প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হালচাল দেখে মাঝে মাঝে আতঙ্কিত হই। চমকে উঠি।
একজন শিক্ষক, পাঁচ থেকে সাতটা সাবজেক্ট এ পাঠদান করেন, প্রশ্নপত্র তৈরি করেন এবং পরীক্ষা নেন , ভাইভা নেন, প্রায় সকলকেই পাশ নম্বর দেন।—এইভাবে সনদ হচ্ছে, লাইসেন্স হচ্ছে, সার্টিফিকেটধারী নার্স ও মিডওয়াইফ হচ্ছে, কিন্তু দক্ষ ,অভিজ্ঞ নার্স ও মিডওয়াইফ তৈরি হচ্ছে তো?
বেসরকারি নার্সিং শিক্ষায় ‘ফ্রেশার শিক্ষক’ নির্ভরতা, সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগে অনীহা ও মালিকপক্ষের চক্ষুশূল!
বাংলাদেশে নার্স ও মিডওয়াইফের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি দক্ষতা, ক্লিনিক্যাল সক্ষমতা ও রোগীর নিরাপত্তা।
দেশের বিভিন্ন নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে Diploma in Nursing, Diploma in Midwifery, B.Sc. in Nursing, Public Health Nursing, MSc Nursing এবং Caregiver-সহ একাধিক ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার বাস্তবতা রয়েছে। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানে একাধিক কারিকুলাম চললেও বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক, পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ এবং competency-based education কতটা নিশ্চিত হচ্ছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে যাচাই করার মতো একটি গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, কিছু বেসরকারি নার্সিং কলেজে সদ্য গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করা অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ নার্সদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। কারণ তাদের তুলনামূলক কম বেতনে নিয়োগ করা সম্ভব।
অন্যদিকে অভিজ্ঞ ও উচ্চশিক্ষিত নার্সিং শিক্ষক নিয়োগে অনেক প্রতিষ্ঠানের অনীহার অভিযোগ রয়েছে। কারণ একজন সিনিয়র শিক্ষককে তার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও উচ্চশিক্ষার মূল্য অনুযায়ী তুলনামূলক বেশি সম্মানী দিতে হবে।
ফলে তৈরি হচ্ছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি—যে শিক্ষক নিজেই মাত্র কিছুদিন আগে শিক্ষার্থী ছিলেন, তিনিই পরবর্তী প্রজন্মের নার্সিং শিক্ষার্থীদের শিক্ষক হয়ে যাচ্ছেন।
এখানে প্রশ্ন হলো, একজন নবীন গ্র্যাজুয়েট শিক্ষক কি প্রয়োজনীয় pedagogical training, clinical expertise এবং পর্যাপ্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন না করেই জটিল ক্লিনিক্যাল বিষয় পড়ানোর দায়িত্ব নিতে পারেন?
আরও উদ্বেগের বিষয়—এই ধরনের অনেক নবীন শিক্ষকই সরকারি চাকরির প্রত্যাশায় থাকেন। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ হলে তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যান। ফলে একটি নার্সিং কলেজে দীর্ঘমেয়াদি, অভিজ্ঞ ও career-based শিক্ষকদল তৈরি হয় না।
ফলাফল?
শিক্ষক পরিবর্তন হয়, কিন্তু শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতা থাকে না।
BNMC-এর নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের accreditation framework-এ শিক্ষক ও শিক্ষাদানের মান, clinical expertise এবং educator competency-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে শুধু শিক্ষক পদ পূরণ করলেই মানসম্মত নার্সিং শিক্ষা নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক এবং কার্যকর ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা।
আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো—কিছু প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ও পূর্ণকালীন Principal না থাকায় মালিকপক্ষ বা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেন।
যদি কোনো নার্সিং কলেজে একাডেমিক নেতৃত্বের জন্য যোগ্য ও স্থায়ী Principal না থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—শিক্ষার মান, শিক্ষক নিয়োগ, পরীক্ষা, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার্থীদের competency assessment-এর চূড়ান্ত জবাবদিহি কার কাছে?
শুধু তাই নয়, একই শিক্ষককে একাধিক বিষয়ে ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন, হল পরিদর্শন, লিখিত খাতা মূল্যায়ন এবং ভাইভা নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা অবশ্যই স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ নার্সিং শিক্ষা অন্য দশটি সাধারণ শিক্ষার মতো নয়।
একজন নার্সকে রোগীর vital signs পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে medication administration, infection prevention, emergency response, documentation এবং patient safety—সবকিছুর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকতে হয়।
সুতরাং প্রশ্নটি কেবল শিক্ষকের সংখ্যা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি “কে শেখাচ্ছেন এবং তিনি নিজে কতটা দক্ষ?”
আজ যদি একজন শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল দক্ষতা ছাড়া সনদ অর্জন করেন, কাল তিনি হাসপাতালে একজন রোগীর দায়িত্ব নেবেন। তখন ভুল ওষুধ, ভুল ডোজ, ভুল clinical decision কিংবা দুর্বল infection control-এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
তবে কোনো রোগীর মৃত্যু বা চিকিৎসা-জটিলতার জন্য সরাসরি নার্সকে দায়ী করা যায় না—প্রতিটি ঘটনা পৃথক clinical audit ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—ভুল হওয়ার আগেই দক্ষতা নিশ্চিত করা।
তাই এখন প্রয়োজন প্রতিটি নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে যাচাই করা—
কে শিক্ষক? তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা কী? সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁর বিশেষজ্ঞতা আছে কি? তাঁর clinical experience কত বছর? শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ আছে কি? কত ঘণ্টা ক্লাস নেন? কত ঘণ্টা clinical teaching করেন?
একই সঙ্গে যাচাই করা দরকার—প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত Principal আছেন কি না, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক আছেন কি না, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত কত, শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কত ঘণ্টা clinical practice করছে এবং পরীক্ষার মূল্যায়ন কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ।
বাংলাদেশে নার্সের সংখ্যা বাড়ানো দরকার—কিন্তু শুধু সংখ্যা নয়, দক্ষ নার্স দরকার।
কারণ হাসপাতালের বেডের পাশে দাঁড়ানো একজন নার্সের হাতে শুধু একটি ইনজেকশন বা ওষুধ থাকে না—থাকে একজন মানুষের জীবন।
**সনদ নয়—দক্ষতা চাই।
শিক্ষক নিয়োগ নয়—দক্ষ শিক্ষক চাই।
নার্সের সংখ্যা নয়—যোগ্য নার্স চাই।**
এখনই যদি নার্সিং শিক্ষার মান নিয়ে কঠোর, স্বচ্ছ ও স্বাধীন অডিট শুরু না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে—
“আমরা কি নার্স তৈরি করছি, নাকি শুধু সার্টিফিকেটধারী স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করছি?”




