ঢাকা  সোমবার, ৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশময়মনসিংহগৌরীপুরের শতবর্ষ পুরাতন আরকে হাই স্কুলের ঐতিহ্যের লাল দালান

গৌরীপুরের শতবর্ষ পুরাতন আরকে হাই স্কুলের ঐতিহ্যের লাল দালান

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:  এয়মনসিংহের গৌরীপুর আর কে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষের পুরাতন ঐতিহ্যেবাহী লাল দালান অযত্নে অবহেলায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। ১৯১১ সালে গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ কিশোর রায় চৌধুরী এই এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের জন্য তাঁর পিতা রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর নামে রাজেন্দ্র কিশোর উচ্চ বিদ্যালয় সংক্ষেপে আর কে হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। জমিদার ১১.৬৬ একর জমি স্কুলের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে জমির উপর ইংরেজী ঊ প্যাটার্নে লম্বা লাল রংয়ের সুদৃশ্য ভবন নির্মাণ করেন। ভবনের সামনে খেলার মাঠ, বিশাল পুকুর খনন করেন, যা অনন্ত সাগর দীঘি নামে পরিচিত। পুকুরের ওপাড় থেকে বিদ্যালয়টি দেখতে অপূর্ব ও নয়নাভিরাম। শিক্ষকদের থাকার জন্য কোয়ার্টার ও পানির জন্য কোয়ার্টারের পিছনে পুকুর খনন করেন। শিক্ষার্থীদের খেলাধূলার জন্য বিশাল খেলার মাঠ নির্মাণ করেন।

কালের আবর্তে ১৯৯৭ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হয়। এসময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নামে ১০.৬২ একর জমি রেজিস্ট্রি করে লিখে দেয়া হয়। নির্মাণ করা হয় পর্যায়ক্রমে নতুন ভবন। পুরাতন ভবনের চাহিদা কমতে থাকে। এক পর্যায়ে বিদ্যালয়ের পাঠ কার্যক্রম নতুন ভবনে স্থানান্তরের ফলে পবিত্যক্ত হয়ে পড়ে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহি লাল ভবনটি। বর্তমানে ভবনটির লম্বা বারান্দায় এখন আর শিক্ষার্থীদের কোলাহল নেই। শ্রেণিকক্ষের কোথাও দরজা-জানালার পাল্লা ভাঙা, কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। মেঝেতে ধুলাবালু আর ভাঙাচোরা জিনিসপত্র। তাদেও দাবি প্রতিষ্ঠানটিতে ডবল শিফট চালু করা হলে আলাদা রক্ষণাবেক্ষনের প্রয়োজন হবে না এবং অতিরিক্ত জনবলও লাগেবে না।

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ বদরুল আলম এ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে পুরোনো ভবনের দরজা-জানালা ভাঙা হয়েছে। ফ্যান, বৈদ্যুতিক তার, বাতি ও একটি সাবমার্সিবল মোটর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার সংযোগের তারও খুলে নেওয়া হয়েছে।
বদরুল আলম বলেন, বৃষ্টির পানি পড়ে ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর চাওয়া, শতবর্ষ পেরোনো বিদ্যালয়ের এই ঐতিহ্য যেন আরও বহু বছর টিকে থাকে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রুবিয়া খাতুন নিপা জানান, পুরোনো ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধে থানায় লিখিতভাবে জানিয়ে সপ্তাহে কয়েক দিন টহলের অনুরোধ করা হয়েছিল। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও যোগাযোগ করেছেন তাঁরা। গৌরীপুরবাসীর কাছে আমার একটাই আবেদন, এই ঐতিহ্যটাকে সরকারি সম্পদ হিসেবে ধরে রাখার জন্য সবাই মিলে চেষ্টা করবেন।’

গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি। পুলিশ নিয়মিত ওই এলাকায় যায় এবং পুরোনো কক্ষগুলোর দিকে নজর রাখে বলে জানান তিনি।
পুরোনো ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মচারী সংকটও। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কর্মচারীর অনুমোদিত আট পদের সাতটিই শূন্য। একমাত্র সরকারি কর্মচারীরও আগামী নভেম্বরে অবসরে যাওয়ার কথা। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অস্থায়ী নৈশপ্রহরী ও কম্পিউটার অপারেটর রেখে কাজ চালানো হচ্ছে। শিক্ষকপদ ১৭টির মধ্যে কর্মরত আছেন ১৬ জন।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাঃ নাসির উদ্দীন বলেন, শূন্য পদের তালিকা পদায়নের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো পদায়ন হয়নি। পুরোনো ভবন রক্ষায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এদিকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেল মিয়া জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ের একটি পুরোনো ভবন সংস্কারে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া চলছে। তবে কাজটি মূল লাল ভবনের জন্য নয়; পাশের যে পুরোনো ভবনটি পরীক্ষার হল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেটির জন্য। পরীক্ষার হল সংস্কারের উদ্যোগ থাকলেও ঐতিহ্যবাহী লাল ভবনটির সংরক্ষণে আলাদা কোনো সুনির্দিষ্ট প্রকল্প বা বরাদ্দের তথ্য পাওয়া যায়নি।

গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফিয়া আমীন পাপ্পা বলেন, বিদ্যালয়টি শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন হওয়ায় উপজেলা প্রশাসনের নিজস্ব তহবিল থেকে ভবন সংস্কারে আলাদাভাবে অর্থ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে সমাধানের পথ খুঁজতে পারেন। স্মৃতিবিজড়িত ভবনটি সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন ।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহছিনা খাতুন জানান, এ ধরনের জরাজীর্ণ ভবনের বিষয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।

বিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী বলেন, ‘স্কুলটা আমাদের জন্য একটা আবেগের জায়গা। যারা এখানে পড়েছে, সবারই।’ নতুন ভবনে পাঠদান চলছে, পাশের পরীক্ষার হল সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গৌরীপুরের বহু মানুষের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি ধরে রাখা লাল দালানটি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ কবে আসবে সেই অপেক্ষায় শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।

ভবনের ঐতিহ্য রক্ষায় ও ভবনটি সংস্কারের জন্য স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, সুধিসমাজ, শিক্ষক, সাংবাদিক, এলাকাবাসী মতবিনিময় সভা করেছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular