নিউজ ডেস্ক: অপরাধের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে জাতীয় পুনর্মিলন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। তাঁর মতে, বিচারহীন পুনর্মিলন প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না; বরং তা ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর শেষ দিনে ‘দ্য গ্র্যান্ড কনভারসেশন: জাস্টিস, অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনায় ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, পরিবর্তনকালীন ন্যায়বিচার এবং জাতীয় পুনর্মিলনের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
কায়সার কামাল বলেন, ট্রুথ কমিশনের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রথমে অপরাধ স্বীকার ও জবাবদিহির বিষয়টি আসে, এরপর পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া এগোয়। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এখনো অনুশোচনা প্রকাশ করা হয়নি এবং দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তাদের সঙ্গে পুনর্মিলনের সুযোগ নেই। তিনি অভিযোগ করেন, দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিচ্ছিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আবার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার জন্য দায়ীদের আইনি পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পুনর্মিলনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে সেই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। তাঁর ভাষায়, ন্যায়বিচার ছাড়া জাতীয় পুনর্মিলন শান্তি নয়, বরং সংঘাতের মধ্যবর্তী একটি বিরতি।
তিনি আরও বলেন, স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের ক্ষেত্রে সাবেক শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক অবশিষ্টাংশ বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তাই পরিবর্তনকালীন ন্যায়বিচার কেবল প্রতীকী পদক্ষেপ বা দ্রুত ঐক্যের আহ্বানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। দায়মুক্তির কাঠামোকে সুনির্দিষ্ট ও পদ্ধতিগতভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর একটি মৌলিক পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেন কায়সার কামাল। তাঁর দাবি, ওই সময় জনগণ এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, যা পক্ষপাত, পৃষ্ঠপোষকতা ও নাগরিক স্বাধীনতার ওপর আঘাতের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রাণহানির প্রসঙ্গ তুলে ডেপুটি স্পিকার জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনের উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং নিহতদের প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ শিশু ছিল। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে পৃথক হিসাবও রয়েছে।
কায়সার কামাল বলেন, বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য শুধু অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া নয়; ভবিষ্যতে যেন কেউ রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করে আবার কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার সাহস না পায়, সে জন্যও দৃষ্টান্ত তৈরি করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং জনগণের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।
অধিবেশনে অন্য আলোচকেরাও ন্যায়বিচার ও পুনর্মিলনের ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দেন। নেপালের গবেষক প্রমোদ জয়শওয়াল বলেন, জবাবদিহিকে প্রতিশোধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। তাঁর মতে, পুনর্মিলনের অর্থ অতীতের অন্যায় ভুলে যাওয়া নয়; বরং ঐতিহাসিক ক্ষত স্বীকার করে আস্থা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করা।-
তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’ আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। এতে দেশ-বিদেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, গবেষক, নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।




