ঢাকা  মঙ্গলবার, ৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআন্তর্জাতিকজেনেভায় মানবাধিকার উন্নয়নে এআই নিয়ে চীনের আয়োজন

জেনেভায় মানবাধিকার উন্নয়নে এআই নিয়ে চীনের আয়োজন

নিউজ ডেস্ক : সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নের কাজে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে জেনেভায় বিশেষ এক পার্শ্ব অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে চীন। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৬৩তম অধিবেশন চলাকালে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে এআইয়ের সম্ভাবনা, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং ঝুঁকি মোকাবিলার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৬৩তম অধিবেশন ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত জেনেভায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এমপাওয়ারিং হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি বুধবার জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। চীনের স্থায়ী মিশন এবং চায়না এনজিও নেটওয়ার্ক ফর ইন্টারন্যাশনাল এক্সচেঞ্জেস যৌথভাবে এর আয়োজন করে। এতে ২০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রধান ও বিশেষজ্ঞসহ প্রায় ১০০ জন অংশ নেন। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় বৈশ্বিক এআই শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্রযুক্তির সুফলকে মানবাধিকার উন্নয়নে কাজে লাগানো।

২০২৬ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৬৩তম অধিবেশন চলাকালীন ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানবাধিকার উন্নয়নে ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক একটি পার্শ্ব অনুষ্ঠানের দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীত।

চীনের স্থায়ী মিশনের কাউন্সেলর ওয়াং নিয়ান বলেন, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানবাধিকার সুরক্ষায় এআই ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করার বিষয়ে চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি জানান, মানবাধিকার পরিষদে মানবাধিকার উন্নয়নে এআইয়ের ভূমিকা নিয়ে চীন একাধিক যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি ‘সবার জন্য প্রবেশাধিকার’ বিষয়েও একটি বিষয়ভিত্তিক প্রস্তাব উত্থাপন করেছে চীন।

ওয়াং বলেন, এআই ব্যবহারে চীন জনকেন্দ্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক পদ্ধতির পক্ষে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ, নারী ও শিশুদের মতো জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও সক্ষম করে তোলা এবং সামাজিক জীবনে তাদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে চীনা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও এআই ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। চায়না এনজিও নেটওয়ার্ক ফর ইন্টারন্যাশনাল এক্সচেঞ্জেসের ডেপুটি সেক্রেটারি-জেনারেল লিউ ঝেনঝং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও ত্রাণকাজে চীনা নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর এআই ব্যবহারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

লিউ ঝেনঝং বলেন, এআই একদিকে মানবাধিকারের অগ্রগতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে এর সঙ্গে সম্ভাব্য শাসনগত ঝুঁকিও রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর সেতুবন্ধনকারী ভূমিকা কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক এআই শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে প্রযুক্তির সুফল যেন সব দেশ ও জনগোষ্ঠী ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে পায়, তা নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তায় এআই

অনুষ্ঠানে বেইজিং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ফেডারেশনের প্রেসিডিয়ামের ভাইস প্রেসিডেন্ট লু জিয়াওগুয়াং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রযুক্তির ব্যবহার তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও শিল্প সক্ষমতা—এই তিনটি দিককে সমন্বয় করে বেইজিং ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস এবং স্মার্ট সহায়ক যন্ত্রের মতো প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ এগিয়ে নিচ্ছে।

তাঁর মতে, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিবন্ধী সহায়তার একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দৈনন্দিন জীবন সহজ করার পাশাপাশি সমান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এর মাধ্যমে তাদের আইনগত অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

যোগাযোগের বাধা কাটাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

অনুষ্ঠানে মানুষের ‘কথা বলার অধিকার’ বা নিজের বক্তব্য প্রকাশের সক্ষমতাও আলোচনায় আসে। বেইজিং এনজিও নেটওয়ার্ক ফর ইন্টারন্যাশনাল এক্সচেঞ্জেসের প্রকল্প কর্মকর্তা উ জিয়ানশে জানান, তোতলামি ও আলঝেইমারের মতো সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যোগাযোগের বাধা কমাতে এআই ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।

তিনি বেইজিংয়ের বহুভাষিক গণসেবা প্ল্যাটফর্ম তৈরির অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বুদ্ধিমান গণসেবা ব্যবস্থা মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবা ও জনকল্যাণে এআই

হংকং গ্লোবাল প্রফেশনাল ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক কেভিন লাউ চুং-হ্যাং স্বাস্থ্যসেবা ও জনকল্যাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ডিজিটাল ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর ঘাটতির কথা উল্লেখ করে উত্তর-দক্ষিণ উন্নয়ন ব্যবধান কমাতে আন্তঃসীমান্ত ও আন্তঃআঞ্চলিক বেসরকারি সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

অ্যাসোসিয়েশন এআইডিএইচডিইএসের প্রতিনিধি ডেভিড লোপেজ বলেন, বিশ্বে স্মার্ট সেবা ও প্রযুক্তিগত সম্পদের বণ্টন এখনও অসম। তাই জনমুখী এআই অবকাঠামো দ্রুত উন্নত করা এবং এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক স্মার্ট সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে সব শ্রেণি ও জনগোষ্ঠী প্রযুক্তির সুফল পেতে পারে।

তিনি প্রযুক্তিগত বাধা দূর করে বিভিন্ন দেশের মানুষকে এআই উন্নয়নের সুফল ন্যায্যভাবে ভোগ করার সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেন।

অটিজম শনাক্তকরণেও এআইয়ের ব্যবহার

আলজেরিয়ার আইবিআরএএ অটিজম ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা আইয়ুব মিহৌবি অটিজমের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, পুনর্বাসনমূলক হস্তক্ষেপ এবং পরিবারকে নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এআই প্রযুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ডিজিটাল ও বুদ্ধিমান সহায়তা ব্যবস্থা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পরিবারের ওপর পরিচর্যার চাপ কমাতে পারে। একই সঙ্গে তাদের জন্য পেশাদার ও সহজলভ্য সামাজিক কল্যাণ এবং উন্নয়নমূলক সহায়তা পৌঁছে দেওয়াও সহজ হতে পারে।

এদিকে শিখ হিউম্যান রাইটস গ্রুপের পরিচালক জসদেব রাই দারিদ্র্য বিমোচন, জনস্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশগত শাসনের মতো ক্ষেত্রে এআইয়ের সম্ভাব্য অবদানের কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে নৈতিক সীমারেখা, ঝুঁকি প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। এআই যেন নিরাপদ, জনকল্যাণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে বিকশিত হয়, সেটিই হওয়া উচিত প্রযুক্তি উন্নয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

বিশ্বজুড়ে এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের প্রেক্ষাপটে জেনেভার এ আয়োজনের গুরুত্বও রয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৬৩তম অধিবেশন ৭ সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত জেনেভায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই অধিবেশনে মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা চলছে।-

জেনেভার আলোচনায় তাই এআইকে শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন হিসেবে নয়, বরং প্রতিবন্ধী সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ মোকাবিলা, যোগাযোগ, জনকল্যাণ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে দেখার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে এআইয়ের সুফল যেন বৈষম্য সৃষ্টি না করে এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেন মানবাধিকারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে—সেই প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সূত্র : পিপুলস্ ডেইলী

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular