মোঃ সাইদুর রহমান
ঘাতকরা ক্ষুদিরাম থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সবসময় আগস্ট মাসকে রক্তহোলি খেলার মাস হিসেবে বেছে নিয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর অপশক্তিরা বাংলার বুক থেকে জাতির পিতার নাম ধুয়ে-মুছে ফেলে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে বহু বছর ধরে। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসে নিঃশ্বাস ফেলা মীরজাফররা তাঁকে হত্যার নীলনকশা আঁকে। খন্দকার মোশতাকরা বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন ছিলেন। সেটাই ছিল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
বর্তমানে ১৫ আগস্ট মানে কাঙালি ভোজ, কালো ব্যাজ পরাই সীমাবদ্ধ। ১৫ আগস্টের তাৎপর্য নিয়ে কোনো দলীয় নেতাকর্মী ভাবেন না। পূর্বে আমরা মৌসুমি নেতাদের ছবি-সম্বলিত ব্যানার, ফেস্টুনে বানানের ভুলসহ ইতিহাস বিকৃত অনেক লেখাই প্রমাণ করে যে, তারা মোশতাকের উত্তরসূরি। অনেকেই বঙ্গবন্ধুর ছবি টানিয়ে সংগঠনের নামের পরে ‘লীগ’ সংযুক্ত করে ব্যক্তি সুবিধা নিয়েছে। ১৫ আগস্ট মানে কি মোশতাকদের প্রশ্রয়দাতা দিবস? ১৫ আগস্ট মানে কালো পাঞ্জাবি পরে, হৈচৈ করে কাঙালি ভোজ বিতরণ করা নয়?
এই দিনে বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডে বাংলার আকাশ-বাতাস কম্পিত হয়েছিল। তাই এই দিবসের তাৎপর্য ও মর্মবাণী বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত প্রেমিক ছাড়া কেউ অনুধাবন করতে পারবেন না। বঙ্গবন্ধু মানে বাঙালি জাতির অধিকার, স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু মানে বাঙালি জাতির সমস্ত চাওয়ার প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধু মানে সোনার বাংলা, বঙ্গবন্ধু মানে শোষিতদের মুক্তির স্লোগান।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা মানে বিশ্বের ক্যারিশম্যাটিক লিডারকে হত্যা করা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা মানে নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠকে রোধ করা বা চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া এবং সোনার বাংলার স্বপ্নকে হত্যা করা।
১৫ আগস্টের শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর খুনিরা তাঁকে সপরিবারে হত্যা করেও তাদের রক্তের পিপাসা মেটাতে পারেনি। পরবর্তীতে খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নতুন ষড়যন্ত্রের জাল স্বরূপ কালো আইন জারি (ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ) করে বিশ্বের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের বিচারকে আইনের শিকলে বেঁধে ফেলেন। সেই সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রেরণাদায়ী স্লোগান ‘জয় বাংলা’কে পরিবর্তন করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুপ্রেমী মানুষের মন থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে শিকল পরাতে পারেননি তারা। তখন তাঁরা স্লোগান দিতেন, ‘ফারুক-রশীদ ভাই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই।’
১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক নূরুল আমিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. ম. আখতারুজ্জামানসহ একটি লিফলেট তৈরি করেন ‘তোমরা যারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের সহযোগিতা করবে, তাদের সবংশে নির্বংশ করা হবে।’ এটা ছিল হাতের লেখা লিফলেট। সেটা তাঁরা বিভিন্ন মন্ত্রী ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে সমগ্র বাংলাদেশ থমকে গিয়েছিল। বজ্রাহত মানুষের মতো অসাড় হয়ে গিয়েছিল বাংলার শোকাহত মানুষ। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা দেশে এক ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল। সেই সময় ছিল না কোনো প্রতিবাদের সুযোগ, ছিল অসময়ের বজ্রধ্বনি। তখন তাঁরা নিজ হাতে লিখে লিফলেট বিতরণ করেছিলেন। কারণ তাঁরা ১৫ আগস্টের তাৎপর্য অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।
পরবর্তীতে আশি ও নব্বইয়ের দশকে আমরা যাঁরা রাজপথে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার বিচারের দাবিতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান মুখে নিয়ে ঘাতকদের দুর্গ কাঁপিয়েছিলাম, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে জেল-জুলুম-নির্যাতনকে নিত্যদিনের সঙ্গী করেছিলাম, তাঁদের মনেপ্রাণে বিশ্বাস ছিল—বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাঁর আদর্শকে স্লোগানে, মিছিলে বাংলার আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমরা সবাই মিলে হার না মানার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ছাত্রলীগের প্রাচীরকে শক্ত করেছিলাম। সেই ত্যাগীদের মনে হয়তোবা ১৫ আগস্টের মর্মবাণী বেজেছিল। যদিও বর্তমানে ‘ত্যাগী’ শব্দটাও অবহেলিত! অবহেলিত ত্যাগীদের একটাই সান্ত্বনা ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচার হয়েছে।
আগের কলামে লিখেছিলাম, দল ক্ষমতায় থাকলে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ভাঙে, পুলিশ পাহারায় রাখতে হয় জাতির পিতার প্রতিকৃতি! দল ক্ষমতায় না থাকলে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের অস্তিত্ব থাকবে না। ‘দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভালো।’ সারা দেশে ‘লীগ’ নামে সংগঠনের অভাব নেই, নেতাকর্মীরও অভাব নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হয় সবাই জয় বাংলার লোক। শুধু বঙ্গবন্ধুপ্রেমিকের বড় অভাব! বর্তমানে ক্ষমতার টানে অনুপ্রবেশকারীরা দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে। তারা ১৫ আগস্ট মানে মনে করেন কালো রূপ ধারণ করা আর হৈহৈল্লা করে কাঙালি ভোজনের আয়োজন করা। কালোর মধ্যেই কালসাপগুলোকে চিহ্নিত করে দলকে মোশতাকমুক্ত করতে হবে। দলের নেতাকর্মীদের মাঝে বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও জীবনাদর্শকে বিতরণ করা অতিজরুরি।
৫ আগস্টের পর তার বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখলাম। জাতির পিতা বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। ১৫ আগস্ট শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, একটি স্বাধীন জাতিকে পরাধীন ও সাম্প্রদায়িক করার চক্রান্তও বটে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট ।



