ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশঢাকাতাসনিম সিরাজকে অব্যাহতি নিয়ে শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিবাদ

তাসনিম সিরাজকে অব্যাহতি নিয়ে শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিবাদ

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে পাঠদান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সংগঠনটি দাবি করেছে, শিক্ষক তাসনিম সিরাজ ‘রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, অপতথ্য ও বিদ্যায়তনিক পরাধীনতার’ শিকার। একই সঙ্গে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত, শিক্ষকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং শ্রেণিকক্ষে পরিচয় যাচাইসংক্রান্ত সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।

শনিবার (১০ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এসব দাবি জানায়। বিবৃতিতে তাসনিম সিরাজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর বক্তব্যও যথাযথভাবে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনটির মতে, শ্রেণিকক্ষের একটি ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে শিক্ষককে জনরোষের মুখে ফেলা হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব বক্তব্য সংগঠনটির দাবি; অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

পাঠদান থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত

গত ৭ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শেষ সেমিস্টারের একটি ক্লাসে নিকাব পরা এক শিক্ষার্থীকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই শিক্ষার্থীর পোশাক নিয়ে মন্তব্য করার সময় শিক্ষক তাঁকে ‘মৌলবাদী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং কয়েকজন ক্লাস বর্জন করেন।

পরদিন ৮ অক্টোবর বিভাগের জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় তাসনিম সিরাজ মাহবুবের পাঠদানের কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে।

ইংরেজি বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক তাজিন আজিজ চৌধুরী জানান, বিভাগ কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত পরিচালনা বা তাঁকে শাস্তিমূলকভাবে অব্যাহতি দেওয়ার এখতিয়ার রাখে না। তিনি আরও বলেন, অভিযোগে উল্লিখিত মন্তব্য বিভাগের মূল্যবোধ ও চর্চার প্রতিফলন নয়; সেটি শিক্ষকের ব্যক্তিগত বক্তব্য বলে বিভাগ মনে করে।

অন্যদিকে, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে জানান, বিভাগ সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। তবে অভিযোগের সব দিক চূড়ান্তভাবে যাচাইয়ের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষক নেটওয়ার্কের বক্তব্য ও দাবি

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক তাদের বিবৃতিতে তাসনিম সিরাজকে দীর্ঘদিন ধরে একটি ঘৃণাবাদী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে। সংগঠনটির ভাষ্য, তাঁকে চাপে ফেলে মাথা নত করানোর উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংগঠনটি পাঠদান থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্তকে ‘বিধিবহির্ভূত’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছে, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষককে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন ও আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়াও জরুরি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শিক্ষার্থীর মানসিক যন্ত্রণা বা অপমানবোধের কারণ হতে পারে—এমন আচরণ সমর্থন করে না সংগঠনটি। তবে তাদের মতে, কোনো শ্রেণিকক্ষের ঘটনা নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা যাচাইয়ের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খণ্ডিত বক্তব্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানোও গ্রহণযোগ্য নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির ও ছাত্রী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে সংগঠনটি অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ পেয়েছে এবং এর পেছনে পূর্বপরিকল্পনা থাকতে পারে। এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

পরিচয় যাচাইয়ে নীতিমালা প্রণয়নের দাবি

শিক্ষক নেটওয়ার্কের অন্যতম দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যক্তিগত পোশাকের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মুখমণ্ডল বা চোখ দৃশ্যমান রাখার প্রয়োজনীয়তা কোন পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য হবে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিতে স্পষ্ট করা দরকার বলে মনে করে সংগঠনটি।

এ ছাড়া অনুমতি ছাড়া শিক্ষকের বক্তব্য ধারণ এবং তা খণ্ডিতভাবে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে তারা। এমন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর উদারপন্থী শিক্ষকদের হেনস্তার অভিযোগ তুলে অন্য একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতির ঘটনার সঙ্গেও তুলনা করেছে সংগঠনটি। তবে এসব অভিযোগ ও তুলনা সংগঠনটির নিজস্ব মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচ্য।

শিক্ষকের বক্তব্য: ‘নিকাব খুলতে বলিনি’

তাসনিম সিরাজ মাহবুব গণমাধ্যমে পাঠানো নিজের বিবৃতিতে বলেন, ৭ অক্টোবর মাস্টার্সের শেষ সেমিস্টারের ক্লাসে দরজার পাশে তিন শিক্ষার্থী বসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজনের চোখসহ পুরো মুখমণ্ডল ঢাকা থাকায় তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে এবং চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করতে অসুবিধা হচ্ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীর বক্তব্য গ্রহণের ধরন ও শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বোঝার ক্ষেত্রে যোগাযোগের এই সীমাবদ্ধতা তাঁর জন্য অস্বস্তিকর ছিল। সেই বিষয়টি নিয়েই তিনি কথা বলেন। তাঁর দাবি, পুরো আলোচনায় শিক্ষার্থীর পোশাক পরিবর্তন, নিকাব খোলা কিংবা শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করার নির্দেশ দেননি তিনি।

তাসনিম সিরাজ আরও বলেন, ওই শিক্ষার্থীর পক্ষে কথা বলা আরেক ছাত্রীর সঙ্গে পোশাকের স্বাধীনতা, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থী ক্লাস ছেড়ে যাওয়ার পর সহপাঠীদের কাছ থেকে জানতে পারেন, তাঁর কথায় ওই শিক্ষার্থী কষ্ট পেয়ে থাকতে পারেন। পরে কয়েকবার সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করলেও দেখা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

নিজের বক্তব্যের অংশবিশেষ প্রচার করে প্রেক্ষাপট বিকৃত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তাসনিম সিরাজ। তাঁর দাবি, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর বক্তব্য না শুনেই সব কোর্স অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন তিনি।

ঘটনার পর বেনামি ফোন, ইমেইল, আপত্তিকর বার্তা ও হুমকি পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন এই শিক্ষক। এতে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অভিযোগ যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের গুরুত্ব

ঘটনাটি নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষক নেটওয়ার্কের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের মধ্যে আপত্তিকর মন্তব্যের বিষয়টি রয়েছে; অন্যদিকে তাসনিম সিরাজ বলেছেন, তাঁর বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল শ্রেণিকক্ষে পরিচয় শনাক্তকরণ ও যোগাযোগের অসুবিধা তুলে ধরা। বিভাগ শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে পাঠদানের কোর্স পুনর্বণ্টন করেছে, আর শিক্ষক নেটওয়ার্ক সিদ্ধান্তটির প্রক্রিয়া ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রকাশিত সংবাদে শিক্ষার্থী ও তাঁর এক বন্ধুর বক্তব্যসংবলিত একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর সব দিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

এ অবস্থায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ, শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে বিবেচনা এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য শোনার সুযোগ নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পরিচয় যাচাই, পোশাকের স্বাধীনতা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক সম্মান রক্ষায় স্পষ্ট নীতিমালা থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিরোধ মোকাবিলা সহজ হতে পারে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular