কক্সবাজার প্রতিবেদক: রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের সার্বিক পরিস্থিতি, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম, শিক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং মিয়ানমারে টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয় সরেজমিনে দেখতে কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য জাহরাত আদিব চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি রোহাং হেরিটেজ সেন্টার, তুর্কি ফিল্ড হাসপাতাল ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) খাদ্য বিতরণকেন্দ্র পরিদর্শন করে। এ সময় রোহিঙ্গা কমিউনিটির প্রতিনিধি, যুবক ও নারীদের সঙ্গে প্রত্যাবাসন, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিয়ে মতবিনিময় করেন তারা।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উখিয়ার ৬ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৌঁছে প্রতিনিধিদলটি রোহাং হেরিটেজ সেন্টার পরিদর্শন করে। সেখানে সংরক্ষিত রোহিঙ্গাদের পুরোনো পরিচয়পত্র, ঐতিহাসিক ছবি, সাংস্কৃতিক নিদর্শন এবং দুই শতাধিক দুর্লভ দলিল ঘুরে দেখেন তাঁরা। এসব নিদর্শনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা নেন কমিটির সদস্যরা।
এ সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁদের ইতিহাস তুলে ধরার গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা হয়।

পরে প্রতিনিধিদলটি ৯ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে তুর্কি ফিল্ড হাসপাতাল এবং ৪ নম্বর আশ্রয়শিবিরে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পরিচালিত খাদ্য বিতরণকেন্দ্র পরিদর্শন করে। এসব প্রতিষ্ঠানে রোহিঙ্গাদের জন্য পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্যসহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হন তাঁরা।
এরপর ৪ নম্বর আশ্রয়শিবিরের ক্যাম্প ইনচার্জের (সিআইসি) কার্যালয়ে রোহিঙ্গা যুবক ও নারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। এ সময় শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, নিরাপদ বসবাস, নারী ও শিশুর সুরক্ষা এবং ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় উঠে আসে। দুপুর ১টার দিকে প্রতিনিধিদলটি কক্সবাজারের উদ্দেশে ক্যাম্প ত্যাগ করে।
প্রতিনিধিদলে কমিটির সভাপতি জাহরাত আদিব চৌধুরী ছাড়াও সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারী, সৈয়দ আল নোমান, সানজিদা ইসলাম ও মীর আহমদ বিন কাসেম ছিলেন।
এ ছাড়া কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. তৌফিক-উর-রহমান, কমিটি সচিব ও উপসচিব মো. আলী আশরাফ, জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মোহাম্মদ আবদুল মুনিম, সহকারী পরিচালক ফারজানা আক্তার এবং সভাপতির ব্যক্তিগত সহকারী দেওয়ান উসামা নিজাম চৌধুরী কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রোহিঙ্গা সিভিল সোসাইটি সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার (ইউআরসি) নেতা মৌলভী সাইদ উল্লাহ।
তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।”
ক্যাম্পে নিরাপত্তা জোরদার, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধ ও ভুল-বোঝাবুঝি নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ রফিক।
তিনি বলেন, “ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, নিরাপদ বসবাস এবং রোহিঙ্গাদের জন্য কর্মমুখী প্রকল্প চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিদ্যমান বিরোধ ও ভুল-বোঝাবুঝি নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং ক্যাম্পে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
রোহিঙ্গা নারী নেত্রী সাজিদা বেগম নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার সুযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষার সুযোগ এবং মৌলিক চাহিদা পূরণে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা নারীদের মতামত ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।”
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছে। তাঁরা রোহিঙ্গা কমিউনিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে টেকসই প্রত্যাবাসন, মানবিক সহায়তা এবং রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি, তাঁদের প্রয়োজন এবং আশ্রয়শিবিরে পরিচালিত মানবিক কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিনিধিদল সরেজমিনে জানার সুযোগ পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি, আশ্রয়শিবিরে শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ এবং নারী ও শিশুদের বিশেষ চাহিদা পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।




