অভিযোগগুলোর কেন্দ্রে রয়েছেন ইউএনও রিদুয়ানুল ইসলাম ও সার্টিফিকেট সহকারী মো. রাশেদ। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, প্রশাসনিক দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করে রাশেদকে দিয়ে প্রকল্পের অর্থসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করানো হচ্ছে।
উপজেলা পর্যায়ের একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্প এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের বরাদ্দ থেকে ঠিকাদারদের বিলের বিপরীতে ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
উপজেলার একাধিক ঠিকাদারের দাবি, রাশেদকে কমিশন দেওয়ার পরই ইউএনওর স্বাক্ষরে চেক ছাড়ের প্রক্রিয়া এগোয়। এ বিষয়ে তাঁরা স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামকেও জানিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে কতটি প্রকল্পে অর্থ লেনদেন হয়েছে, কোন কোন ঠিকাদার কত টাকা দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিতে কী রয়েছে—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইউএনও কার্যালয়ের কনফিডেনশিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট (সিএ) দীপু চাকমা অবসরে যাওয়ার পর তাঁর শূন্য পদে প্রশাসনিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্ধারণ থাকলেও তার পরিবর্তে সার্টিফিকেট সহকারী মো. রাশেদকে দিয়ে সিএর কাজ করানো হচ্ছে। অন্যদিকে সরকার ইউএনও কার্যালয়ে উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে শিখা সিংহকে নিয়োগ দিলেও তাঁকে তাঁর পদ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে সাবেক ইউএনও সজীব কান্তি রুদ্র শিখা সিংহকে উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাশেদকে দিয়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়ায় উপজেলা প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাঁর আচরণ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সুজন কান্তি দাশ এবং কর্ণফুলীতে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পটিয়া উপজেলা প্রকৌশলী তন্ময় নাথের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও কোন প্রকল্পের অর্থে কাজটি হচ্ছে, সে সম্পর্কে তাঁরা স্পষ্ট তথ্য দিতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদককে জানানো হয়েছে।
সরকারি আবাসনের উন্নয়নকাজ কোন বরাদ্দে, কত টাকার কার্যাদেশে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে—তা পরিষ্কার থাকা জরুরি। কাজটির অর্থের উৎস, অনুমোদন, ব্যয় বিবরণী ও কার্যাদেশ যাচাই করা হলে অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা জানা সম্ভব হবে। উপজেলা পর্যায়ে সংসদ সদস্যদের জন্য কক্ষ বরাদ্দ ও তা সজ্জিত করার উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্রের দাবি, সংসদ সদস্যের কক্ষের জন্য আসবাবপত্র সরবরাহের প্রায় ছয় লাখ টাকার কাজ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের এক নেতাকে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক এসএম মামুন মিয়া এবং সদস্যসচিব হাজী মো. ওসমানকে অবহিত করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা। তাঁরা বিষয়টি সংসদ সদস্য ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাদের কাছে উত্থাপন করবেন বলেও জানিয়েছেন।
আরও অভিযোগ উঠেছে, আসবাবপত্র কেনা বা সরবরাহের কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ছাত্রদল নেতাকে প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের জন্য প্রকৌশল কার্যালয়ে চাপ সৃষ্টি করছেন ইউএনও। তবে কার্যাদেশ, সরবরাহের শর্ত, কাজের অগ্রগতি ও বিলসংক্রান্ত নথি যাচাই করতে অনেকে দুদকের দৃষ্টি প্রত্যাশা করেন। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কাজের বাস্তব অগ্রগতি, পণ্য সরবরাহের প্রমাণ, বিধি অনুযায়ী বিল যাচাই এবং অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
কর্ণফুলী উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের স্থায়ী উপজেলা প্রকৌশলী না থাকায় পটিয়া উপজেলা প্রকৌশলী তন্ময় নাথ অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশাসনিক এ পরিস্থিতিতে প্রকল্প বণ্টন, বাস্তবায়ন ও তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উপজেলার এক সহকারী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ইউএনওর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প বণ্টন ও দ্রুত চেক ছাড়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম হচ্ছে। তাঁর দাবি, আরএফকিউ ও পিআইসি পদ্ধতির প্রকল্প নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। তবে কোন প্রকল্পে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট নথি ও প্রকল্পভিত্তিক হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান না থাকা এবং কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি ও তদারকির ঘাটতি তৈরি হয়েছে কি না, সেটিও পর্যালোচনার দাবি রাখে। তবে প্রশাসনিক শূন্যতা কোনোভাবেই সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও নিয়মনীতি অনুসরণের বিকল্প হতে পারে না। কর্ণফুলীতে যোগদানের পর থেকেই ইউএনও রিদুয়ানুল ইসলামকে ঘিরে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা চলছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র। এর আগে তিনি রাউজান উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অতীত ভূমিকা ও বর্তমান পদায়ন নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে।
গত ১৮ জুন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মোতাহার হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে তাঁকে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাউজানে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন রিদুয়ানুল ইসলাম। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, জমি-জমা, খাসজমি বন্দোবস্ত, পাহাড় কাটা ও জলাশয় ভরাটসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের হয়রানি এবং প্রশাসনিক কাজে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ।নতবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রশাসনিক নথি ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় রাউজানের সাবেক ইউএনও অং যাই মারমার নামের পর রিদুয়ানুল ইসলামের নাম ছিল। এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি গোপন তালিকায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠা ৭৮ কর্মকর্তার মধ্যে রিদুওয়ানুল ইসলাম এর নাম থাকার দাবিও করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাউজানে দায়িত্ব পালনকালে রিদুয়ানুল ইসলাম ও তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুস সামাদ সিকদারের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা ছিল। ২০২৩ সালের ৫ জুন প্রয়াত এ বি এম ফজলে রাব্বী চৌধুরীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গহিরা বঙ আলী চৌধুরী জামে মসজিদে আয়োজিত খতমে কোরআন, দোয়া মাহফিল ও পুষ্পমাল্য অর্পণের কর্মসূচিতে তাঁদের অংশগ্রহণের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সরকার পরিবর্তনের পর রিদুয়ানুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের একান্ত সচিব এবং সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে গোপনীয় শাখা, সংস্থাপন ও হিসাব শাখার দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা গেছে। বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে বদলি-পদায়ন, নিয়োগ এবং সার্ভেয়ার ও তহসিলদার বদলিতে প্রভাব খাটানো ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।
কর্ণফুলীতে সরকারি প্রকল্পের অর্থ ছাড়, ঠিকাদারদের বিল, কমিশন আদায়ের অভিযোগ, আবাসিক কোয়ার্টারে বালু ভরাট এবং সংসদ সদস্যের কক্ষের আসবাব কেনার বিষয়গুলো পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পের কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, চেক ছাড়ের নথি, বরাদ্দের হিসাব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পরীক্ষা করা জরুরি।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবস্থানও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘আমি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দীনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ইউএনও মো. রিদুয়ানুল ইসলাম ও সার্টিফিকেট সহকারী মো. রাশেদ সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর ফোন লাইন বিছিন্ন করেন। কিছুতেই মন্তব্য দিতে রাজি হননি।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, ‘আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়নের (আইপিইউ) ১৫৩তম অ্যাসেম্বলিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে দেশের বাইরে ছিলাম। তাই কর্ণফুলীর খোঁজখবর নিতে পারিনি। আমি এসেছি মাত্র, খোঁজখবর নেব।’




