স্বাস্থ্য ডেস্ক: হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত: সবার জন্য একই চিকিৎসা নয়হার্ট অ্যাটাকের কথা শুনলেই মনে আসে তীব্র বুকব্যথা, হাসপাতালে ছোটাছুটি আর জীবন-মৃত্যুর লড়াই।
বাস্তবেও এটি এমন এক জরুরি অবস্থা, যেখানে চিকিৎসায় দেরি হলে হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি বাড়তে থাকে। তাই দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং বন্ধ ধমনিতে রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়া এখনো চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
তবে আধুনিক গবেষণা আমাদের আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করছে—সব হার্ট অ্যাটাক এক রকম নয়। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসাও আলাদা হতে পারে।
২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ‘সার্কুলেশন’-এ প্রকাশিত হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসাবিষয়ক একটি পর্যালোচনামূলক নিবন্ধ এই আলোচনাকে সামনে এনেছে।
গত কয়েক বছরের গবেষণায় রোগ শনাক্ত করা, ধমনির বাধা দূর করা এবং পরবর্তী সময়ে ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের মূল শিক্ষা হলো—চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হবে রোগীকে সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন করে।
হার্ট অ্যাটাক কীভাবে হয়, তা সহজভাবে বোঝা প্রয়োজন। হৃদ্যন্ত্র সারা শরীরে রক্ত পাঠায়। কিন্তু তার নিজের পেশিকেও বেঁচে থাকতে রক্ত ও অক্সিজেন পেতে হয়। সেই রক্ত পৌঁছে দেয় হৃদযন্ত্রের ধমনিগুলো।
কোনো কারণে এই রক্তপ্রবাহ হঠাৎ মারাত্মকভাবে কমে গেলে বা বন্ধ হলে হৃদ্পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। রক্তের অভাবে পেশির কোষ মারা যাওয়াই হার্ট অ্যাটাক।
হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে ইসিজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তবে একটি ইসিজির ফলই সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না।
কিছু রোগীর ধমনি বন্ধ থাকলেও প্রথম ইসিজিতে পরিচিত পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট নাও হতে পারে। তাই উপসর্গ সন্দেহজনক হলে প্রয়োজন অনুযায়ী আবার ইসিজি, রক্ত পরীক্ষা এবং অন্যান্য মূল্যায়ন করতে হয়।
প্রথম পরীক্ষায় বড় পরিবর্তন নেই বলে রোগীর অভিযোগ উপেক্ষা করা উচিত নয়। হৃদ্ন্ত্রের ক্ষতি বুঝতে রক্তে ‘ট্রোপোনিন’ পরীক্ষা করা হয়।
কিন্তু এই পরীক্ষার ফল বেড়ে গেলেই যে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তা নয়। হৃদ্পেশির প্রদাহসহ অন্য অসুস্থতাতেও এটি বাড়তে পারে। রোগীর উপসর্গ, ইসিজি, পরীক্ষার ফলের পরিবর্তন এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করেন।
এখানেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন চিন্তার গুরুত্ব। শুধু পরীক্ষার একটি নির্দিষ্ট চিহ্ন খোঁজার পাশাপাশি বুঝতে হবে—কার হৃদ্পেশিতে এই মুহূর্তে রক্ত পৌঁছাচ্ছে না, কাকে দ্রুত চিকিৎসা দিলে বড় ক্ষতি এড়ানো যাবে। ইসিজি বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও সহায়ক হয়ে উঠছে। তবে প্রযুক্তির ফলকে রোগীর বাস্তব অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করতে হবে।
হার্ট অ্যাটাকের জরুরি চিকিৎসায় সময়ের গুরুত্ব আগের মতোই অটুট। উপযুক্ত রোগীর বন্ধ ধমনি ক্যাথেটারের সাহায্যে খুলে রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়াকে বলা হয় প্রাইমারি পিসিআই। সাধারণ মানুষের কাছে এটি অনেক সময় ‘জরুরি রিং বসানো’ নামে পরিচিত। সময়মতো এই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হলে হৃদ্পেশির ক্ষতি কমানো যায়।
তবে সব জায়গায় দ্রুত এই সুবিধা পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে উপযুক্ত রোগীকে জমাট রক্ত গলানোর ওষুধ দিয়ে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠাতে হয়। ওষুধ দেওয়ার পর ব্যথা কমে গেলেই দায়িত্ব শেষ নয়। রক্তপ্রবাহ ফিরেছে কি না এবং পরবর্তী চিকিৎসা কী হবে, তা নিশ্চিত করতে হয়।
আবার দেরিতে হাসপাতালে এলেই চিকিৎসার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। রোগীর ব্যথা চলতে থাকলে, রক্তচাপ পড়ে গেলে বা হৃদ্স্পন্দনে বিপজ্জনক সমস্যা হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। কতক্ষণ আগে উপসর্গ শুরু হয়েছে, তার পাশাপাশি রোগীর বর্তমান অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি পুরোনো ধারণা হলো—ধমনিতে যত বাধা পাওয়া যাবে, একসঙ্গে সব খুলে দিলেই সবচেয়ে ভালো ফল হবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। হার্ট অ্যাটাকের কারণে হৃদ্যন্ত্র খুব দুর্বল হয়ে রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে গেলে প্রথমে ওই আক্রমণের জন্য দায়ী ধমনির চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। একই সময়ে অন্য সব ধমনিতে কাজ করলে কিছু রোগীর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অন্যদিকে স্থিতিশীল রোগীর একাধিক ধমনিতে গুরুত্বপূর্ণ বাধা থাকলে সেগুলোরও চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সব চিকিৎসা একই দিনে হবে, নাকি ধাপে ধাপে—তা নির্ভর করে রোগীর অবস্থা, কিডনির কার্যক্ষমতা এবং ধমনির সমস্যার জটিলতার ওপর। শুধু কতটি রিং বসানো হলো, তা দিয়ে চিকিৎসার সাফল্য বিচার করা যায় না।
অত্যন্ত সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তসঞ্চালনকে সহায়তা করার বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এসব যন্ত্র নির্বাচিত রোগীর উপকার করতে পারে। কিন্তু রক্তক্ষরণ, কিডনির ক্ষতি কিংবা অন্য জটিলতাও ঘটতে পারে। তাই আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার মানেই নিশ্চিত ভালো ফল নয়। কোন রোগীর জন্য কোন সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রেও ব্যক্তিভেদে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। বয়স বেশি বলেই কার্যকর চিকিৎসা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। আবার অত্যন্ত দুর্বল, একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসার সম্ভাব্য উপকার ও কষ্ট—দুটিই বিবেচনা করতে হবে। রোগী কী চান, দৈনন্দিন জীবনে তিনি কতটা স্বনির্ভর এবং চিকিৎসার পর তাঁর জীবন কতটা উন্নত হতে পারে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
হার্ট অ্যাটাকের পর ওষুধের চিকিৎসাতেও নতুন গবেষণার প্রভাব পড়ছে। রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমাতে অনেক রোগীকে দুটি অ্যান্টিপ্লেটলেট ওষুধ দেওয়া হয়। সাধারণভাবে অনেকে এগুলোকে ‘রক্ত পাতলা করার ওষুধ’ বলেন। উচ্চ রক্তক্ষরণঝুঁকি না থাকলে প্রায় এক বছর দুটি ওষুধ চালানো এখনো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ। তবে কারও রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেশি হলে চিকিৎসক মেয়াদ বা ওষুধের সমন্বয় পরিবর্তন করতে পারেন।
এখানে রোগী ও পরিবারের জন্য সবচেয়ে জরুরি কথা হলো—নিজের সিদ্ধান্তে এসব ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। বিশেষ করে রিং বসানোর পর হঠাৎ ওষুধ বন্ধ করলে রিংয়ের ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধার বিপদ তৈরি হতে পারে। নতুন গবেষণার অর্থ চিকিৎসা বাদ দেওয়া নয়; বরং কার কতদিন কোন ওষুধ প্রয়োজন, তা আরও ভালোভাবে নির্ধারণ করা।
হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বিটা-ব্লকার ওষুধ নিয়েও নতুন তথ্য এসেছে। হার্ট অ্যাটাকের পর হৃদ্যন্ত্রের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা স্বাভাবিক এবং ওষুধটির অন্য প্রয়োজন নেই—এমন রোগীর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে বাড়তি উপকার স্পষ্ট নয়। কিন্তু হৃদ্যন্ত্র দুর্বল থাকলে বা অন্য নির্দিষ্ট সমস্যা থাকলে এই ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই একজনের ওষুধ পরিবর্তন হয়েছে দেখে অন্যজনের একই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
ডায়াবেটিস, হৃদ্যন্ত্রের অকার্যকারিতা বা কিডনির রোগে উপকারী কিছু নতুন ওষুধও এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু শুধু হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বলেই প্রত্যেককে সব নতুন ওষুধ দিতে হবে, এমন প্রমাণ নেই। রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক ওষুধ নির্বাচন করতে হবে।
এনজিওগ্রামে বড় বাধা পাওয়া যায়নি—এমন রোগীরও কখনো হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। ধমনির সাময়িক খিঁচুনি, ক্ষুদ্র রক্তনালির সমস্যা কিংবা অন্য কারণে হৃদ্পেশিতে রক্তের ঘাটতি হতে পারে। তাই ‘এনজিওগ্রামে বড় ব্লক নেই’ শুনেই সব সমস্যা শেষ ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ পরীক্ষা করে কারণ খুঁজতে হয়।
আবার হৃদ্পেশির প্রদাহসহ কিছু রোগ হার্ট অ্যাটাকের মতো উপসর্গ তৈরি করতে পারে। সেগুলোর চিকিৎসা আলাদা। রোগের প্রকৃত কারণ জানা তাই শুধু নাম দেওয়ার বিষয় নয়; সঠিক চিকিৎসা বেছে নেওয়ার পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশে এই অগ্রগতির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে প্রয়োজন দ্রুত রোগ শনাক্ত করার ব্যবস্থা, কার্যকর অ্যাম্বুলেন্স ও রেফারেল সেবা এবং সময়মতো বিশেষায়িত চিকিৎসা। রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে গিয়ে যেন মূল্যবান সময় হারাতে না হয়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, সফলভাবে রিং বসানোর পরও চিকিৎসা শেষ হয় না। নিয়মিত ওষুধ, ধূমপান বর্জন, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শে শরীরচর্চা প্রয়োজন। হৃদ্রোগের পর নিরাপদে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পরিকল্পিত সেবা বা কার্ডিয়াক পুনর্বাসনও গুরুত্বপূর্ণ।
রোগী ও পরিবারের সচেতনতাও জীবন বাঁচাতে পারে। হঠাৎ বুকে চাপ বা অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতা হলে বিষয়টিকে অবহেলা করা যাবে না। হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ সবার এক রকম হয় না। সন্দেহ হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন গবেষণা আমাদের শেখাচ্ছে, কখন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, কখন বাড়তি চিকিৎসা প্রয়োজন এবং কখন অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা এড়িয়ে চলতে হবে। এই অগ্রগতির কেন্দ্রে আছেন একজন মানুষ—তাঁর জীবন, তাঁর নিরাপত্তা এবং সুস্থ হয়ে ফিরে যাওয়ার আশা। সঠিক সময়ে তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করাই আধুনিক হৃদ্রোগ চিকিৎসার প্রধান দায়িত্ব।




