নাজমুল হোসেন, বিশেষ সংবাদদাতা : এক সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত লক্ষ্মীপুরের রায়পুর হ্যাচারিটি এখন চরম অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও নানা সংকটে ধুঁকছে। ৫৪ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটিতে জনবল সংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং অবকাঠামোগত দুরবস্থার কারণে ব্যাহত হচ্ছে মাছের রেণু ও পোনা উৎপাদন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মৎস্যচাষিরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, হ্যাচারির ভেতরে বর্তমানে ২১টি পুকুর সংস্কার ও অভ্যন্তরীণ রাস্তা উন্নয়নের কাজ চলছে। প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে পরিচালিত এই সংস্কার কার্যক্রমে অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদার নিম্নমানের কংকর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করছেন। তবে ঠিকাদার মো. জিয়ারুল হক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
হ্যাচারি সূত্রে জানা গেছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়টি মাছের রেণু ও পোনা উৎপাদনের প্রধান মৌসুম। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় চাষিদের চাহিদার ৩০ শতাংশও পূরণ করা যাচ্ছে না। অথচ সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই হ্যাচারি দেশের মাছ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।
ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৭৯ সালে, চাঁদপুর সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায়। ১৯৮১ সালে কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর উন্নত মানের রেণু ও পোনা উৎপাদনের জন্য এটি সারা দেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। তবে দুই দশক পেরোতেই নানা সংকট দেখা দেয়।
বর্তমানে ৮৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন। গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ অধিকাংশ পদ শূন্য রয়েছে। ফিশারম্যান ও হ্যাচারি গার্ডের মতো মাঠপর্যায়ের কর্মীরও তীব্র সংকট রয়েছে। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত সাতটি আবাসিক ভবনের মধ্যে চারটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
অবকাঠামোগত দুরবস্থাও প্রকট। ৬৯টি পুকুরের মধ্যে ৩০টি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে আছে। অনেক পুকুরের পাড় ভেঙে গেছে, কিছু পুকুর পরিণত হয়েছে খেলার মাঠে। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে গভীর নলকূপ চালানো যাচ্ছে না, ফলে পানি সংকট দেখা দিয়েছে। পানির অভাবে চলতি বছর প্রায় দুই শতাধিক মা মাছ মারা গেছে।
এ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে পাশের ডাকাতিয়া নদী-র দূষিত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যার ফলে রেণুর গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, বেসরকারি হ্যাচারির পোনার মান নিয়ে সংশয় থাকায় সরকারি হ্যাচারির ওপর নির্ভরতা বেশি। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রায়পুর মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রের উপপরিচালক অজিত কুমার পাল বলেন, একসময় এটি এশিয়ার বৃহত্তম হ্যাচারি ছিল। কিন্তু বর্তমানে জনবলসহ নানা সংকটে এটি জর্জরিত। তিনি জানান, বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা গেলে উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
সংস্কার কাজে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বড় কাজে ছোটখাটো সমস্যা হতে পারে, তবে ঠিকাদারকে মানসম্মত কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।




