নিউজ ডেস্ক : প্রচলিত ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক পুঁজির বিকল্প উৎস তৈরি করতে হংকংয়ে বাংলাদেশের জন্য ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশেষ তহবিল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত এই তহবিল ঋণভিত্তিক নয়; এটি হবে ইক্যুইটি বিনিয়োগভিত্তিক বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক তহবিল।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বিবার্ষিক অর্থনৈতিক অবস্থা: রাজস্ব ও মুদ্রানীতির প্রেক্ষিত এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
আমির খসরু বলেন, হংকংয়ে বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে। এতে ২ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি থাকবে এবং এটি বাংলাদেশের জন্য ঋণের বোঝা তৈরি করবে না। বরং ইক্যুইটি বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক পুঁজি আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের উৎসের ওপর চাপ কমানো এবং বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো। দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজার দুর্বল থাকায় বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ কারণে পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ইক্যুইটি পুঁজি সংগ্রহের পথও খোঁজা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে তোলার জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান ও চার কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরছে এবং বাজারও শক্তিশালী হওয়ার দিকে এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিএসইসির সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও বাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামো সংস্কারের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে শুধু বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরলেই হবে না বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হলে তাদেরও বাজারের ওপর আস্থা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক শাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
অর্থমন্ত্রী অতীতের পুঁজিবাজার পরিস্থিতির সমালোচনা করে বলেন, একসময় বাজারটি অনেকটা ‘ক্যাসিনো’র মতো হয়ে উঠেছিল। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাজারের একটি অংশ লাভবান হয়েছে। বর্তমান সরকার এই সংস্কৃতি পরিবর্তন করে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুঁজিবাজার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
হংকংয়ের প্রস্তাবিত তহবিলকে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বহুমুখীকরণের একটি অংশ হিসেবে দেখছেন আমির খসরু। তিনি জানান, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য ডলার বন্ড, পান্ডা বন্ড ও সামুরাই বন্ডসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহারের বিষয়েও কাজ করছে।
অর্থমন্ত্রীর মতে, বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে সরকারি অর্থায়নের ক্ষেত্রে দেশীয় ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে। এর ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ ও বিনিয়োগের জন্য আরও বেশি অর্থ পাওয়ার সুযোগ পাবে। সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কিছুটা কমিয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে এই পরিবর্তন একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও কথা বলেন আমির খসরু। তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি করা নয়; বরং করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে করের আওতা বাড়ানো। একই সঙ্গে কর প্রশাসনে অটোমেশন বাড়িয়ে করদাতা ও কর কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী।-
সামগ্রিকভাবে, হংকংয়ে প্রস্তাবিত ২ বিলিয়ন ডলারের ইক্যুইটি তহবিল, পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবন, আন্তর্জাতিক বন্ড বাজারে প্রবেশ এবং করজাল সম্প্রসারণ—এসব উদ্যোগকে বাংলাদেশের অর্থায়ন কাঠামোকে বহুমুখী করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন অর্থমন্ত্রী। সরকারের লক্ষ্য হলো প্রচলিত ঋণনির্ভরতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যও সরকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।




