ঢাকা  শুক্রবার, ১৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআইন ও আদালতমামলার পাহাড়: কখন মিলবে ন্যায়বিচার

মামলার পাহাড়: কখন মিলবে ন্যায়বিচার

লিংকন দত্ত, বিশেষ সংবাদদাতা, চট্টগ্রাম: আদালতের বারান্দায় অপেক্ষা। হাতে মামলার নথি, চোখে দ্রুত নিষ্পত্তির প্রত্যাশা। শুনানির দিন আসে, কিন্তু অনেক সময় শুনানি শেষ হওয়ার আগেই সামনে আসে আরেকটি তারিখ। এভাবেই একটি মামলা পেরিয়ে যায় মাস, বছর—কখনো আরও দীর্ঘ সময়।

একটি মামলা তখন আর কেবল একটি মামলা থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় মানুষের অধিকার, সম্পত্তি, পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যবসা, স্বাধীনতা কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের আদালতে ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে অধস্তন আদালতেই রয়েছে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা। হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি এবং আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৭১৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল।

একটি দেওয়ানি মামলা দীর্ঘ হলে আটকে থাকতে পারে পরিবারের সম্পত্তি বা ব্যবসায়িক স্বার্থ। ফৌজদারি মামলা দীর্ঘ হলে বাদী ও আসামি উভয় পক্ষই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে পারেন। পারিবারিক বিরোধের দীর্ঘসূত্রতা প্রভাব ফেলতে পারে একটি পরিবারের জীবনেও।

অর্থাৎ, মামলাজটের প্রভাব শুধু আদালতকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ে নাগরিক জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও।

মামলাজটের পেছনে বিচারক সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২৬ সালের জুনে আইনমন্ত্রী সংসদে জানান, দেশে অনুমোদিত ২ হাজার ৬২০টি বিচারিক পদের মধ্যে ১ হাজার ৯৬৪টি পূরণ রয়েছে এবং ৬৫৬টি পদ শূন্য। শূন্য পদগুলো পূরণে পদোন্নতি, বদলি ও নতুন বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও তিনি জানান।

মামলা দায়ের থেকে তদন্ত, সমন জারি, সাক্ষ্যগ্রহণ, নথি উপস্থাপন, শুনানি, আদেশ ও রায়—বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের সঙ্গে সময় ও প্রশাসনিক সক্ষমতার প্রশ্ন জড়িত। কোনো একটি পর্যায়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো মামলার ওপর।

পক্ষগুলোর বক্তব্য শোনা, প্রমাণ মূল্যায়ন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ—এসব ন্যায়বিচারের মৌলিক অংশ। একই সঙ্গে অযৌক্তিক বিলম্বও বিচারপ্রার্থীর জন্য বড় সমস্যা।

২০২৬ সালের সংশোধিত ফৌজদারি কার্যবিধিতে SMS ও ভয়েস কলের মাধ্যমে সমন জারির সুযোগসহ কিছু প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। একই সঙ্গে আদালতের কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

২০২৬ সালে ২০ জেলার পাইলট কার্যক্রমে প্রি-কেস মেডিয়েশনের মাধ্যমে নতুন মামলা দায়েরের হার বিভিন্ন শ্রেণিতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই পাইলটে বিভিন্ন ধরনের মামলায় গড়ে নতুন মামলা দায়েরের হার ৬২.০২ শতাংশ কমেছে। জুলাইয়ে আরও ১০ জেলায় বাধ্যতামূলক প্রি-কেস মেডিয়েশন কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়।

তবে মেডিয়েশনের উদ্দেশ্য আদালতের বিচারিক ভূমিকা প্রতিস্থাপন করা নয়। যেসব বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে ন্যায়সংগতভাবে নিষ্পত্তি করা সম্ভব, সেগুলো মামলা হওয়ার আগেই সমাধানের সুযোগ পেলে আদালতের ওপর চাপ কমতে পারে।

একটি মামলার প্রতিটি তারিখের সঙ্গে যুক্ত থাকে যাতায়াতের খরচ, সময়ের ব্যয়, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং দীর্ঘ অপেক্ষার চাপ।

শূন্য বিচারিক পদ পূরণ, প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বিচারিক পদ সৃষ্টি, আদালতের অবকাঠামো ও সহায়ক জনবল বৃদ্ধি, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি কমানো এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে মেডিয়েশন ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়ানো—সবগুলো উদ্যোগকেই সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

একই সঙ্গে তদন্ত ও প্রসিকিউশন ব্যবস্থার সক্ষমতাও বাড়ানো জরুরি। কারণ একটি মামলার দ্রুত ও সুষ্ঠু নিষ্পত্তি শুধু আদালতের এজলাসের ওপর নির্ভর করে না; বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যকারিতার ওপরও তা নির্ভরশীল।

এখন সময় এসেছে আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও দ্রুততর করার। জনগণের অধিকার রক্ষায় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে এই উদ্যোগগুলোকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আদালতের কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার, বিচারক সংকট সমাধান এবং মামলাজট কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular