নিউজ ডেস্ক: ৯৬ বছর বয়সে মারা গেছেন পাবনার ফরিদুপুর উপজেলার শামসুল আলম টুনু। জমি আত্মসাৎ করতে স্বজনেরা তাকে জীবিত থাকতেই ‘মৃত’ বানিয়েছিল। নিজেকে বেঁচে থাকার প্রমাণ দিতে শেষ বয়সে তাকে আদালতের বারান্দায়ও ঘুরতে হয়।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান। অবশেষে মৃত্যুর মাধ্যমেই তিনি প্রমাণ করে গেলেন, এতদিন তিনি সত্যিই বেঁচে ছিলেন।
পাবনার ফরিদপুর উপজেলার দীঘুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন শামসুল আলম টুনু। পৈতৃক বসতভিটায় তার অনুপস্থিতির সুযোগে স্থানীয় প্রভাবশালী স্বজনরা তাকে মৃত দেখিয়ে ভুয়া ওয়ারিশান সনদ তৈরি করে। পরবর্তীতে সেই জাল কাগজের ভিত্তিতে তার মূল বসতভিটা দখল করে সুদৃশ্য একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়।
শুধু তাই নয়, তার মায়ের পৈতৃক প্রায় ১০০ বিঘা জমি গত ৪০ বছর ধরে তারা বেআইনিভাবে দখল করে রেখেছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
পরিবার জানায়, জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পেরে টুনু সাহেব ও তার পরিবার প্রতিবাদ করলে তাদের নামে উল্টো ধর্ম অবমাননার মিথ্যা মামলা ঠুকে দেওয়া হয়। ক্যান্সার আক্রান্ত ৯৬ বছরের বৃদ্ধ টুনু সাহেবকে জীবনের শেষ বয়সে এসে পাবনা আদালতের বারান্দায় চক্কর কাটতে হয়।
বিনা অপরাধে এই অপমান ও শারীরিক ধকল সহ্য করতে না পেরে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে যান এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
বাবার এই মর্মান্তিক পরিণতির বিষয়ে তার ছেলে আহমেদ আক্তার জ্যোতি বলেন, ‘আমরা সপরিবারে ঢাকায় থাকার সুযোগে বাবা বেঁচে থাকতেই তাকে মৃত বানিয়ে সমস্ত সম্পত্তি দখল করে নেওয়া হয়।
প্রতিবাদ করায় আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং তড়িঘড়ি করে বিতর্কিত জমিতে মসজিদ উদ্বোধনের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। বাবার আকুতি ছিল তার পৈতৃক ভিটা আর সম্মানটুকু ফিরে পাওয়ার। কিন্তু মিথ্যা মামলা আর অপমানে ভেঙে পড়ে শেষ পর্যন্ত বাবাকে জীবন দিতে হলো।’
শামসুল আলম টুনু’র পুত্রবধূ ও সমাজকর্মী আসমা আক্তার লিজা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা অধিকার চাইতে গিয়ে চরম লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছেন। শ্বশুরকে নিয়ে পাবনা আদালতে শেষবার যাওয়ার করুণ স্মৃতি স্মরণ করে ফেসবুকে এক আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন তিনি।
সেখানে তিনি লেখেন, পাবনা কোর্টে বসে তার শ্বশুর বলেছিলেন, ‘সারাজীবন সম্মান নিয়ে বেঁচেছি। জীবনের এই শেষ সময়ে এসে এমন কোর্টের দুয়ারে চক্কর কাটতে হচ্ছে বিনা অপরাধে। এই অপমান আমি নিতে পারছি না!’
স্ট্যাটাসে লিজা আরও উল্লেখ করেন, জাল দলিল করে তাকে মৃত দেখিয়ে বসতভিটায় মসজিদ বানানো হয়েছে এবং তার মায়ের ১০০ বিঘা জমি জবরদখল করা হয়েছে। অন্যের জমি জবরদখল ও জালিয়াতি করে মসজিদ বানিয়ে নিজেদের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করেছিল তারা।
তিনি আক্ষেপ করে লেখেন, ৯৬ বছরের একজন ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষকে এভাবে হয়রানি করা অপরাধীদের বিবেক কুড়ে কুড়ে খাবে। তার শ্বশুরের জীবনের শেষ বিদায়ই আজ দুনিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে উঠে এসেছে।
শামসুল আলম টুনুর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে শুক্রবার সকাল ৯টায় তার গ্রামের বাড়িতে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।




