ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeতথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানএআই চশমার ত্রুটি-বিচ্যুতি

এআই চশমার ত্রুটি-বিচ্যুতি

নিউজ ডেস্ক: প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের চশমার সঙ্গেই তর্কে জড়িয়ে পড়েন এক পর্যটক। প্রশ্ন ছিল আইফেল টাওয়ারের উচ্চতা কত? চশমাটি একবার উত্তর দিল ৩৩০ মিটার, ঠিক তার কয়েক মিনিট পরেই আবার জানাল ৩২৪ মিটার। অথচ আইফেল টাওয়ারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট অনুযায়ী এর উচ্চতা ৩৩০ মিটার বা ১,০৮৩ ফুট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন পরিধানযোগ্য এই চশমা নিয়ে প্যারিসে সপ্তাহান্তের পরীক্ষায় এমন বৈপরীত্য ভ্রমণের আধুনিক প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। চশমাটি যখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য দেয়, তখন প্রশ্ন জাগে–সহজে যাচাইযোগ্য তথ্যে ভুল করলে অন্য তথ্যের ওপর কতটা আস্থা রাখা যায়?

কেন পরিধানযোগ্য এআই মূলধারায় পরিণত হচ্ছে

২০২৩ সালের শেষের দিকে মেটা ও এসিলরলাক্সোটিকার যৌথ উদ্যোগে বাজারে আসা এ চশমাগুলো বর্তমানে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালে প্রায় ৭০ লাখ মেটা স্মার্ট গ্লাস বিক্রি হয়েছে এবং গুগল ও স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন নিজস্ব পণ্য তৈরির কাজ করছে। পর্যটকদের জন্য এ প্রযুক্তির প্রতিশ্রুতি বেশ আকর্ষণীয়। লাইভ ট্রান্সলেশন, দিকনির্দেশনা ও হ্যান্ডস-ফ্রি ছবি তোলার সুবিধা নিয়ে এটি একই সঙ্গে গাইডবুক, স্মার্টফোন ও অডিও গাইডের কাজ করে। কিন্তু প্যারিসের রাস্তায় এটি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। ক্যামেরাযুক্ত এ চশমাগুলো মানুষের সম্মতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও করার কারণে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়ছে। এটি শহরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে সাহায্য করবে নাকি নেতিবাচকভাবে চিহ্নিত করবে, তা নিয়ে ব্যবহারকারীর মধ্যে সংশয় রয়েছে।

কানেই ভ্রমণ নির্দেশিকা

রে-ব্যান মেটা এআই চশমাগুলো দেখতে সাধারণ ফ্রেমের মতো হলেও এর প্রযুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি লেন্সে কোনো তথ্য প্রদর্শন করে না, বরং ক্যামেরা ও স্পিকার ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর কানের কাছে একটি অডিও স্তর তৈরি করে। পর্যটক যখন প্রথমবার দিকনির্দেশনা চেয়েছিলেন, তখন চশমাটি সরাসরি ফোনের ম্যাপে রুট পাঠিয়ে দেয়। এর ফলে তাকে পুনরায় ফোনের স্ক্রিনের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। তবে সরাসরি ভয়েস ডিরেকশন শোনার ক্ষেত্রে এটি বেশ কার্যকর। প্লেস দে লা কনকর্ড বা লুভর মিউজিয়ামের ইতিহাস মুহূর্তের মধ্যে জেনে নেওয়া ও ফরাসি মেনু বা সংবাদপত্রের সরাসরি ইংরেজি অনুবাদ পাওয়ার ক্ষেত্রে চশমাটি বেশ সফল। এটি গাইডবুক ছাড়াই দ্রুত তথ্য সরবরাহ করে কৌতূহল মেটাতে সক্ষম।

উপকারী, কিন্তু সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়

আইফেল টাওয়ারের উচ্চতা নিয়ে করা ভুলটি চশমাটির নির্ভরযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। তথ্যের উৎস জানতে চাইলে চশমাটি অস্পষ্টভাবে ইন্টারনেট সার্চ এবং ট্রেনিং ডেটার কথা জানায়। এ ছাড়া এর ক্যামেরা ফিচারে জুম বা ফোকাস করার সুবিধা নেই এবং চশমাটি সমান্তরালভাবে না পরলে ছবিগুলো বাঁকা আসে। অবজেক্ট রিকগনিশন বা দৃশ্য চেনার ক্ষেত্রেও এটি মাঝে মাঝে অস্পষ্ট উত্তর দেয়, যেমন সাধারণ রাস্তার দৃশ্যকে কেবল ‘প্যারিসের রাস্তা’ হিসেবে চিহ্নিত করা।

ভ্রমণ প্রযুক্তির অন্ধকার দিক

প্রযুক্তির এ অন্ধকার দিকটি মূলত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসির সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগ উঠেছে যে, এই চশমা ব্যবহার করে মানুষের অজান্তেই তাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত রেকর্ড করা হচ্ছে। মেটার নিজস্ব পলিসি অনুযায়ী ব্যবহারকারীর ভয়েস ইন্টারঅ্যাকশন এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হতে পারে এবং তা পর্যালোচকরা শুনতে পারেন।

সব ছাপিয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় প্রযুক্তির প্রভাব। আগে পথ হারানোর ভয় থাকলে কোনো অপরিচিত মানুষের সাহায্য নেওয়া হতো বা হোটেলের কর্মীর সঙ্গে কথা হতো। কিন্তু এখন সব সমাধান চশমার ভেতর থাকায় মানুষের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ কমে যাচ্ছে। চশমাটি যেন শহর এবং মানুষের মাঝখানে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে দিচ্ছে। অনেক সময় ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো পরিকল্পনা মাফিক না হওয়া থেকেই তৈরি হয়।

জাপানের মতো কোনো দেশ যেখানে ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ অপরিচিত, সেখানে এই চশমা অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে। কিন্তু পরিচিত পরিবেশে বা ইউরোপের দেশগুলোতে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। স্মার্ট চশমা ভ্রমণকে সহজ করে তুললেও, ‘সহজ’ মানেই সবসময় ‘ভালো’ কি না–সে প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চশমাটি ভ্রমণের কিছু বিষয় সহজ করে দিলেও এর সুবিধা ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয় করা জরুরি।

সূত্র: বিবিসি

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular