন্ডেন্ট আছে, বরাদ্দ আছে, তবু রোগী ওষুধ পায় না। অভিযোগ রয়েছে, ইন্ডেন্ট অনুযায়ী শতভাগ ওষুধ ও সামগ্রী সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড ইনচার্জদের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয় না। সরবরাহের আগেই একটি অংশ ‘কেটে রাখা’ হয় এবং পরবর্তীতে আরেকটি অংশ কোথায় যায়, তারও স্বচ্ছ হিসাব থাকে না—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে।
ফলে শেষ পর্যন্ত ওয়ার্ড ইনচার্জের হাতে যে পরিমাণ ওষুধ ও সামগ্রী পৌঁছায়, তা ভর্তি রোগীদের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
রোগীর diagnosis, prescription, dose, route, timing, contraindication, allergy এবং drug interaction বিবেচনা না করে কোনো ব্যক্তি যদি ওষুধের ব্যাপারে নির্দেশ দেন, তাহলে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
রোগীর চিকিৎসা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ্য যে,নার্সিং শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডবয়রা শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে দূরে সরিয়ে রাখে। এতদপ্রেক্ষিতে নার্সিং শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে কাজ শেখার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে দেশে দক্ষ নার্স তৈরি অত্যন্ত দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাসপাতাল হচ্ছে নার্সিং শিক্ষার প্রধান Clinical Learning Environment। শিক্ষার্থীরা সেখানে রোগীর assessment, medication administration, infection prevention, documentation, wound care, emergency care এবং অন্যান্য ক্লিনিক্যাল দক্ষতা শেখে।
যদি একজন নার্সিং শিক্ষার্থীকে বলা হয়—
“এ কাজ তুমি করতে পারবে না।”
“এখানে দাঁড়াবে না।”
“রোগীর কাছে যাবে না।”
আর এসব নির্দেশ আসে এমন কর্মচারীর কাছ থেকে যার সেই পেশাগত কর্তৃত্ব নেই, তাহলে শিক্ষার্থীর clinical learning মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
যে শিক্ষার্থী আজ হাসপাতালে শেখার সুযোগ পাচ্ছে না, আগামীকাল সে দক্ষ নার্স হবে না। একটি দেশের নার্সিং শিক্ষা শুধু classroom-এর মধ্যে হয় না। Clinical practice ছাড়া competent nurse তৈরি সম্ভব নয়।
পোস্টেড নার্সরাও আজ অসহায়, নার্সকে এমন পরিবেশে কাজ করতে হয় যেখানে অ-পেশাগত কর্মচারীরা তার ওপর প্রভাব বিস্তার করেন, রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাজে হস্তক্ষেপ করেন কিংবা তার পেশাগত সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, তৈরি করেন এক অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ।
প্রতিবাদ করলে হুমকি, হয়রানি, মিথ্যা অভিযোগ, অপমান কিংবা মারধরের শিকার হতে হয়। তখন সেটি আর সাধারণ কর্মক্ষেত্রের সমস্যা থাকে না। এটি হয়ে দাঁড়ায় Institutional Intimidation। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালকে ঘিরে নার্সিং শিক্ষার্থী ও কর্মরত নার্সদের সঙ্গে অ-পেশাগত কর্মীদের বিরোধ, হেনস্তা, হামলা কিংবা কর্তৃত্ব বিস্তারের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
এসব Systemic Governance Problem ও অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা পৃথকভাবে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, অভিযোগকারীরা নীরব থাকেননি। নার্সিং শিক্ষার্থী ও কর্মরত নার্সরা বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদ মিছিল করেছেন, মানববন্ধন করেছেন, সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং স্মারকলিপি দিয়েছেন।
কোনো কর্মীর শ্রমের মূল্যায়ন করা এবং তাকে তার পেশাগত সীমার বাইরে ক্ষমতা দেওয়া এক বিষয় নয়।
ওয়ার্ডবয় ও অন্যান্য সহায়ক কর্মীরা হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ কর্মী—কিন্তু তারা চিকিৎসক বা নার্স নন।
তাদের কাজের নির্দিষ্ট Scope of Practice থাকতে হবে। কোনো কর্মচারীই হাসপাতালের ওষুধের ব্যক্তিগত custodian হতে পারেন না, রোগীর চিকিৎসা নির্দেশ দেওয়ার অধিকার রাখেন না এবং পেশাদার নার্সকে ভয় দেখানোর অধিকার রাখেন না।
এখন দরকার কথার চেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা।
প্রথমত, প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে End-to-End Medicine Tracking System চালু করতে হবে—ইন্ডেন্ট থেকে রোগীর হাতে ওষুধ পৌঁছানো পর্যন্ত।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর জন্য Digital Stock Management এবং batch-wise accountability নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, ওয়ার্ড ইনচার্জের কাছে ইন্ডেন্ট অনুযায়ী কী পরিমাণ ওষুধ দেওয়া হয়েছে, তার স্বচ্ছ রেকর্ড থাকতে হবে।
চতুর্থত, হাসপাতালের ওষুধ নির্ধারিত স্টোর ও অনুমোদিত ব্যবস্থাপনার বাইরে কোনো ব্যক্তি বা কক্ষে রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
পঞ্চমত, হাসপাতালের ওষুধ বাইরে পাচার বা বিক্রির অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীন তদন্ত করতে হবে।
ষষ্ঠত, রোগীর চিকিৎসা, prescription ও medication management-এ অ-পেশাগত কর্মীদের অনধিকার হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
সপ্তমত, নার্সিং শিক্ষার্থীদের clinical learning-এর জন্য নিরাপদ ও পেশাগত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
অষ্টমত, নার্সদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
নবমত, কোনো অভিযোগকারী নার্স বা শিক্ষার্থীকে প্রতিহিংসামূলক হয়রানি থেকে রক্ষা করতে Whistleblower Protection Mechanism চালু করা উচিত।
দশমত, অভিযোগের তদন্তে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ প্রভাবমুক্ত স্বাধীন তদন্ত কমিটি থাকতে হবে।
এখনই ব্যবস্থা না নিলে আজকের অনিয়ম আগামী দিনের স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হতে পারে।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার এই সংকটের পেছনে যে গভীর সমস্যা রয়েছে, তা আমাদের সকলের জন্য চিন্তার বিষয়। রোগীর জীবন, সরকারি ওষুধ এবং নার্সিং শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় আমাদের সবার দায়িত্ব রয়েছে।
প্রথমত, হাসপাতালের প্রশাসনকে অবশ্যই এই পরিস্থিতির দিকে নজর দিতে হবে। রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে হলে, ওয়ার্ডবয়দের কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তাদের আচরণ এবং দায়িত্ব পালনের মান উন্নত করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি ওষুধের সঠিক বিতরণ নিশ্চিত করতে একটি স্বচ্ছ এবং কার্যকরী সিস্টেম চালু করা জরুরি। ইন্ডেন্ট থেকে শুরু করে রোগীর হাতে ওষুধ পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, নার্সিং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ এবং পেশাগত পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের হাতে কলমে কাজ শেখার সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে দক্ষ নার্স হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
এছাড়া, অভিযোগের তদন্তে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত।
সবশেষে, আমাদের সকলের উচিত এই সংকটের সমাধানে সোচ্চার হওয়া। হাসপাতাল জনগণের, সরকারি ওষুধ জনগণের, এবং রোগীর চিকিৎসার অধিকার জনগণের। এই অধিকার রক্ষায় আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়ের দৌরাত্ম নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। হাসপাতালের পরিবেশে রোগীদের সেবা প্রদান করা ওয়ার্ড বয়ের প্রধান দায়িত্ব হলেও, কিছু ক্ষেত্রে তাদের আচরণ এবং কার্যকলাপ রোগীদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
প্রথমত, অনেক রোগী অভিযোগ করেন যে, ওয়ার্ড বয়রা কখনো কখনো অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। রোগীদের প্রতি তাদের মনোভাব এবং সেবা প্রদানের মানের ক্ষেত্রে কিছু উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে ওয়ার্ড বয়দের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, তারা এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন না, যা রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তৃতীয়ত, রোগীদের প্রয়োজনীয়তা এবং তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ওয়ার্ড বয়দের আরও সচেতন হতে হবে। রোগীদের সঠিক তথ্য প্রদান এবং তাদের উদ্বেগের প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত।
এই সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ওয়ার্ড বয়দের আচরণ এবং সেবার মান উন্নত করা সম্ভব।
রোগীদের সেবা প্রদান করা একটি মহান দায়িত্ব, এবং এই দায়িত্ব পালনে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।