নিউজ ডেস্ক: শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দেশের শিক্ষার গুণগত মান যাচাইয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘বছরভিত্তিক মূল্যায়ন’ পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। শুধু পরীক্ষায় পাসের হারকে সাফল্যের মাপকাঠি না ধরে শিক্ষার্থীর প্রকৃত শিখনফল, গণিত-বিজ্ঞানসহ মৌলিক বিষয়ে দক্ষতা এবং ধারাবাহিক অগ্রগতি পরিমাপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি।
গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণীর এসব তথ্য জানানো হয়। কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেন, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন ও আধুনিক শিক্ষাক্রম প্রয়োজন। তাঁর মতে, বছরে একবারের পরিবর্তে তিন বা ছয় মাস অন্তর শিখনফল মূল্যায়নের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা উচিত।
বৈঠকে সদস্য রেজা কিবরিয়া গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরির ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার মডেলের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা-ভাবনা প্রণয়নের প্রস্তাব আসে, যাতে সরকার বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মৌলিক কাঠামো বারবার বদলে না যায়।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের প্রস্তাবিত বাজেট ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা আগের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। মেধা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারী শিক্ষার প্রসার ও ঝরে পড়া ঠেকাতে ৭০ লাখ ছাত্রীকে ৪ হাজার কোটি টাকার বৃত্তির আওতায় আনার কথাও কার্যবিবরণীতে রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের পাওনা পরিশোধেও নতুন উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। ইএফটি ও আইবাস++ ব্যবস্থায় প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রাথমিক ধাপে গড়ে প্রত্যেককে পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা রয়েছে। কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধার সংকট নিরসনে ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক সহায়তার বিষয়ও বৈঠকে উঠে আসে।
কমিটি এমপিওভুক্তির সব শর্ত পূরণকারী নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিন বিনা বেতনে কাজ করা প্রবীণ শিক্ষকদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে এমপিওভুক্তির সুপারিশ করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ফাইলের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ জানতে গবেষণা পরিচালনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি। ঝরে পড়া বা শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে এবং বর্তমানে কী করছে, তা অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়েছে।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তা পর্যায়ক্রমে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
শিক্ষার মান ও বরাদ্দের অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণে সংসদ সদস্যদের সরেজমিনে স্কুল-কলেজ পরিদর্শন, পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাবোর্ড ও অধীন দপ্তরের প্রধানদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং হজযাত্রী ও দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া দ্রুত পরিশোধে আলাদা তালিকা তৈরিসহ সাত দফা সুপারিশ করেছে কমিটি।
এ ছাড়া শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা, অনিয়ম-দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বাড়ানোর বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। কমিটির সদস্যরা মনে করেন, কেবল নতুন পাঠ্যক্রম বা পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করলেই পরিবর্তন আসবে না; শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান, শিক্ষক দক্ষতা, পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। ভবিষ্যৎ বৈঠকে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে আরও দফাভিত্তিক সুপারিশ দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন সভাপতি।-
কমিটির লক্ষ্য, পাসের হারের সংখ্যাগত প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এমন একটি মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করা, যেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে। তবে এসব বিষয় এখন সংসদীয় কমিটির সুপারিশ ও উদ্যোগের পর্যায়ে রয়েছে; ‘বছরভিত্তিক মূল্যায়ন’ দেশজুড়ে কার্যকর করার চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে এখনো ঘোষণা করা হয়নি। সূত্র: বাসস




