‘পাতানো নির্বাচন সাজানো স্ক্রিপ্ট’– নাজমুল হাসান পাপনের সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন এলে এই বাক্যটির চর্চা হতো। আওয়ামী লীগের সময় দেশের ক্রিকেটে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সমঝোতার নির্বাচন দেখা গেছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ক্রীড়া সংগঠকরা আশা করেছিলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ক্রিকেটে নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। কিন্তু বিসিবির এবারের নির্বাচন বড় বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জেলা, বিভাগ, ক্লাব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে কাউন্সিলর মনোনয়নের জন্য বিসিবির চিঠি দেওয়ার দিন থেকে নির্বাচনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। বিএনপি সমর্থিত সভাপতি প্রার্থী তামিম ইকবালের প্যানেল সংবাদ সম্মেলন ডেকে অনিয়মের অভিযোগ করেছিল। সরকারি হস্তক্ষেপ বন্ধ করা না হলে বিসিবি ঘেরাও বা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন ব্রাদার্স ইউনিয়নের কাউন্সিলর ইশরাক হোসেন।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ নিয়ে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে ইশরাকের পুরোনো দ্বন্দ্ব আবার সামনে আসে। ক্রীড়া উপদেষ্টা এক অনুষ্ঠানে ইশরাক হোসেনের বক্তব্যকে হুমকি বলে উল্লেখ করেন। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগে বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের পক্ষ থেকে বিসিবির পরিচালক ফাহিম সিনহার মাধ্যমে ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। তবে ক্লাব ক্যাটেগরিতে পরিচালকের পদ ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা ভেস্তে যায়।
সর্বশেষ গতকাল বুধবার সরকারের হস্তক্ষেপে পাতানো নির্বাচনের অভিযোগ তুলে বিএনপি সমর্থিত তামিম ইকবালের প্যানেল ভোট থেকে সরে গেছে। ক্লাব ক্যাটেগরি থেকে তামিমসহ ১৩, সব মিলিয়ে ১৫ পরিচালক প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করায় ‘সরকার সমর্থিত’ আমিনুল ইসলাম বুলবুলের পক্ষের বেশির ভাগ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
মনোনয়ন প্রত্যাহারের প্রেস ব্রিফিংয়ে তামিম ইকবাল বলেন, ‘আপনারা জিততেও পারেন, হারতেও পারেন। তবে আজকে ক্রিকেট শতভাগ হেরে গেছে। আপনারা বড় গলায় বলেন, বাংলাদেশে ফিক্সিং বন্ধ করা লাগবে। আগে নির্বাচনের ফিক্সিং বন্ধ করেন, পরে ক্রিকেটের ফিক্সিং বন্ধ করার চিন্তা করেন।’
তামিম ইকবাল বলেন, ‘কারা কারা জড়িত, তা একদম পরিষ্কার। আমি এর চেয়ে বেশি আর কোনো কথা বলব না। তবে ভবিষ্যতে অবশ্যই বলব। আমি এ কথাই বলে শেষ করব– এই নির্বাচন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের জন্য একটা কালো দাগ হয়ে গেল।’
এ নির্বাচন নিয়ে সমকাল একাধিক দিন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ফোন করেছে। তিনি সাড়া দেননি। গতকাল তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানকেও ফোন করা হয় এবং খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তিনিও সাড়া দেননি।
কাউন্সিলর নিয়েই বিরোধের শুরু
১ সেপ্টেম্বর কাউন্সিলর চেয়ে জেলা, বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ক্লাবগুলোতে চিঠি দেয় বিসিবি। ক্লাব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাটেগরিতে কোনো সমস্যা না হলেও বিভাগীয় কাউন্সিলর মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ দেখা দেয় বুলবুল ও তামিম প্যানেলের। জেলা ও বিভাগ থেকে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে বিএনপি সমর্থিত ৫৪ কাউন্সিলর ফরম নিয়ে জমা দেন বিসিবিতে।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল সমর্থিতরা একে ঝুঁকি হিসেবে দেখেন। এ সময় তারা জেলা ও বিভাগীয় কাউন্সিলর মনোনয়নে নতুন কৌশল নেন। ১৮ সেপ্টেম্বর বিসিবি সভাপতি বুলবুল জেলা ও বিভাগীয় অ্যাডহক কমিটি থেকে কাউন্সিলর মনোনয়ন দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠান। গত ১১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকেও জেলা ও বিভাগীয় কমিশনারদের চিঠি দেওয়া হয় বিসিবি নির্বাচনে কাউন্সিলর মনোনয়নের বিষয়ে। তবে বিসিবি সভাপতির চিঠি নিয়ে বিরোধ দানা বাঁধতে শুরু করে।
২২ সেপ্টেম্বর বিসিবি সভাপতির চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন লক্ষ্মীপুরের মঈনুদ্দিন চৌধুরী কামরুল, টাইঙ্গাইলের আলী ইমাম তপন, রাজবাড়ীর মঞ্জুরুল আলম দুলাল ও গোপালগঞ্জের জসিমউদ্দিন খসরু। ১৫ দিনের জন্য চিঠির নির্দেশনা স্থগিত করেন আদালত। সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চেম্বার বিচারপতি আদেশ স্থগিত করেন এবং ২৮ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন ধার্য করেন। ২৮ সেপ্টেম্বর শুনানিতে বিসিবি সভাপতির চিঠিকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। এতে ব্যাকফুটে চলে যান তামিমের প্যানেল।
১৫ ক্লাবের কাউন্সিলরশিপ স্থগিত
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পর্যবেক্ষণ থাকায় ১৪টি ক্লাবের কাউন্সিলর মনোনয়নের ব্যাপারে মতামত চেয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর বিসিবিকে চিঠি দেয় নির্বাচন কমিশন। সেই অনুযায়ী ২০ সেপ্টেম্বর আইনজীবীর মতামত নিয়ে পরিচালনা পর্ষদের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ১৪টি ক্লাবের কাউন্সিলরশিপ থাকবে।
এই সিদ্ধান্ত সরাসরি কার্যকর না করে ২১ সেপ্টেম্বর বিসিবি সভাপতি নির্বাচন কমিশনকে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে চিঠি দেয়। ওই চিঠির আলোকে নিজস্ব ক্ষমতাবলে ১৪টি ক্লাবের কাউন্সিলরশিপ স্থগিত রাখে কমিশন। পরে কমিশনের শুনানিতে ক্লাব কর্মকর্তাদের আপত্তি ও তামিম ইকবালের বক্তব্যের পর নির্বাচন কমিশন কাউন্সিলরশিপ বহাল করে। এই সিদ্ধান্তে খুশি ছিলেন তামিমরা। তবে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
ক্লাব সূত্র জানায়, ফারুক আহমেদ, আমজাদ হোসেন ও ইমরোজ আহমেদের জন্য ক্লাব ক্যাটেগরি থেকে তিনটি পরিচালক পদ ছেড়ে দেওয়ার দাবি আসে। তামিমরা এতে ছাড় দিতে রাজি হননি। এরপর বিসিবির সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ১৫টি ক্লাবের কাউন্সিলরশিপ স্থগিত করেন এবং ৫ অক্টোবর শুনানির দিন ধার্য করেন। এই ঘটনার পরই নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানায় তামিমের নেতৃত্বাধীন প্যানেল।
ক্লাব ক্যাটেগরিতে ১৬ বৈধ প্রার্থী
তামিম ইকবালের প্যানেল নির্বাচন থেকে সরে গেলেও ১৬ প্রার্থীকে নিয়ে ভোট হবে ক্লাব ক্যাটেগরিতে। প্রিসাইডিং অফিসার ড. শেখ জুবায়েদ হাসান জানান, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদনে ব্যক্তিগত কারণ দেখান প্রার্থীরা। বাকি বৈধ প্রার্থীদের নিয়ে ৬ অক্টোবর প্রথমে বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ ও পরে সভাপতি ও সহসভাপতি পদে নির্বাচন হবে।
চার বিভাগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ৬ পরিচালক
বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) হাতে। নির্বাচনের আগে অ্যাডহক কমিটিতে পরিবর্তন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিসিবির গঠনতন্ত্রে জেলা-বিভাগের অ্যাডহক কমিটির কথা উল্লেখ না থাকলেও ওই কমিটি থেকে কাউন্সিলর মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করা হয়। অথচ অ্যাডহক কমিটিগুলো সরকার মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়ে গড়া।
বিসিবির গঠনতন্ত্রে বলা আছে, জেলা ও বিভাগ থেকে সাবেক খেলোয়াড় বা অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠকদের একজনকে কাউন্সিলর মনোনয়ন করতে হবে। অ্যাডহক কমিটি থেকে কাউন্সিলর করায় বিসিবির গঠনতন্ত্রকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি বিএনপি সমর্থিত সংগঠকদের। তারা মনে করেন, অ্যাডহক কমিটির কোনো সদস্যই সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবেন না। আড়াল থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন জেলা প্রশাসকরা। ফলে খুলনা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল বিভাগ থেকে মোট ছয় পরিচালক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হতে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম থেকে গতকাল মীর হেলাল মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সরকার সমর্থিত আহসান ইকবাল চৌধুরী ও সাবেক ক্রিকেটার এবং সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। খুলনা বিভাগ থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার আবদুর রাজ্জাক ও মো. জুলফিকার আলী খান। বরিশাল বিভাগের একমাত্র প্রার্থী ছিলেন মো. শাখাওয়াত হোসেন। সিলেট থেকে রাহাত শামসও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন।
এভাবে নির্বাচন পরিচালনাকে ‘সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেন ইসরাফিল খসরু, ‘এখানে দেখা যাচ্ছে একটা নগ্ন হস্তক্ষেপ আছে এবং নির্বাচনের কোনো পরিবেশ আমি দেখছি না। আমি একদম সরাসরি বলি, পরিষ্কার করে বলি, সরকারের ভেতরে একটা গোষ্ঠী এখানে নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করেছে।’
ইসরাফিল খসরু বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটাতে স্বচ্ছতা ছিল না। এখানে বিভিন্নভাবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে। জেলা পর্যায়, বিভাগ পর্যায়, এখন ক্লাব পর্যায়ে বলেন– সব জায়গায় এ প্রভাব স্পষ্ট। ১৫টি ক্লাবকে একবার বাতিল করা হচ্ছে, পরের মুহূর্তে আবার বৈধ করা হচ্ছে। শেষে আদালত দিয়ে কাউন্সিলরশিপ স্থগিত করা হলো।’
বিএনপি সমর্থিত প্যানেল বিতর্কিত হওয়ার কারণ
তামিম ইকবালের প্যানেলে চার প্রার্থী বিএনপির বড় নেতাদের ছেলে। আমীর খসরুর ছেলে ইসরাফিল খসরু (এক্সিওম ক্রিকেটার্স), মির্জা আব্বাসের ছেলে ইয়াসির আব্বাস (আজাদ স্পোর্টিং), বরকত উল্লাহ বুলুর ছেলে ওমর শরীফ মোহাম্মদ ইমরান (বাংলাদেশ বয়েজ) ও সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে সাঈদ ইব্রাহীম আহমেদ (ফেয়ার ফাইটার্স)। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে মনোনীত হয়েছিলেন বিএনপি নেতা মীর নাছিরের ছেলে মীর হেলাল। ক্রিকেট সংগঠক না হয়েও তারা বিসিবির পরিচালক পদে প্রার্থী হওয়ায় সমালোচনা হয়।



