নিউজ ডেস্ক: বহর আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ কিনছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর মধ্যে চারটি A350-900 ওয়াইডবডি এবং ছয়টি A321neo ন্যারোবডি উড়োজাহাজ রয়েছে।
৭ অক্টোবর ২০২৬ এ চুক্তিটি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বিমানের দীর্ঘমেয়াদি উড়োজাহাজ সংগ্রহের পাইপলাইন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫টিতে।
রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে ‘Spreading Our Wings Together’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিমানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমী এ হোসেন এবং এয়ারবাস ইন্ডিয়া ও সাউথ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুর্গেন ওয়েস্টারমেয়ার নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাতসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এয়ারবাসের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় বলা হয়েছে, নতুন উড়োজাহাজগুলো ঢাকাকে প্রধান হাব হিসেবে ব্যবহার করে বিমানের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার পাশাপাশি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে ভবিষ্যতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় এগুলো ব্যবহারের কথা রয়েছে।
চুক্তির চারটি A350-900 দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত। এয়ারবাসের তথ্য অনুযায়ী, A350-900 সর্বোচ্চ প্রায় ৯ হাজার ৭০০ নটিক্যাল মাইল বা ১৮ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিরতিহীন উড়তে পারে। এর নতুন প্রজন্মের ইঞ্জিন, হালকা উপকরণ ও উন্নত অ্যারোডাইনামিক নকশার কারণে আগের প্রজন্মের প্রতিদ্বন্দ্বী উড়োজাহাজের তুলনায় জ্বালানি ব্যবহার, পরিচালন ব্যয় ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে প্রায় ২৫ শতাংশ সুবিধা পাওয়ার দাবি করেছে এয়ারবাস।
অন্যদিকে ছয়টি A321neo মূলত আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহারের জন্য উপযোগী। এটি এয়ারবাসের A320neo পরিবারের সবচেয়ে বড় সদস্য। আগের প্রজন্মের উড়োজাহাজের তুলনায় A321neo-তে জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ অন্তত ২০ শতাংশ কম বলে জানিয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। ফলে নতুন উড়োজাহাজগুলো বিমানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্কে রুট পরিচালনায় আরও বেশি নমনীয়তা দেওয়ার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান রুমী এ হোসেন বলেন, প্রায় ২০ কোটি মানুষের বাংলাদেশ এবং প্রায় দেড় কোটি প্রবাসীর সঙ্গে দেশের বিস্তৃত আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ভবিষ্যতে বিমান চলাচলের চাহিদাকে সমর্থন করছে। এই বাস্তবতায় বিমানের বহর সম্প্রসারণকে তিনি একটি পরিমিত ও যৌক্তিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেন।
এয়ারবাসের কমার্শিয়াল এয়ারক্রাফট ব্যবসার নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট বেনোয়া দ্য সাঁ-এক্সুপেরি বলেন, A350 ও A321neo-র সমন্বয় বিমানের বহর আধুনিকায়ন ও নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সম্প্রসারণের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর মতে, উড়োজাহাজ দুটি বিমানকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, দূরপাল্লার সক্ষমতা ও রুট পরিচালনার নমনীয়তা দেবে।
এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজের চুক্তির আগে বিমান বোয়িংয়ের সঙ্গে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে ১৩টি Boeing 787-10, দুটি 787-9 এবং ১০টি 737 MAX 8। ফলে নতুন এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বিমানের দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রহের পাইপলাইনে মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ থাকবে—১৯টি ওয়াইডবডি এবং ১৬টি ন্যারোবডি।
বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। এয়ারবাসের নতুন চুক্তির ফলে দীর্ঘদিন ধরে মূলত বোয়িংনির্ভর থাকা বিমানের ভবিষ্যৎ জেট বহরে প্রথমবারের মতো এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত হবে। এতে বহর পরিচালনায় নতুন ধরনের উড়োজাহাজ, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন তৈরি হলেও একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণে বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিমান কর্তৃপক্ষের এই বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সক্ষমতা বাড়ানো। A350-900 দিয়ে দীর্ঘপাল্লার এবং A321neo দিয়ে আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুট পরিচালনার মাধ্যমে একই বহর থেকে ভিন্ন ধরনের বাজারের চাহিদা পূরণের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকায় নতুন রুট চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘপাল্লার A350-900 গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে নতুন উড়োজাহাজগুলো কবে নাগাদ বিমানের বহরে যুক্ত হবে, সে বিষয়ে এয়ারবাসের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সরবরাহ সময় নিয়ে ভিন্ন তথ্য এসেছে; তাই নিশ্চিত সময়সূচি হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট বছর উল্লেখ না করাই আপাতত নির্ভুল।-
সব মিলিয়ে এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজের চূড়ান্ত ক্রয়াদেশ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ। একই সঙ্গে বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ নিয়ে গঠিত ভবিষ্যৎ বহর বিমানকে দীর্ঘপাল্লা থেকে আঞ্চলিক রুট পর্যন্ত যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী সক্ষমতা ব্যবহারের নতুন সুযোগ দেবে।




