আলামীন, রংপুর : রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দুজনকে আটক করেছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ। আটক দুজন হলেন সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩)। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন।
গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) মাছুয়াপাড়া এলাকায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রিয়মকে হত্যা করা হয়। ঘটনার পরপরই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করে।
পুলিশ জানায়, গোয়েন্দা তথ্য, মাঠপর্যায়ের সোর্স এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন হিসেবে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। পরে অভিযান চালিয়ে সিদ্ধার্থকে তাঁর চাচার বাসা থেকে আটক করা হয়।
অন্যদিকে মুগ্ধকে তাঁর বাড়ি থেকে আটকের চেষ্টা করা হলে তিনি টিনের বেড়া ভেঙে পালিয়ে যান। পরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল তাঁকে ধাওয়া করে। প্রায় এক ঘণ্টা পর তুতপাড়া এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, পৃথকভাবে এবং পরে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে দুজন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পরস্পরসঙ্গত তথ্য দিয়েছেন।
ইয়াবা সেবন ও চুরির উদ্দেশ্যের কথা বলছে পুলিশ
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন সকালে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির দোতলায় যান। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ইয়াবা সেবনের পাশাপাশি তাঁদের চুরির উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। তবে এ বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।
পুলিশ বলছে, ইয়াবা সেবনের সময় গণপতি চক্রবর্তী তাঁদের দেখে ফেলেন। বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা গামছা দিয়ে তাঁর গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। পরে মরদেহটি ছাদে থাকা টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।
শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়ে দোতলায় উঠে এলে তাঁদেরও সিঁড়ির মধ্যে গলায় ওড়না বা দড়ি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয় বলে পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।
পরে বাড়ির বিভিন্ন কক্ষ তছনছ করে জিনিসপত্র নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে প্রিয়মকেও তাঁর শয়নকক্ষে একইভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর দুজন বাড়ি থেকে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে ছাদ দিয়ে বের হয়ে যান। পরে সেগুলো শ্যামাসুন্দরী খালে ফেলে দেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। আটক দুজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সামগ্রী, নিয়ে যাওয়া মালামাল ও অন্যান্য আলামত উদ্ধারে অভিযান চলছে।
আটক সিদ্ধার্থ দাস তুতফার্ম, কামাল কাছনা, মাছুয়াপাড়া এলাকার বিনয় চন্দ্র দাস ও পাপড়ি দাসের ছেলে। মুগ্ধ দাস একই এলাকার মৃত কানু দাসের ছেলে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পরপরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়। গোয়েন্দা তথ্য, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতার সমন্বয়ে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হয়েছে। দ্রুত অভিযান চালিয়ে দুজনকে আটক করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যাঁদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে।
পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, আটক দুজনের প্রাথমিক বক্তব্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নেওয়া হচ্ছে না। আলামত, সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিশ্চিত করা হবে।
এ ঘটনায় পুলিশের দ্রুত তৎপরতায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে চারজনের হত্যার পেছনে প্রকৃত কারণ কী এবং আর কেউ জড়িত কি না, তা নিয়ে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।




