শহীদুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিবেদক: কলেজটি ১৯৬৯ সালে গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে ওঠা ভালুকার একমাত্র এমপিওভুক্ত মহিলা কলেজ। ১৯৬৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল। সাতান্ন বছর ধরে সুনামের সাথে চলছে প্রতিষ্ঠানটি।

১৯৪৭ সাল থেকে শুরু হয়েছিল পথচলা। সে সময় গফরগাঁও কিংবা ভালুকা উপজেলা থেকে বিরুনীয়া আসার কোন সহজ পথ ছিলনা। সেই দুর্গম অঞ্চলের সন্তানদের শিক্ষার আলোকবার্তা নিয়ে আসেন ওই এলাকার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের গৃহবধু জমিলা আক্তার খাতুন। তার পাশে এগিয়ে আসেন তাঁর স্বামী হাসমত আলী সরকার। কালের বিবর্তনে আজ তাঁরা নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁদের আদর্শ ও সৃষ্টিকর্ম।
তাঁরা বাড়ি বাড়ি যেয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন নারীপুরুষকে বুঝিয়ে তাদের সন্তানদের শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছে। ১৯৪৭ সালে একটি প্রাইমারি স্কুল ও হাইস্কুল গড়ে তুলেছেন। ১৯৬৯ সাল থেকে কলেজটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত সুনামের সাথে পরিচালিত হয়ে আসছে।
ঢাকা নিউজ২৪.কম-এর পক্ষ থেকে শহীদুল ইসলাম বিরুনিয়া সদর আলী সরকার মেমোরিয়াল মহিলা কলেজ সরেজমিনে পরিদর্শন করে কলেজের অধ্যক্ষ হোসনে আরা আকন্দের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। নিচে তা তুলে ধরা হল:
ঢাকা নিউজ২৪.কম: আমাদের পাঠকদের জন্য আপনি আপনার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কিছু বলুন।
অধ্যক্ষ: মাত্র ৮/ ১০ জন ছাত্রী নিয়ে কলেজটি যাত্রা শুরু করে। তারপর ধীরে ধীরে শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি মিলে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০০ ছাত্রী ভর্তি হয়েছে। এ পর্যন্ত কয়েক হাজার ছাত্রী শিক্ষালাভ করে আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এখান থেকে শিক্ষা অর্জন করে অনেকেই বিভিন্ন স্কুল, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও শিক্ষকতার কাজে এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন।
তারা নিজেদের সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য এনেছেন। অভাব ও কুসংস্কার দূর করে সফল মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সমাজ থেকে দারিদ্র্য ও কুসংস্কার দূরীকরণে ভুমিকা রাখছেন।
ঢাকা নিউজ২৪.কম: ধরা যাক, একটি প্রতিবেদনে আপনার কলেজকে “অন্তহীন দুর্নীতি”-র কলেজ কথা বলা হল। তার বিপক্ষে আপনার কোন বক্তব্য থাকলে বলুন।
অধ্যক্ষ: দীর্ঘ প্রায় ছয় দশক ধরে কলেজটি এলাকার নারীশিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এবং এলাকায় একটি অত্যন্ত স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। প্রকৃতপক্ষে কলেজের দুর্নীতি অস্তিত্বহীন – অর্থাৎ ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে একটি দীর্ঘদিনের সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার প্রয়াস বলে আমরা মনে করি।
ঢাকা নিউজ২৪.কম: কলেজের কম্পিউটার ল্যাবকে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান বানিয়ে টাকার বিনিময়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের যে অভিযোগ আনা হয়েছে। আপনার কোন বক্তব্য আছে কি?
অধ্যক্ষ: তা সঠিক নয়। এলাকার বেকার তরুণ-তরুণীদের আইটি শিক্ষায় দক্ষ করে স্বাবলম্বী করে তোলার মহৎ উদ্দেশ্যে এবং ল্যাব ব্যবহার সংক্রান্ত নীতিমালার আলোকেই এই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। ল্যাব ব্যবহার নীতিমালা অনুসরণ করেই কলেজ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বেসরকারি পর্যায়ে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে, যা কলেজের কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, বরং শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণের কল্যাণে গৃহীত একটি বৈধ উদ্যোগ।
ঢাকা নিউজ২৪.কম: প্রকাশিত সংবাদে বিষয়টিকে অধ্যক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্র্রকৃত ব্যাপার বলবেন কি?
অধ্যক্ষ: প্রকৃত ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রভাষক নাহিদ ফারহানার মা ও ছেলে দীর্ঘদিন যাবৎ গুরুতর অসুস্থ থাকায় তিনি দীর্ঘদিন তাদের সেবা-শুশ্রূষায় নিয়োজিত ছিলেন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকে তাদের উভয়েই ইন্তেকাল করেন। এই দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক সংকট, শোক ও মানসিক চাপের ফলে তিনি নিজেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, যে কারণে তার পক্ষে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়নি। এটি সম্পূর্ণরূপে একটি মানবিক ও পারিবারিক সংকটজনিত পরিস্থিতি ছিল, কোনো অনিয়ম বা বিশেষ সুবিধা প্রদানের বিষয় নয়।
ঢাকা নিউজ২৪.কম: সংবাদে দাবি করা হয়েছে যে, অধ্যক্ষের পরিবর্তে একজন প্রভাষকের মাধ্যমে পরিদর্শন খাতা উপজেলা শিক্ষা অফিসে পাঠিয়ে স্বাক্ষর করানো হয়। এমন হওয়া কি সম্ভব?
অধ্যক্ষ: সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রকৃত নিয়ম হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ স্বয়ং প্রতিষ্ঠানে এসে পরিদর্শন খাতায় স্বাক্ষর করে যান। পরিদর্শন খাতা শিক্ষা অফিসে প্রেরণ করে সেখান থেকে স্বাক্ষর করানোর কোনো নজির নেই। ভিত্তিহীন এই অভিযোগ কলেজের প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি অপচেষ্টা মাত্র।
ঢাকা নিউজ২৪.কম: বিভিন্ন খাতে ভাউচার বানিয়ে সরকারি অনুদানের অর্থ বৈধকরণের যে অভিযোগ আনা হয়েছে। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?
অধ্যক্ষ: সরকারি অনুদানের অর্থ বৈধকরণের অভিযোগ সম্পূর্ণ বাস্তবতা-বিবর্জিত। সরকারি অনুদানের প্রতিটি অর্থ ব্যয় নির্দিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং তা অর্থ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের সরাসরি তদারকির অধীনে থাকে। ফলে কলেজ কর্তৃপক্ষের একক ইচ্ছায় ভাউচার তৈরি করে অর্থ ব্যয়ের কোনো সুযোগ নেই। এই অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ঢাকা নিউজ২৪.কম: প্রতিবেদনে অছাত্রীকে ছাত্রী বানিয়ে দেখানোর যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিষয়টির সত্যতা কতটুকু?
অধ্যক্ষ: সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটা গোপন কোন আস্তানা বা ডেরা নয়। যে কোন সুস্থ স্বাভাবিক লোক এখানে এসে নিজ সন্তানকে ভর্তি করাতে আসতে পারেন। কলেজের শিক্ষার পরিবেশ জানা তার জন্যে অবশ্যই জরুরী বিষয়। কাজেই পরিবেশ যাচাই করার সুযোগ আছে। কিন্তু ‘অছাত্রীকে ছাত্রী বানিয়ে দেখানো’ সম্ভবত অসম্ভব একটি কাজ। এ ধরনের কাজের কোনো সুযোগ বা নজির এই কলেজে নেই, সমগ্র বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায়ও এ ধরনের সুযোগ নেই। প্রতিবেদনে উল্লিখিত এই মতামত সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য।
ঢাকা নিউজ২৪.কম: প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে ঘটনার প্রকৃত ও মানবিক প্রেক্ষাপট যাচাই বা তুলে ধরা ছাড়াই একপাক্ষিকভাবে অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা কলেজ কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারী এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুণ্ণ করেছে। আপনি এখন কি করতে চান?
অধ্যক্ষ: আমি অনুরোধ জানাচ্ছি, প্রকৃত তথ্য যাচাই করে এই প্রতিবাদলিপি যথাযথভাবে প্রকাশ করা হোক এবং ভবিষ্যতে কলেজ সংক্রান্ত যেকোনো প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্বে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা হোক।

ঢাকা নিউজ২৪.কম: জনগণের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন কি?
অধ্যক্ষ: আমাদের ৫৭ বছরের যাত্রাপথ মসৃণ ছিলনা। অনেক হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছে। নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা বিশেষ করে নারী শিক্ষা প্রসারে এই প্রতিষ্ঠানকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করতে সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী সহ সকল স্তরের সকল পর্যায়ের মানুষের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।




