ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeশিক্ষাবৈষম্যের কালোমেঘ

বৈষম্যের কালোমেঘ

মাহমুদ মীর

১.

[কবিতাটি মুক্তক গদ্যছন্দে লেখা]

বৈষম‍্য-কালোমেঘ খেলা করে ‘কাজল-আকাশে’
তবু নরম গোধূলি আলো পড়ে শস্য ফসলে
সম্মিলিত মানুষ ধোঁয়াশায় দ্বিধান্বিত
কেউ ভুলে যায় তাঁদের আদর্শ
কেউ কেউ বরাবর ভুলের রাজ্যে
রাজার আসনে থেকে ফসল লুটেছে।
চাটুকার আর লুটেরার মৌচাকের
উৎস যখন স্বৈরাচার তখনও
না খাওয়া মানুষের দেশে
কোটিপতি ছিলো অগণন।

একদিন বিদেশের মোহ ছেড়ে থেকে গেছি দেশে
ভেবেছি থাকবো কুঁড়েঘরে,
যাবো শ্রমিকের নোংরা বস্তি
ক্ষেতমজুর, কৃষক সব আমার স্বজন,
আত্মার আত্মীয়।
ভালোই চলছিলো সব।

লোভী মানুষের উম্মাদনা এতটা বিপুল হতে পারে
আমার বিশতম জন্মসনে যখন দেখলাম আমি
নিজ কাঁধে নিলাম অনেক দায়িত্ব।
কেউ খুশি, কেউ বা বেজার।
সম্মিলিত মানব সচলায়তনের রোডম্যাপ
এঁকেছি ফেলে দেওয়া সিগারেটের প্যাকেটে।
সরকার বদলাতে শুধু নয়, সংস্কৃতি বদলাতে
নিষ্ঠাবান লড়াই গড়ে তুলতে চেয়েছি।
অনেক সফল অতীত হারিয়ে দিল
দালাল, অযোগ্য কয়েকজন নেতা।
লুট হলো কঠিন প্রতিজ্ঞায় টানটান
স্পর্ধিত মানুষের মুখ।

বিপন্ন একাত্তর, বিষণ্ণ বীরাঙ্গনা,
প্রশ্নবিদ্ধ শ্রেষ্ঠ বীরেরা, নিজ দেশে অপরাধী
সব মুক্তিযোদ্ধা আর সংগ্রামী মানুষ
হ্যামিলনের বাঁশিতে উচ্ছ্বসিত
উদভ্রান্ত সরল মানুষের উত্থানে।

নতুন করে জাগো
সমস্যা সমাধানে

শোষণের অবসান হবে
ভরে যাবে সবুজ আঙ্গিনা।

২.
[কবিতাটি স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা]
বৈষম্যেরই কালো মেঘে কাজল আকাশ ঢাকলো রে,
নরম আলোর গোধূলিটা ফসল বুকে জাগলো হে। 
মানুষেরা ধোঁয়াশাতে আজকে দ্বিধায় ভুগছে যে, 
আদর্শ সব জলাঞ্জলি দিচ্ছে তারা বুঝছে কে? নৌ
ভুলের রাজ্যে রাজা সেজে লুটলো ফসল কেউ কেউ,
চাটুকার আর লুটেরাদের মৌচাকে আজ জাগলো ঢেউ। 
স্বৈরাচারের উৎস থেকে জমলো তাদের টাকার পাহাড়,
না-খাওয়া এই গরীব দেশে কোটিপতির নেইকো আহার! 
বিদেশ যাওয়ার মোহ ছেড়ে এদেশেই তো থিতু হলাম,
কুঁড়েঘরে থাকবো বলে শ্রমিক পাড়ায় হাত বাড়ালাম।
কৃষক এবং ক্ষেতমজুরের আপন মানুষ ভাবলাম মনে,
লোভী লোকের উন্মাদনা বিশ বছরে দেখলাম চোখে।
কাঁধে নিলাম দায়িত্ব যে কেউ খুশি বা কেউ বেজার,
রোডম্যাপটি এঁকেছিলাম মানব সেবার সচলতার।
সিগারেটের প্যাকেটে সেই নকশা আঁকা স্বপ্ন ছিল,
সংস্কৃতির বদল চেয়ে নিষ্ঠা লড়াই ডাক দিয়েছিল।
অতীত সফল হারিয়ে দিল দালাল এবং অযোগ্যরা,
লুট করে নেয় স্পর্ধিত মুখ কঠিন পণে আজকে যারা।
বিপন্ন আজ একাত্তর বীরাঙ্গনা বিষণ্ণ যে,
শ্রেষ্ঠ বীরের প্রশ্ন তুলে অপরাধী আজ বলছে কে?
হ্যামিলনের বাঁশির সুরে সরল মানুষ উদভ্রান্ত,
নতুন করে জাগতে হবে হতে হবে দিকভ্রান্ত?
শোষণেরই অবসান আজ আনবো মোরা ঠিক জানি,
সবুজ সুখে ভরে দেবো ঘরের আঙিন এই বাণী।

ছন্দের মাত্রা বিশ্লেষণ (উদাহরণস্বরূপ প্রথম দুটি লাইন)
    • বৈ-ষ-ম্যে-রই (৪) / কা-লো মে-ঘে (৪) / কা-জল আ-কাশ (৪) / ঢাক-লো রে (৩)
    • ন-রম আ-লোর (৪) / গো-ধূ-লি-টা (৪) / ফ-সল বু-কে (৪) / জাগ-লো রে (৩)

৩. [কবিতাটি স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত]
বৈষম্যেরই কালো মেঘে ‘কাজল-আকাশ’ কালো,
তবুও ফোটে নরম মধুর গোধূলি বেলার আলো।
শস্য-ফসল ফলিয়ে মাঠে খাটে যে জন সদা, 
ধোঁয়াশাতে ভুগছে তারা দ্বিধায় পড়ে বৃথা। 
কেউ ভুলে যায় নিজের আদর্শ ক্ষণিকেরই মোহে, 
ভুলের রাজ্যে রাজা সেজে ফসল লুটে দোহে।
চাটুকার আর লুটেরাদের মৌচাকেরই মূলে, 
স্বৈরাচারী শক্তি বসা শাসন-আসন তুলে।
না-খাওয়া এই ভুখার দেশেও কোটিপতির মেলা,
বিদেশেরই মোহ তাড়িয়ে দেশে ফেরার বেলা।
ভেবেছিলাম থাকবো কুঁড়ে শ্রমিক-বস্তি মাঝে, 
কৃষক-মজুর আপন আমার জুড়বে মনের কাজে। 
ভালোই তো সব চলছিল আর কাটছিল দিন সুখে,
লোভী লোকের উন্মাদনা নামলো হঠাৎ বুকে! 
বিশের কোঠায় বয়স যখন ধরলো আমার পাড়া, 
কাঁধে নিলাম দায়িত্ব যে জীবন দিতে সাড়া।
কেউ হলো যে খুশি এতেই কেউ বা হলো চটা,
রোডম্যাপটি এঁকেছিলাম আজকে বলি সেটা— 
ফেলে দেওয়া সিগারেটের কাগজের ওই পিঠে,
স্বপ্ন ছিল মানুষের এই মেলবে ডানা ভিটে।
 
সরকারটা বদলাতে নয় সংস্কৃতি পাল্টাতে, 
নিষ্ঠা নিয়ে লড়াই করি জয়ের আশা জ্বাল্টাতে।
অতীত সফল হারিয়ে দিল দালাল আর ওই লোভী,
অযোগ্য সব নেতার পাপে মলিন দেশের ছবি।
লুট হয়ে যায় কঠিন শপথ স্পর্ধিত সেই মুখ, 
বিপন্ন আজ একাত্তর আর বিষণ্ণ মার বুক।
প্রশ্নবিদ্ধ শ্রেষ্ঠ বীরেরা অপরাধীর বেশে, 
মুক্তিসেনা সংগ্রামীরা বন্দী নিজের দেশে। 
হ্যামিলনের বাঁশির সুরে মাতাল হয়ে ছোটে, 
উদ্ভ্রান্ত আর সরল মানুষ জাগলো মাঠে ঘাটে। 
নতুন করে জাগো এবার মেটাও সব জটা,
শোষণ ভুলে সবুজ হবে দেশের আঙিনাটা। 

ছন্দের বিশ্লেষণ (উদাহরণস্বরূপ প্রথম দুটি লাইন):
    •  বৈ ষম মে রি  (৪) / কা-লো  মে ঘে (৪) / কা-জ-ল আ-কাশ (৪) / কা-লো (২)
    • ত-বু-ও ফো-টে (৪) / ন-র-ম ম-ধুর (৪) / গো-ধূ-লি বে-লার (৪) / আ-লো (২)

এখানে দ্রুত লয়ে আবৃত্তি করলে প্রতিটি চার মাত্রার পর্বে একটি চমৎকার ছন্দোময় দোলা (Rhythm) পাওয়া যাবে।
৪. [কবিতাটি ৮+৬ = ১৪ মাত্রার ক্ল্যাসিক অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা]
বৈষম্যের কালো মেঘে ‘কাজল-আকাশ’,
নরম গোধূলি আলো ছড়ায় বাতাস।
শস্য-ফসল চিরে মানুষ যে আজ, 
ধোঁয়াশায় ঘোরে শুধু ভুলে সব কাজ। 
আদর্শ ভুলে যায় কোনো কোনো জন,
ভুলের রাজ্যে তারা / রাজা অনুক্ষণ। 
লুটেরা শোষক মিলে / গড়ে মৌচাক,
স্বৈরাচারী ক্ষমতার / দিয়ে যায় ডাক।
ক্ষুধার্ত মানুষের / এ চেনা স্বদেশে,
কোটিপতি বাড়ে কত / শোষণের শেষে।
বিদেশের মোহ ছেড়ে / এ দেশের টানে,
থেকে গেছি কুঁড়েঘরে / মানুষের গানে। 
ক্ষেতমজুর চাষী আর / শ্রমিকের দল, 
তারাই আপন মোর / আত্মার সম্বল। 
ভালোই তো চলছিল / জীবনের পথ, 
লোভী মানুষেরা তবে / নামাল বিপদ।
বিশতম জন্মসনে / দেখে এই রূপ, 
কাঁধে নিই দায়িত্ব / না থেকে তো চুপ।
কারো মুখে হাসি ফোটে / কেউবা বেজার,
সিগারেট প্যাকেটে যে / নকশা আমার।
একেছি যে রোডম্যাপ / সচল সমাজ, 
সংস্কৃতি বদলাব / এই আমাদের কাজ।
নিষ্ঠার লড়াইয়ে তো / ভাঙবে আঁধার, 
দালালেরা কেড়ে নেয় / জয় বারবার। 
অযোগ্য নেতার পাপে / ইতিহাস হারে,
লুট হয় মানুষের / স্পর্ধা এপারে। 
বিপন্ন একাত্তর / বীরাঙ্গনা কাঁদে, 
শ্রেষ্ঠ বীরেরা আজ / অপবাদের ফাঁদে। 
মুক্তিযোদ্ধারা আজ / অপরাধী বেশে, 
উচ্ছ্বাসে মাতে লোক / হ্যামিলন দেশে।
উদভ্রান্ত মানুষের / জাগরণ দেখে,
সমস্যা মেটাতে হবে / চেতনাকে রেখে। 
শোষণের অবসান / হবে এই বারে, 
সবুজ আঙিনা হবে / ফসলের ধারে।

ছন্দ বিশ্লেষণ (উদাহরণ স্বরূপ প্রথম দুই লাইন):
বৈষম্যের কালো মেঘে (৮) / কাজল আকাশ (৬)
নরম গোধূলি আলো (৮) / ছড়ায় বাতাস (৬)

  • বৈষ্-মণ্যের্ (৪) কা-লো (২) মে-ঘে (২) = ৮ মাত্রা (এখানে ‘বৈষ্’ শব্দের শুরুতে থাকায় ১ মাত্রা, কিন্তু ‘মণ্যের্’ শব্দের শেষে থাকায় এটি ২ মাত্রা হিসেবে গোনা হয়েছে: বৈষ্[১] + ম [১] + ন্যের্[২] = ৪ মাত্রা)
  • কা-জল্ (২+১=৩) আ-কাশ্ (২+১=৩) = ৬ মাত্রা (‘জল্’ এবং ‘কাশ্’ শব্দের শেষে থাকায় ২ মাত্রা করে পেয়েছে)।
RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular