নিউজ ডেস্ক : জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেও শেষ মুহূর্তে থমকে গেছে। বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রায় সাড়ে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন নেতৃত্বের ঘোষণা আসেনি। সম্ভাব্য নেতাদের তালিকা তৈরি ও যাচাই-বাছাই শেষ পর্যায়ে থাকলেও নেতৃত্বের উপযুক্ত সমন্বয় নিয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে আরও আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
রাকিবুল ইসলাম ও নাছির উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটি ২০২৪ সালের ১ মার্চ গঠিত হয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর। সে হিসাবে গত ১ মার্চ এ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর থেকেই নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার প্রস্তুতি শুরু হয়। আগস্টে এসে প্রক্রিয়াটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।
আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা হয় এবং সম্ভাব্য কয়েকজনের নাম ও মতামত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এরপর ধারণা তৈরি হয়েছিল, দ্রুতই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। কিন্তু সেই ঘোষণা আর আসেনি।
কেন আটকে গেল নতুন কমিটি
নতুন কমিটি গঠনে সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা নেতাদের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে তুলনামূলক বেশি গ্রহণযোগ্য এবং বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে সক্ষম তরুণ নেতাদেরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এবার নেতৃত্ব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলায় নেতাদের ভূমিকা, মামলা-গ্রেপ্তার ও আন্দোলনে অংশগ্রহণ, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, শিক্ষাজীবন, রাজনৈতিক পরিচয়, বিতর্ক বা অভিযোগ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনা হলেও শেষ মুহূর্তে কাকে কোন পদে বসানো হবে—এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হচ্ছে না। বিশেষ করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তরুণ বনাম অভিজ্ঞ—দুই ধরনের ভাবনা
ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মূলত দুটি বিবেচনা সামনে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একদিকে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনে পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞ নেতাদের সামনে আনার পক্ষে মত রয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বয়স ও মানসিকতার দূরত্ব কমাতে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের ফলাফল এবং ক্যাম্পাস রাজনীতির বাস্তবতা নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের আলোচনায় প্রভাব ফেলছে বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে নেতৃত্বে প্রজন্মগত পরিবর্তনের বিষয়টি তাই আলোচনায় রয়েছে।
‘সিন্ডিকেট’ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা
নতুন কমিটি গঠনের আরেকটি আলোচিত দিক হলো অতীতের কথিত ‘সিন্ডিকেট’ বা বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব থেকে নেতৃত্ব নির্বাচনকে দূরে রাখার চেষ্টা। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করছেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এর ফলে পদপ্রত্যাশীদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সুপারিশের চেয়ে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক রেকর্ডকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বও গুরুত্বপূর্ণ
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্ব নিয়েও আলোচনা চলছে। কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটি সাধারণত কাছাকাছি সময়ে পুনর্গঠনের বিষয়টি সামনে আসে। তাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চূড়ান্ত করার সঙ্গে ঢাবি শাখার নেতৃত্ব নিয়েও সমীকরণ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
সম্ভাব্য নেতাদের তালিকায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একাধিক নেতার নাম রয়েছে। তবে কারও নাম আলোচনায় থাকা মানেই তিনি চূড়ান্তভাবে পদ পাচ্ছেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এসব নামকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
পাঁচ সদস্যের কমিটি দিয়ে শুরু হতে পারে
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রথম ধাপে পাঁচ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। পরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগোতে পারে। তবে নির্দিষ্ট তারিখে কমিটি ঘোষণা হবে—এমন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি।
নতুন কমিটি ঘোষণার সময় নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে ঘোষণা হতে পারে—এমন আলোচনা থাকলেও নির্দিষ্ট সময় নিশ্চিত করেনি সংশ্লিষ্ট কোনো সূত্র। সফরের আগে না হলে পরবর্তী সময়ে ঘোষণার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে ছাত্রদলের নতুন কমিটি আটকে থাকার মূল কারণ হিসেবে সামনে আসছে চূড়ান্ত নেতৃত্ব বাছাইয়ে একাধিক মানদণ্ডের সমন্বয়। দীর্ঘ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে।-
এখন নজর মূলত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের দিকে। চূড়ান্ত অনুমোদন এলেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ঘোষণা আসতে পারে। তবে ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কোনো সম্ভাব্য নাম বা নেতৃত্বের সমীকরণকে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।




