অর্থনীতি ডেস্ক: কমেছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি, কিন্তু কমেনি মানুষের জীবনযাত্রার চাপ। মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার চাপ।
এমন কঠিন বাস্তবতায় অর্থনীতির চাকা ঘুরে দাঁড় করানোর লক্ষ্যে আগামী তিন বছরের জন্য নতুন কৌশল নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনায় সরকারি ব্যয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগের ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯ মেয়াদের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে দেশের অর্থনীতির এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে কোভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের মতো একের পর এক বিশ্বসংকট দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়েও রপ্তানি আয়ে দুর্বলতার চিত্র পাওয়া গেছে। এ সময়ে রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ কমেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিলে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এতে অর্থনীতির ধীরগতির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করেছে। তবে সরকার আশা করছে, মধ্য মেয়াদে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের মূল্য পরিস্থিতি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এই লক্ষ্য অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।
সংকট মোকাবিলায় নীতি বিবৃতিতে, বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি, কারসাজি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে একই সময়ে সুদহার ও ঋণপ্রবাহের পরিবর্তন যাতে অর্থনীতিতে যথাযথভাবে কাজ করে সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখার ওপর জোর দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিং সমস্যা একটি বড় সমস্যা। এ খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক মূলধন ঘাটতি তৈরি করেছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় আর্থিক খাতে সুশাসন জোরদার ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যকর ব্যাংকিংব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নীতি বিবৃতিতে, অর্থনীতির আগের প্রবৃদ্ধির ধরন ও মূল্যায়ন সম্পর্কে বলা হয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধিকে গুরুত্ব না দিয়ে দীর্ঘদিন সরকারি ব্যয় ও বড় প্রকল্পনির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর বেশি নির্ভর করেছে।
বর্তমান সরকার সেই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে বেসরকারি খাতনির্ভর বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ জন্য ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিধিবিধান কমানো, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে সুশাসন জোরদারের পরিকল্পনা নিয়েছে।
সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অবকাঠামো, পরিবহন ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিক্ষা ও প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে বিবৃতিতে।
পাশাপাশি শুধু প্রকল্প নেওয়া নয়, প্রকল্পের টাকা যাতে কার্যকরভাবে ব্যয় হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এ জন্য প্রকল্প যাচাই-বাছাই, ক্রয়-প্রক্রিয়া, অর্থ ছাড়, ব্যয় পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে শৃঙ্খলা আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
পাশাপাশি বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো কম বিধায় মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এ কারণে করের হার বাড়ানোর চেয়ে করের আওতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার।
একই সঙ্গে অর্থনীতির বড় অংশকে আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়ে এসে করভিত্তি বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কম গুরুত্বপূর্ণ ও অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় সীমিত রেখে অগ্রাধিকার খাতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সম্ভাব্য জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনাতে। বলা হয়েছে, জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়তে পারে। যার প্রভাব পড়তে পারে বিনিময় হার, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়েও।
এর বাইরে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার দায়, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, সরকারের বিভিন্ন দায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগকেও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা এসব সংকট সামাল দিয়ে আগামী তিন বছরে অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো। এ জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানি, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি দারিদ্র্য কমানো এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের পরিকল্পনা করছে।
এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করার সঙ্গে সঙ্গে মধ্য মেয়াদে প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার ও বেগবান করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সমগ্র অর্থনীতিতে। বিগত সরকারের সময়েই অর্থনীতি ভালো ছিল না। বর্তমান সরকার পরিকল্পনা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। এটা ভালো উদ্যোগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের এই মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল নিয়েছে সরকার।




